সংসদ অধিবেশন
সংসদ অধিবেশন

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে ঐকমত্য হয়নি সংসদে

জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন পদ্ধতি কী হবে, তা নিয়ে একটি মুলতবি প্রস্তাবের ওপর গতকাল রোববার জাতীয় সংসদে আলোচনা হলেও এ বিষয়ে কোনো ঐকমত্যে আসতে পারেনি সরকারি দল ও বিরোধী দল। এই প্রশ্নে আগের অবস্থানেই অনড় থাকে সরকারি দল বিএনপি এবং বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি।

বিএনপি বলেছে, নোট অব ডিসেন্টসহ (ভিন্নমত) যেভাবে জুলাই জাতীয় সনদ সই হয়েছে, সেটা তারা অক্ষরে অক্ষরে মানবে। তারা সে অনুযায়ী সংসদে নিয়মিত প্রক্রিয়ায় সংবিধান সংশোধনের কথা বলেছে।

অন্যদিকে বিরোধী দল বলেছে, তারা বিদ্যমান সংবিধানের সংস্কার চায়। সংবিধানের ওই জায়গাগুলো পরিবর্তন চায়, যেগুলো গত ৫৪ বছরে বারবার ফ্যাসিবাদের জন্ম দিয়েছে। এ জন্য তারা নোট অব ডিসেন্ট ছাড়া জুলাই সনদের সব মূল প্রস্তাব পূর্ণাঙ্গ বস্তবায়নের পক্ষে। এ জন্য সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা প্রয়োজন বলে তারা মনে করে।

গতকাল সরকারি দলের সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি কী হবে, তা নিয়ে আলোচনার জন্য সংসদে মুলতবি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। প্রস্তাবের ওপর সরকারি ও বিরোধী দলের ৯ জন সদস্য আলোচনায় অংশ নেন। এ সময় সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।

এর আগে জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান–সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা আহ্বান নিয়ে গত বুধবার বিরোধী দলের একটি মুলতবি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। সেদিনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

সরকারি দলের অবস্থান

সংসদ নেতা তারেক রহমানের পক্ষে সংসদে মুলতবি প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জুলাই জাতীয় সনদের গুরুত্বপূর্ণ যেসব প্রস্তাবে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট আছে, সেগুলো উল্লেখ করে নিজেদের যুক্তি তুলে ধরেন।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, একজন ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী পদে ১০ বছরের বেশি ক্ষমতায় থাকতে পারবে না, এমন বিধান বিএনপি প্রস্তাব করেছিল তারেক রহমানের নির্দেশে। কারণ, তাঁরা চান না ব্যক্তিতান্ত্রিক স্বৈরাচার, সংসদীয় স্বৈরাচারের উৎপত্তি হোক। তিনি বলেন, নোট অব ডিসেন্টসহ যেভাবে সই হয়েছে, বিএনপি সেই জুলাই সনদের সব দফা, অঙ্গীকারনামা শতভাগ পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ। এ সময় তিনি জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশকে ‘কালারেবল লেজিসলেশন’ (ছদ্মবেশী আইন) হিসেবে আখ্যা দেন।

সালাহউদ্দিন আহমদ অভিযোগ করেন, সংবিধানের পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম তফসিল বিলুপ্তির প্রস্তাবে ঐকমত্য হয়েছিল। কিন্তু পরে সপ্তম তফসিলের বিষয়টি সনদে রাখা হয়নি। ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপন’ যুক্ত করা, শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি টানানোর বিধান বাদ দেওয়ার বিষয়েও ঐকমত্য হয়েছিল। কিন্তু এগুলো সনদে রাখা হয়নি। তিনি বলেন, বিএনপি বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। কিন্তু সার্বভৌম বিচার বিভাগ তাঁরা চান না। কারণ, সার্বভৌম হলো জনগণ, সংসদ ও দেশ। এর বাইরে কারও সার্বভৌম কর্তৃত্ব থাকতে পারে না। তিনি বলেন, তাঁরা এই সংসদেই বিচার বিভাগের সচিবালয় ও বিচারক নিয়োগের আইন পাস করবেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংবিধান সংস্কার হয় না। সংবিধান রহিত হয়, স্থগিত হয়, সংশোধন হয়, বাতিল হয়। সংশোধনের মাধ্যমে সংবিধান পরিবর্তন হতে পারে। তিনি বলেন, ‘বিরোধী দল সংবিধানের সংস্কার চায়, সংশোধনী চায় না। পুনর্লিখিত সংবিধান কেউ কেউ চেয়েছিল, যারা বিদেশ থেকে আমদানি হয়েছিল সংস্কার প্রস্তাবসহকারে। আমরা বলেছিলাম পুনর্লিখিত সংবিধান, নতুন সংবিধান, গণপরিষদ—এগুলো একই কথা; সংবিধানে যা কিছু গ্রহণ করতে চায় তা সংশোধনীতে আনি। তাল ধপ করে পড়িল নাকি পড়িয়া ধপ করিল, এক কথাই তো। সংশোধনী তো আমরা চাই।’

১৯৭৩ সালে প্রথম সংসদ যাত্রা শুরু করার পর আর রাষ্ট্রপতির আদেশ জারির এখতিয়ার নেই। গোঁজামিল দিয়ে গণভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের চেতনাকে সংবিধানে ধারণ করা হবে উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কিন্তু ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার সঙ্গে অন্য কিছুর তুলনা চলে না। একাত্তর এবং ১৯৭২ সালের সংবিধান কেন অনেকের ভালো লাগে না, তা তাঁরা বোঝেন। কারণ, সেখানে স্বাধীনতার ঘোষণা, মুক্তিযুদ্ধ, বিজয় অর্জন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সবই এক কাতারে গাঁথা। এ দেশের বিজয়গাথা। এটা কারও কারও জন্য পরাজয়ের গ্লানি হতে পারে। তিনি বলেন, ’৭২–এর সংবিধানের প্রথম তফসিলে যেসব অর্ডার বৈধতা দেওয়া হয়েছে, ৩ নম্বরটা হলো বাংলাদেশ কোলাবরেটরস অর্ডার, যার মাধ্যমে রাজাকার–আলবদরদের বিচার করা হয়েছে।

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশকে অবৈধ উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ১৯৭৩ সালের ৭ এপ্রিলে প্রথম সংসদ যাত্রা শুরু করার পর আর রাষ্ট্রপতির আদেশ জারির এখতিয়ার নেই। জোরপূর্বক জাতীয় প্রতারণার দলিল হিসেবে এটা তাদের ওপর আরোপ করে দেওয়া হয়েছিল। গোঁজামিল দিয়ে গণভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছে।

এর আগে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন কোন পদ্ধতিতে হবে, তা সনদেই ব্যাখ্যা করা আছে। এটি পরিপূর্ণ স্বচ্ছভাবে রক্তের ঋণ হিসেবে প্রতিফলিত হবে। এটা বাস্তবায়নে অন্য কোনো পদ্ধতির প্রয়োজন নেই। তিনি বলেন, ‘জুলাই সনদ জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন। ৩৩টি দল একমত হয়েছে যে আমরা এমন একটি সংবিধান চাই। যেটা বর্তমান সংবিধানকে সামনে রেখে সংযোজন-বিয়োজন ও পরিমার্জন হবে। সেটাই হলো জুলাই সনদ। আমরা এটাই মেনে নিয়েছি। সকল সংশোধন রিফর্ম (সংস্কার), কিন্তু সকল রিফর্ম সংশোধন নয়। রিফর্মকে সংশোধনের মাধ্যমে চূড়ান্ত রূপ দিতে হবে।’

আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) সভাপতি আন্দালিভ রহমান পার্থ বলেন, ‘আমরা চাই জুলাই সনদের বিষয়গুলো সংবিধানে আসবে। সংসদের রীতিনীতি মেনেই এটা আসবে। আমার মনে হয় এটা নিয়ে জাতিকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। জুলাইয়ের বিরুদ্ধে আমাদের দাঁড় করানোর পাঁয়তারা করা হচ্ছে।’

বিরোধী দলের অবস্থান

সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রতি ইঙ্গিত করে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘সময়সীমা চলে গেলেও মনখোলা রাখলে এখনো রাস্তা বের করা সম্ভব। আমরা সেই রাস্তা বের করে এগিয়ে যেতে চাই। যতটুকু সংস্কার হওয়ার হবে। সেখানে সংশোধন হওয়ার সংশোধন হবে। আমরা সংশোধনবিরোধী নই। সংবিধান সংশোধন ও আইন রচনায় আমাদের পূর্ণ সহযোগিতা থাকবে।’

ন্যায়ভিত্তিক সমাজ কায়েমের জন্য এই সংবিধানের পরিবর্তন চেয়েছেন উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘ফ্যাসিবাদমুক্ত দেশ ও শাসন পেতে আমরা কথা বলছি। আমরা সংবিধানবিরোধী নই। সংবিধানের ওই জায়গাগুলো চাইনি, যেটা গত ৫৪ বছরে বারবার ফ্যাসিবাদের জন্ম দিয়েছে।’

কোনো বিতর্ক ছাড়াই গণভোট মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ‘সংবিধান-আইন মানুষের জন্য। সবকিছু মেনে এই সংসদ গঠিত হয়নি। আমরা আইনের কম্প্রোমাইজ করেই এখানে এসেছি। কম্প্রোমাইজ করেছি দেশ ও জনগণের স্বার্থে। যদিও সময়সীমা চলে গেছে। তারপরও যদি মনখোলা থাকে, তাহলে এখনো রাস্তা বের করা সম্ভব। সেই রাস্তা বের করে আমরা এগিয়ে যাই।’ তিনি বলেন, ‘যতটুকু সংস্কার হওয়ার হবে। সেখানে সংশোধন হওয়ার হবে। আমরা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিচ্ছি, আমরা সংশোধনবিরোধী নই। সংবিধান সংশোধন ও আইন রচনার কাজটাই তো আমাদের কাজ। এই কাজে আমাদের পূর্ণ সহযোগিতা পাবেন।’

এর আগে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি কী হবে, তা জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে আলোচনা হয়েছে। তার ফলাফল এখন বিএনপি মানতে চায় না। সংস্কারের ঘোড়া অনেক দূর এগিয়ে গেছে, এখন সরকার সেখানে লাগাম লাগাতে চাইছে। তিনি বলেন, প্রথমে জুলাই সনদের যে খসড়া দলগুলোকে দেওয়া হয়েছিল, সেখানে নোট অব ডিসেন্ট ছিল না। পরে কোনো একটা দল বা এক ব্যক্তি সংসদ প্লাজার সামনে এসে নিজের মতো করে এটা অন্তর্ভুক্ত করেন। এ বিষয়টি তদন্তেরও দাবি জানান তিনি।

জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ জারির বৈধতা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে আখতার হোসেন বলেন, অভ্যুত্থানের পর বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কোনো আইনের ভিত্তিতে মুক্তি দেওয়া হয়নি। এটা হয়েছে জনগণের অভিপ্রায়ে। আদেশটিও জারি হয়েছে জনগণের অভিপ্রায়ে। সেটা আদেশের পটভূমিতেই বলা আছে। তিনি বলেন, সংবিধান অনুযায়ী সব মন্ত্রীর কার্যালয়ে শেখ মুজিবের ছবি ঝোলানোর কথা। সেটা ঝোলানো হচ্ছে না, তার ভিত্তি কোথায়; সে ভিত্তি দিয়েছে জনগণ।

কেন সংবিধান সংস্কার পরিষদ দরকার, তার ব্যাখ্যা করে আখতার হোসেন বলেন, জুলাই সনদে এমন কিছু প্রস্তাব আছে, যাতে সংবিধানের মৌলিক কাঠামোতে পরিবর্তন আসবে। সংশোধনের মাধ্যমে এগুলো যুক্ত করা হলে তা টেকসই হবে না। ঐকমত্য কমিশনে এ জন্য তাঁরা গণপরিষদের কথা বলেছিলেন। বিএনপি সংসদের মাধ্যমে সংশোধনের কথা বলেছিল। পরে আলোচনার মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার পরিষদের চিন্তাটি এসেছিল। জোনায়েদ সাকি ও নুরুল হক নুরও এর পক্ষে ছিলেন।

জামায়াতের সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান বলেন, সংবিধানের দোহাই দিয়ে সরকারি দল জনরায়কে অবজ্ঞা করছে। গণরায় ও জনগণের বিপ্লবকে অবজ্ঞা করা হলে প্রকারান্তরে সংবিধানকে অবজ্ঞা করা হয়।

অন্যদের মধ্যে বিএনপির সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক, মীর হেলাল উদ্দিন, জামায়াতের সংসদ সদস্য গাজী এনামুল হক আলোচনায় অংশ নেন। পরে স্পিকার আজ সোমবার বেলা সাড়ে তিনটা পর্যন্ত অধিবেশন মুলতবি করেন।