সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ছায়া বাজেট কমিটির প্রধান ও কুড়িগ্রাম–২ আসনের সংসদ সদস্য আতিকুর রহমান মোজাহিদ। বাংলামোটর, ঢাকা, ১২ জুন ২০২৬
সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ছায়া বাজেট কমিটির প্রধান ও কুড়িগ্রাম–২ আসনের সংসদ সদস্য আতিকুর রহমান মোজাহিদ। বাংলামোটর, ঢাকা, ১২ জুন ২০২৬

যত বড় বাজেট, নেতা–কর্মীদের পকেট তত ভারী—এই চিন্তা সামনে রেখে বাজেট কি না, প্রশ্ন এনসিপির

বিএনপি সরকারের ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘আওয়াজসর্বস্ব প্রতারণামূলক বাজেট’ বলে মন্তব্য করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। যত বড় বাজেট, নেতা–কর্মীদের পকেট তত ভারী—এই চিন্তা সামনে রেখে বাজেট দেওয়া হয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও তুলেছে দলটি।

আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দলের ছায়া বাজেট কমিটির প্রধান ও কুড়িগ্রাম–২ আসনের সংসদ সদস্য আতিকুর রহমান মোজাহিদ এ কথা বলেন। বাজেট বিষয়ে এনসিপির আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাতে এই সংবাদ সম্মেলন ডাকা হয়।

আতিকুর রহমান মোজাহিদ বলেন, ‘বাজেটের আকারটা পুরোপুরি কাল্পনিক ও ইউটোপিয়ান হয়েছে। এত বড় বাজেট দিয়েছে—৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। কথায় আছে যত বড় বাজেট, নেতা–কর্মীদের পকেট তত ভারী। এই চিন্তাকে সামনে রেখে বাজেট করা হয়েছে কি না, সেটা একটা প্রশ্ন।’

এর আগে গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে নতুন অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বাজেটে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আয় প্রাক্কলন করা হয়েছে। অন্যান্য উৎস থেকে সংগ্রহ করা হবে ৯১ হাজার কোটি টাকা। এই বাজেটে ঘাটতি থাকছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা।

সংবাদ সম্মেলনে ছায়া বাজেট কমিটির প্রধান আতিকুর রহমান মোজাহিদ বলেন, ‘এই বাজেট বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ঘাটতি বাজেট। অন্য কথায় যদি বলি, এটা ফাঁপা বুলি ও আওয়াজসর্বস্ব একটা প্রতারণামূলক বাজেট হয়েছে। আরও যদি বলি, বড় একটা সাদা হাতি বাজেট দেওয়া হয়েছে। এই বাজেটে জনগণের আশা–আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেনি, আমরা চরমভাবে হতাশ ও উদ্বিগ্ন।’

তবে এই বাজেটের কিছু ভালো দিকও আছে উল্লেখ করে এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তায় কিছু বিষয় বলা হলেও এই বাজেট যদি পূর্ণাঙ্গভাবে কেউ বিশ্লেষণ করেন, তাহলে আমরা দেখতে পাব, এই বাজেট শেষ পর্যন্ত মূলত একটা প্রতারণার বাজেট হয়েছে।’

বাজেটের আকারকে ‘পুরোপুরি কাল্পনিক’ উল্লেখ করে আতিকুর রহমান বলেন, ‘একেবারে ১৮ শতাংশ বাজেট বেড়েছে গত বছরের তুলনায়। যেখানে এ রকম একটা ভঙ্গুর অর্থনীতির উত্তরাধিকার আমরা হয়েছি, একটা ঋণনির্ভর অর্থনীতির মধ্যে একটা কাল্পনিক বাজেট হয়েছে।’

সরকারের উদ্দেশে ছায়া বাজেট কমিটির প্রধান বলেন, ‘বিশাল বাজেট হলো, বাজেটে এনবিআরের (জাতীয় রাজস্ব বোর্ড) মাধ্যমে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা আয়ের কথা বলা হয়েছে। সেটা আয় করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আমরা সবশেষ বাজেট পর্যন্ত দেখেছি, ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত উঠেছে। ফলে অর্ধেক বাজেট এখানে মিসিং (শেষ)।’

ব্যাংক খাত সংস্কার নিয়ে কথা নেই

এনসিপির আনুষ্ঠানিক বাজেট প্রতিক্রিয়ায় দলের রাজনৈতিক পর্ষদের অন্যতম সদস্য আতিকুর রহমান মোজাহিদ আরও বলেন, ‘আমাদের ১০ লাখ কোটি টাকার বেশি বৈদেশিক ঋণ আছে, আর ব্যাংক খাত থেকে নেওয়া অভ্যন্তরীণ ঋণ আছে আট লাখ কোটি টাকা। এটা আবার বাড়ছে।’

ছায়া বাজেট কমিটির প্রধান বলেন, ‘অনেকগুলো ব্যাংক “ক্লিনিক্যালি ডেড” হয়ে গেছে। ব্যাংকগুলোয় মোটামুটি শূন্য অবস্থা। ব্যাংক খাত সংস্কার না করে উল্টো ব্যাংক রেজোল্যুশন করে এস আলমকে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে। এ রকম ভঙ্গুর একটা ব্যাংক খাত, অথচ বাজেটে ব্যাংকিং সংস্কার নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট কথা হয়নি।’

আতিকুর রহমান মোজাহিদ বলেন, ‘সরকার যখন ব্যাংক থেকে টাকা পাবে না, তখন বিকল্প হবে টাকা ছাপানো। টাকা ছাপালে মূল্যস্ফীতি হবে। কিন্তু সরকার বলছে, তারা ভ্যাট কমিয়েছে। সুতরাং এই জায়গাটাও জনগণের সঙ্গে প্রতারণার শামিল।’

ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে গেলে টিআইএন সার্টিফিকেট লাগবে—বাজেট প্রস্তাবে থাকা এ বিষয়টির বিরোধিতা করে এনসিপির পক্ষ থেকে বলা হয়, এতে মানুষ ফরমাল চ্যানেলে লেনদেন করতে ভয় পাবে। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষ করের ভয়ে ব্যাংকে লেনদেন করবে না। এর ফলে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি আরও বেশি হয়ে যাবে। তখন অর্থনীতিতে বিনিয়োগ আসবে না। এ ছাড়া দলটি বলেছে, ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য বাজেটে উৎসে কর প্রস্তাব করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, আগেই টাকা কেটে নেওয়া হবে। এটা হলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সমস্যা হয়ে যাবে।

এবারের বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা ২৫ হাজার টাকা বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। এর সমালোচনা করে ছায়া বাজেট কমিটির প্রধান বলেন, মূল্যস্ফীতির হার দেখলেও এটা ৩ লাখ ৮৫ হাজার টাকা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু করা হলো ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। এটা খুবই হতাশাজনক। করমুক্ত আয়সীমা অবশ্যই সাড়ে চার লাখে নেওয়া উচিত।

কালোটাকা সাদা করার ব্যাপারে বাজেটে স্পষ্ট কোনো বক্তব্য দেখা যাচ্ছে না উল্লেখ করে এনসিপির এই সংসদ সদস্য বলেছেন, এটি জাতির জন্য একটা খুবই খারাপ অশনিসংকেত যে টাকা লেনদেন হয়ে বাইরে যাবে, আবার এসে সাদা হয়ে যাবে। এটা নৈতিকভাবে সমস্যা, অর্থনৈতিকভাবেও সমস্যা।

শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দের কথা উল্লেখ করে আতিকুর রহমান বলেন, ‘কিন্তু এটি শিক্ষার অবকাঠামো উন্নয়নের বাজেট, নাকি শিক্ষার মানোন্নয়নের বাজেট—এটা আমাদের জানা উচিত। স্বাস্থ্য খাতে যে বাজেট দেওয়া হয়েছে, সেটা কি স্বাস্থ্যের অবকাঠামো উন্নয়নের বাজেট, নাকি স্বাস্থ্যের মানোন্নয়নের বাজেট? এগুলোর বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, দুর্নীতি রোধ কীভাবে হবে, সেগুলা (উল্লেখ থাকলে) আরও সুন্দর একটা বাজেট হতে পারত।’

সরকার বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জনগণের উদ্বেগগুলো আমলে নিয়ে বাজেট সংশোধন করবে বলে সংবাদ সম্মেলনে আশা প্রকাশ করেন এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব ও ছায়া বাজেট কমিটির সদস্য আলাউদ্দীন মোহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘আমরা একটা জনকল্যাণমূলক ও রূপান্তরকামী বাজেট চাই।’

এনসিপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মিডিয়া সেক্রেটারি ইয়াসির আরাফাত সংবাদ সম্মেলন সঞ্চালনা করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন দলের যুগ্ম সদস্যসচিব জয়নাল আবেদীন (শিশির)।