
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারে পরিবেশ–সচেতনতার চর্চা বাড়তে শুরু করেছে। আগের নির্বাচনগুলোতে প্রচার–প্রচারণায় প্লাস্টিকের ব্যানার, ফেস্টুন ও পোস্টারের ব্যাপক ব্যবহার চোখে পড়লেও এবার চিত্র খানিকটা ভিন্ন। পোস্টার ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছে। তবে কোথাও কোথাও এখনো চোখে পড়ছে পিভিসি ও অন্যান্য প্লাস্টিক সামগ্রী।
এ নিয়ে অভিযোগ পাওয়ার কথা জানিয়েছেন ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের নির্বাচন–সংক্রান্ত তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা তাহজীব হাসান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘অভিযোগগুলো সংশ্লিষ্ট আসনে নিয়োজিত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছি। তাঁরা তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেবেন।’
আমরা নির্বাচন কমিশনকে বলেছি, বিলবোর্ড বানাতে গেলে এই আকৃতির কাপড় পাওয়া যায় না। নির্বাচন কমিশন থেকে আমাদের বলা হয়েছে, ‘ঠিক আছে, আপনারা লাগান, অসুবিধা নেই’সাইফুল আলম খান মিলন, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী, ঢাকা–১২ আসন
জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে ১২ ফেব্রুয়ারি। ওই দিন সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে। এ নিয়েই এখন চলছে ব্যাপক প্রচার–প্রচারণা, যা চলবে ভোট গ্রহণ শুরুর ৪৮ ঘণ্টা আগপর্যন্ত।
প্লাস্টিকের ক্ষতি ও বিধিনিষেধ
প্রতিটি নির্বাচনে বিপুল পরিমাণ ব্যানার, ফেস্টুন ও পোস্টার ব্যবহারের পর সেগুলোর বড় অংশ বর্জ্য হয়ে নদী–নালা ও খাল–বিলে গিয়ে পরিবেশের ক্ষতি করে। এ ক্ষতি রোধে নির্বাচন কমিশন এবারের নির্বাচনী প্রচারে প্লাস্টিকের তৈরি প্রচারসামগ্রী ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে।
প্লাস্টিক নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডো) জানিয়েছে, ২০২৪ সালের নির্বাচনে সাতটি বিভাগে প্রায় ২৭ হাজার টন প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয়েছিল। এর মধ্যে ১৭ হাজার টনই ব্যবহৃত হয়েছিল ঢাকায়।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন আচরণবিধিমালা ২০২৫–এ বলা হয়েছে, অপচনশীল দ্রব্য, যেমন রেক্সিন, পলিথিন ও প্লাস্টিক, তথা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এরূপ কোনো উপাদান দিয়ে তৈরি প্রচারপত্র, ব্যানার, লিফলেট বা হ্যান্ডবিল, ফেস্টুন ও ব্যানার ব্যবহার করা যাবে না। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকায় অবস্থিত গাছ, বিদ্যুৎ ও টেলিফোনের খুঁটিতে কোনো ধরনের ব্যানার–ফেস্টুন টানানো যাবে না।
ঢাকা–১২, ঢাকা–১৩ ও ঢাকা–১০—এই তিন আসনের অধিকাংশ প্রার্থীর ফেস্টুন বিদ্যুতের খুঁটিতে সাঁটানো দেখা গেছে। গত বুধবার প্রথম আলো রাজধানীর এই তিন সংসদীয় এলাকায় প্রার্থীদের প্রচারসামগ্রী সরেজমিনে পরিদর্শন করে।
বিধিমালার ৭–এর ক ধারায় বলা হয়েছে, নির্বাচনী প্রচারে কোনো প্রকার পোস্টারের ব্যবহার করা যাবে না।
এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডো) জানিয়েছে, ২০২৪ সালের নির্বাচনে সাতটি বিভাগে প্রায় ২৭ হাজার টন প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয়েছিল। এর মধ্যে ১৭ হাজার টনই ব্যবহৃত হয়েছিল ঢাকায়।
এ ছাড়া বিধিমালায় আরও বলা হয়েছে, কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর লিফলেট বা হ্যান্ডবিল, পোস্টার, ফেস্টুন, ব্যানার ও বিলবোর্ডের ওপর অন্য কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর লিফলেট বা হ্যান্ডবিল, পোস্টার, ফেস্টুন, ব্যানার ও বিলবোর্ড লাগানো যাবে না। এ ছাড়া ওই লিফলেট বা হ্যান্ডবিল, পোস্টার, ফেস্টুন, ব্যানার ও বিলবোর্ডের কোনো প্রকার ক্ষতিসাধন, তথা বিকৃতি বা বিনষ্ট করা যাবে না।
তবু আছে প্লাস্টিকের ব্যবহার
সরেজমিনে ঘুরে ঢাকা–১২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপির ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলম নীরবের নির্বাচনী প্রচারে প্লাস্টিকের ব্যবহার দেখা যায়নি। পশ্চিম নাখালপাড়া, ফার্মগেট, তেজকুনি পাড়া, কারওয়ান বাজার, গ্রিন রোডের একাংশ, হাতিরঝিল এলাকা ঘুরে এ চিত্র দেখা গেছে।
একই আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর প্রচারে প্লাস্টিকের তৈরি ব্যানার ও ফেস্টুনের ব্যবহার করা হয়েছে। আর বিএনপি–সমর্থিত প্রার্থী বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক তাঁর প্রচারের ব্যানারে কাপড়ের ব্যবহার করলেও পিভিসি দিয়ে তৈরি ফেস্টুনের ব্যবহার করেছেন। কারওয়ান বাজার এলাকায় তাঁর নির্বাচনী ক্যাম্পের প্রবেশমুখে রাখা বিলবোর্ডও পিভিসি দিয়ে তৈরি।
পিভিসি বা পলিভিনাইল ক্লোরাইড একধরনের প্লাস্টিকদ্রব্য। সাধারণত পানির পাইপ, বৈদ্যুতিক তারের আবরণ, দরজা–জানালা, ফ্লোরিং ও ব্যানার তৈরিতে এই উপাদান ব্যবহৃত হয়।
পিভিসি হালকা, টেকসই এবং পানি–রোদে সহজে নষ্ট না হওয়ায় এটি নির্মাণ ও বিজ্ঞাপন খাতে জনপ্রিয়। এটি প্রাকৃতিকভাবে সহজে পচে যায় না, তাই ব্যবহারের পর বর্জ্য হিসেবে পরিবেশে দীর্ঘদিন থেকে যায়। পাশাপাশি পিভিসি পোড়ালে ক্ষতিকর গ্যাস নির্গত হয়, যা মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
এ বিষয়ে ঢাকা–১২ আসনের বিএনপি–সমর্থিত প্রার্থী বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হকের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে কল দেওয়া হলে তিনি ফোন ধরেননি। পরে খুদেবার্তা পাঠানো হলেও তাঁর কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
আমরা আসলে ওরকমভাবে মনিটরিং করতে পারিনি। করা দরকার ছিল। হুট করে এসব পিভিসির তৈরি ব্যানার ও ফেস্টুন সরাতে গেলে সমস্যাও তৈরি হতে পারে। আমরা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলে নির্বাচনের আগে একটা সিদ্ধান্ত নেবজিয়াউল হক, অতিরিক্ত মহাপরিচালক, পরিবেশ অধিদপ্তর
এই আসনে জামায়াতের প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা নির্বাচন কমিশনকে বলেছি, বিলবোর্ড বানাতে গেলে এই আকৃতির কাপড় পাওয়া যায় না। নির্বাচন কমিশন থেকে আমাদের বলা হয়েছে, “ঠিক আছে আপনারা লাগান, অসুবিধা নেই।”’
সাইফুল আলম খান দাবি করেন, বিলবোর্ড ছাড়া তাঁর অন্য সব প্রচারসামগ্রী কাপড়ের তৈরি।
এ ছাড়া ঢাকা–১২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মুনতাসির মাহমুদ, কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী কল্লোল বণিক, জাতীয় পার্টির প্রার্থী সরকার মো. সালাউদ্দিন, গণসংহতি আন্দোলনের প্রার্থী তাসলিমা আখতার ও আমজনতার দলের প্রার্থী মো. তারেক রহমান ব্যানারে কাপড়ের ব্যবহার করেছেন।
তেজগাঁও ২৬ নম্বর ওয়ার্ড এলাকার তেজকুনি পাড়ার স মিল এলাকায় স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল আলম নীরবের প্রধান নির্বাচনী কার্যালয়ে কথা হয় তেজগাঁও থানা যুবদলের সাবেক সহসভাপতি এস এম মাসুদুর রহমান বরকতের সঙ্গে।
মাসুদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের ব্যানার ও ফেস্টুন সব কাপড়ের তৈরি। নির্বাচন কমিশনের আচরণবিধিমালা অনুসরণ করে প্রচার চালাচ্ছি।’
রাজধানীর আসাদগেট, লালমাটিয়া, মোহাম্মদপুর টাউন হল ও জাকির হোসেন রোড ঘুরে দেখা গেছে, ঢাকা–১৩ আসনে ১১–দলীয় ঐক্য–সমর্থিত বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মামুনুল হকের প্রচারে কাপড়ের ব্যানার–ফেস্টুন ব্যবহার করা হয়েছে। তবে বিএনপি–সমর্থিত প্রার্থী ববি হাজ্জাজ ও জামায়াতের প্রার্থী মো. মোবারক হোসেনের প্রচারে লালমাটিয়ায় কিছু পিভিসি ব্যানার ও ফেস্টুন দেখা গেছে।
ঢাকা–১০ আসনে বিএনপির প্রার্থী রবিউল হোসেন কাপড়ের ব্যানার ও ফেস্টুন ব্যবহার করলেও তাঁর পক্ষে পেশাজীবী সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) ভোট চেয়ে পিভিসির ব্যানার টানিয়েছে।
পিভিসি হালকা, টেকসই এবং পানি–রোদে সহজে নষ্ট না হওয়ায় এটি নির্মাণ ও বিজ্ঞাপন খাতে জনপ্রিয়। এটি প্রাকৃতিকভাবে সহজে পচে যায় না, তাই ব্যবহারের পর বর্জ্য হিসেবে পরিবেশে দীর্ঘদিন থেকে যায়। পাশাপাশি পিভিসি পোড়ালে ক্ষতিকর গ্যাস নির্গত হয়, যা মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
একই ধরনের ব্যানার দেখা গেছে তারেক রহমানের নির্বাচনী এলাকা ঢাকা–১৭ আসনেও। এ আসনে বিএনপিপন্থী কৃষিবিদদের সংগঠন অ্যাগ্রিকালচারিস্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশও তাদের ব্যানার তৈরি করেছে পিভিসি দিয়ে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য কে আই এফ সবুর প্রথম আলোকে বলেন, এটা খেয়াল রাখা উচিত ছিল। পেশাজীবী সংগঠনগুলোর ব্যানারগুলো পরিবর্তন করে নেওয়া হবে।
রাজধানীর পান্থপথ মোড়ে ঢাকা–১০ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মো. জসিম উদ্দীন সরকারের বিলবোর্ডও তৈরি করা হয়েছে পিভিসি দিয়ে। তবে ব্যানারে তিনি কাপড় ব্যবহার করেছেন। একই মোড়ে এবি পার্টির প্রার্থী নাসরিন সুলতানা মিলিরও পিভিসি দিয়ে তৈরি বিলবোর্ড দেখা গেছে।
যা বলছে পরিবেশ অধিদপ্তর
পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল হক প্রথম আলোকে বলেন, নির্বাচনের আগে প্রার্থীদের সচেতন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবু কেউ কেউ পিভিসি ব্যবহার করে ব্যানার ও ফেস্টুন তৈরি করেছেন।
জিয়াউল হক বলেন, ‘আমরা আসলে ওরকমভাবে মনিটরিং করতে পারিনি। করা দরকার ছিল। হুট করে এসব পিভিসির তৈরি ব্যানার ও ফেস্টুন সরাতে গেলে সমস্যাও তৈরি হতে পারে। আমরা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলে নির্বাচনের আগে একটা সিদ্ধান্ত নেব।’