
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখন নাজুক অবস্থায় রয়েছে বলে দাবি করেছেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা।
বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিনে হত্যা, অপহরণ, ছিনতাই, ডাকাতি এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের পরিসংখ্যান তুলে ধরে আজ সোমবার সংসদে তিনি বলেন, এসব তথ্যই প্রমাণ করে দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা নাজুক হয়ে পড়েছে।
সংসদের অধিবেশনে কার্যপ্রণালি বিধির ৭১ বিধিতে জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দেওয়া নোটিশের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে রুমিন ফারহানা এ কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) একটি প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে রুমিন ফারহানা বলেন, সরকারের প্রথম ১০০ দিনে অপরাধের গ্রাফ উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। মার্চ ও এপ্রিল—এই দুই মাসে দেশে ৬০৫টি খুন, ২৯৪টি ছিনতাই, ৯০টি ডাকাতি এবং ১৯৬টি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে ১২৯টি এবং চুরির ঘটনা ঘটেছে ২ হাজার ২১৪টি।
নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি তুলে ধরেন তিনি বলেন, আলোচিত সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ৩ হাজার ৪৯৬টি। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭৮ থেকে ১০২ জন, দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৩০ থেকে ৩৬ জন এবং ধর্ষণের শিকার শিশুর সংখ্যা ৪৯ থেকে ৭১ জন। এই পরিসংখ্যানই স্পষ্ট করে দেয় যে গত তিন মাসে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবস্থা কতটা নাজুক ও ভয়াবহ।
সরকারের সাফল্য ও ব্যর্থতার মূল্যায়নে অর্থনীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে মানদণ্ড হিসেবে নেওয়া হয় জানিয়ে রুমিন ফারহানা বলেন, এই সরকারের অর্থনীতি ও আইনশৃঙ্খলা—এই দুটি বিষয়ের ওপরই সরকারের ৫০ ভাগ সফলতা বা ব্যর্থতা নির্ভর করবে, আর বাকি ৫০ ভাগ অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের ওপর। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে উপস্থিত থাকলে তাঁর ব্যর্থতার খতিয়ান আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা যেত।
বিএনপির একসময়ের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বক্তব্যের শুরুতে সংসদকক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর খালি আসনের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘সামনে তাকিয়ে দেখলাম তাঁর আসনটি খালি, অর্থাৎ তিনি উপস্থিত নেই। কী আর করা, তার অনুপস্থিতিতেই বলি।’
এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আজ সকালে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের চেয়ে ভালো।
টিআইবির যে পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে রুমিন ফারহানা সংসদে কথা বলেছেন, তা নিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘টিআইবি রিপোর্ট করে পত্রিকার কাটিং থেকে। তারা কোনো তদন্ত করে না।’
ঈদের আগে ‘৬ লাখ শিক্ষক’ বেতন পাননি
দেশের প্রায় ৬ লাখ শিক্ষক ও কর্মচারী ঈদুল আজহার আগে বেতন পাননি বলে দাবি করেন কুমিল্লা-২ আসনের সদস্য মোহাম্মদ সেলিম ভূঁইয়া।
তিনি সংসদে বলেন, ‘জুন মাসের ৮ তারিখ পর্যন্ত মে মাসের বেতন পরিশোধ করা হয়নি। এই সরকারের আমলে শিক্ষকেরা বেতন পাবেন না, এটা তো হতে পারে না। অতীতে বিএনপি সরকারের সময়ে ঈদের আগেই বেতন দেওয়া হতো।’
বেতন আটকে যাওয়ার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান সেলিম ভূঁইয়া। একই সঙ্গে বেসরকারি শিক্ষকদের অবসরসুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টে অর্থ বরাদ্দের উদ্যোগ নেওয়ায় সরকারকে ধন্যবাদ জানান।
গুমানী নদীর ওপর সেতু দাবি
পাবনা-৩ আসনের সদস্য মোহাম্মদ আলী আজগার চাটমোহর উপজেলার মির্জাপুর-অষ্টমনিষা খেয়াঘাট পয়েন্টে গুমানী নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণের দাবি জানান। তিনি বলেন, প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ নৌকায় নদী পারাপার হন। শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষকে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয় এবং মাঝেমধ্যেই নৌকাডুবির মতো দুর্ঘটনা ঘটে।
বক্তব্যের একপর্যায়ে আলী আজগার স্মরণ করিয়ে দেন, ২০০২ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ওই এলাকায় কয়েকটি সেতু ও সড়ক প্রকল্পের ঘোষণা দিয়েছিলেন, কিন্তু সেগুলোর অনেকগুলো এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
কুমিল্লা বিমানবন্দর আবার চালুর দাবি
কুমিল্লা-৬ আসনের সদস্য মো. মনিরুল হক চৌধুরী কুমিল্লা বিমানবন্দর আবার চালুর দাবি জানান। তিনি বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় স্থাপিত বিমানবন্দরটি একসময় চালু থাকলেও পরে কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
বিমানবন্দরটি আবার সচল করার গুরুত্ব তুলে ধরে মনিরুল হক বলেন, বর্তমানে কুমিল্লার জনসংখ্যা প্রায় ৬৫ লাখ এবং জেলার উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ বিদেশে বসবাস করেন। কুমিল্লা দেশের অন্যতম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী জেলা। বিমানবন্দর চালু হলে বিদেশফেরত যাত্রী, বিনিয়োগকারী এবং চিকিৎসাসেবা গ্রহণকারীরা উপকৃত হবেন।
বিমানবন্দরের কিছু স্থাপনা এখনো ব্যবহৃত হচ্ছে এবং সেখান থেকে মাসিক আয়ও হচ্ছে বলে জানান তিনি।
বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘কুমিল্লার প্রতি অবজ্ঞা ও বৈষম্যের অবসান হওয়া দরকার।’
নীলফামারীতে সেতুর প্রস্তাব
নীলফামারী-২ আসনের সদস্য আল ফারুক আবদুল লতিফ বলেন, নীলফামারী জেলা শহরের সঙ্গে অন্য কোনো জেলা শহরের সরাসরি যোগাযোগ নেই। তিনি দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার ঝাড়বাড়ি ও খানসামা উপজেলার জয়গঞ্জ পয়েন্টে একটি সেতু নির্মাণের প্রস্তাব দেন। তাঁর মতে, সেতুটি নির্মিত হলে ঠাকুরগাঁও ও নীলফামারী জেলা শহরে যাতায়াতের সময় প্রায় অর্ধেকে নেমে আসবে।
নীলফামারী থেকে কিশোরগঞ্জ উপজেলা হয়ে সরাসরি রংপুরে যাওয়ার সড়ক উন্নয়নের দাবিও জানান তিনি।
ঈদগাঁ উপজেলায় অবকাঠামো সংকট
কক্সবাজার-৩ আসনের সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল তাঁর জেলায় নবগঠিত ঈদগাঁ উপজেলার প্রশাসনিক অবকাঠামোর অভাবের বিষয়টি সংসদে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ২০২১ সালে উপজেলা ঘোষণার পরও অধিকাংশ সরকারি দপ্তর এখনো ভাড়া ভবনে পরিচালিত হচ্ছে। ইউএনও অফিসসহ বিভিন্ন দপ্তর স্থায়ী ভবন না থাকায় কর্মকর্তারা সেখানে থাকতে আগ্রহী নন।
লুৎফুর রহমান আরও বলেন, উপজেলায় এখনো ফায়ার সার্ভিস স্টেশন, পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক স্থাপনা গড়ে ওঠেনি। রেমিট্যান্সনির্ভর ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই উপজেলায় দ্রুত অবকাঠামো উন্নয়নের দাবি জানান তিনি।
৭১ বিধির আলোচনায় অংশ নিয়ে বিভিন্ন এলাকার সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ এলাকার সড়ক, সেতু, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়নসংক্রান্ত বিভিন্ন দাবি ও সমস্যার বিষয়ও সংসদে তুলে ধরেন।