
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা মনে করেন, মানুষ ভোট দেন বিশ্বাস থেকে। মানুষের আস্থাই হলো শক্তি; ভাড়া করা মানুষ নিয়ে মিছিল বা কান ঝালাপালা করে দেওয়া মাইকিং নয়। তিনি বিশ্বাস করেন, এই নির্বাচনে যদি দেখিয়ে দেওয়া যায় যে কান ঝালাপালা করা মাইকিং না করে, পোস্টার দিয়ে শহর জঞ্জাল না করে, কোটি টাকা খরচ করে শোডাউন না দিয়েও একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী জিততে পারেন, তাহলে ভবিষ্যতে এমন অনেকেই রাজনীতিতে আসবেন, যাঁদের টাকা বা পেশিশক্তি নেই; কিন্তু দেশ পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা ও যোগ্যতা আছে। আর তখন রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের পুরোনো চর্চা বাদ দিতে বাধ্য হবে।
গতকাল সোমবার রাত সোয়া নয়টার দিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে এসব কথা বলেন ফুটবল প্রতীকের এই স্বতন্ত্র প্রার্থী।
তাসনিম জারা তাঁর পোস্টে উল্লেখ করেন, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে যখন মাত্র দেড় দিনে প্রায় পাঁচ হাজার ভোটারের স্বাক্ষর প্রয়োজন ছিল, তখন অনেকেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসে বলতেন, ‘মা, আমি এসেছি। কারণ, আমার ছেলে ফোন করে বলেছে আপনাকে সাহায্য করতে।’ কিংবা ‘আমার মেয়ে থাকে আমেরিকায়, সে আমাকে ফোন করে বলেছে, বাবা, তাসনিম জারাকে সিগনেচারটা দিয়ে এসো। ও না হলে দাঁড়াতেই পারবে না।’
এ প্রসঙ্গে তাসনিম জারা লিখেছেন, ‘তখনই বুঝতে পারি মানুষ আসলে রাজনীতির সাথে এখন কতটা সম্পৃক্ত। বুঝতে পারি আমাদের শক্তি হলো মানুষের আস্থা। ভাড়া করা মানুষ নিয়ে মিছিল বা কান ঝালাপালা করে দেয়া মাইকিং নয়।’
নির্বাচনী প্রচার শুরু হওয়ার আগেই শহরজুড়ে পোস্টারের উৎসব দেখেন বলে উল্লেখ করেন তাসনিম জারা। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন আগেই ঘোষণা করেছিল যে এ বছরের নির্বাচনে পোস্টার লাগানো নিষেধ। কিন্তু প্রায় সব প্রার্থী সেই নিয়মের তোয়াক্কা না করে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে শহরটাকে পোস্টার দিয়ে মুড়িয়ে ফেললেন।
তাসনিম জারা লিখেছেন, তিনি রাজনীতির বাইরের মানুষ ছিলেন। সাধারণ নাগরিক হিসেবে এই ‘পোস্টারের জঞ্জাল’ ও ‘উচ্চ শব্দের মাইকিং’ তাঁকে সব সময় কষ্ট দিত। তাই তিনি তাঁর টিমকে বলেন যে তিনি পোস্টার টাঙাবেন না, উচ্চ শব্দে মাইকিংও করবেন না। কিন্তু তখন তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষীরা চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তাঁরা বললেন, ‘পোস্টার না থাকলে মানুষ জানবে কীভাবে আপনি নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন? প্রচার মানেই তো চোখের সামনে থাকা।’
শুভাকাঙ্ক্ষীদের এমন কথা ভুল ছিল না বলে উল্লেখ করেন তাসনিম জারা। এ প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, যখন এলাকায় যেতেন, অনেকেই ভালোবেসে অনুযোগ করতেন, ‘আপনার তো কোনো পোস্টার দেখি না, আপনি কি আদৌ নির্বাচন করছেন? আপনার প্রচার আরও বাড়াতে হবে।’
এ অবস্থায় এসব দাপট দেখানো কাজ না করেও নির্বাচনের মাঠে কীভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা যায়, তা নিয়ে তখন ভাবতে থাকেন বলে জানান তাসনিম জারা। তিনি লিখেছেন, ‘একদম মূলে (Basic–এ) গিয়ে আমরা চিন্তা করলাম, মানুষ আসলে ভোট দেয় কেন? রাস্তায় বড় মিছিল দেখলে বা কানের কাছে মাইক বাজলেই কি আপনি কাউকে ভোট দেবেন? সম্ভবত না। বরং এতে বিরক্তি বাড়ে।’
মানুষ ‘বিশ্বাস’ থেকে ভোট দেয় বলে উল্লেখ করেন তাসনিম জারা। এ প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, আর এই বিশ্বাস তৈরি হয় যখন পরিচিত কেউ (বন্ধু, আত্মীয় বা সহকর্মী) ফোন করে বলেন, ‘দোস্ত, আমি ওনার ইশতেহার পড়েছি, মানুষটা সৎ। চলো এবার ওনাকে একটা সুযোগ দেই।’
এ ধরনের আন্তরিক কথোপকথন, হাজারটা পোস্টারের চেয়েও শক্তিশালী বলে মত দেন তাসনিম জারা। এ প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, ‘আমাদের অনেক সমর্থক আছেন, যাঁরা হয়তো মিছিলে গিয়ে স্লোগান দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না, কিন্তু মনেপ্রাণে চান রাজনীতিতে একটা পরিবর্তন আসুক। তাঁদের জন্যই আমরা একটা পন্থা বের করার চিন্তা করি। সেখান থেকেই আসে আমাদের “প্রজেক্ট ঢাকা-৯”–এর আইডিয়াটা।’
ঢাকা-৯ আসনের এই স্বতন্ত্র প্রার্থী লিখেছেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, এই নির্বাচনে যদি আমরা দেখিয়ে দিতে পারি যে কান ঝালাপালা করা মাইকিং না করে, পোস্টার দিয়ে শহরটা জঞ্জাল না করে এবং কোটি টাকা খরচ করে শোডাউন না দিয়েও (কারণ, প্রায় সকল শোডাউনেই অল্প কিছু কর্মী ও বাকিরা ভাড়া করা মানুষ থাকে) একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী জিততে পারেন, তাহলে ভবিষ্যতে এমন অনেকেই রাজনীতিতে আসবেন, যাঁদের টাকা বা পেশিশক্তি নেই, কিন্তু দেশ পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা ও যোগ্যতা আছে। আর তখন রাজনৈতিক দলগুলো তাদের পুরোনো চর্চা বাদ দিতে বাধ্য হবে।’
এরপর তাসনিম জারা লিখেছেন, ‘পোর্টালের আলোচনায় ফিরে আসি। আমাদের লক্ষ্য ছিল জিনিসটা যতখানি সম্ভব সহজ করা। তাই আমরা এখানে মাত্র দুইটা ধাপ রেখেছি। প্রথম ধাপে পোর্টালে যাওয়া লাগবে না। আপনি শুধু আপনার পরিচিত কাউকে কল দিয়ে বলবেন আপনি কেন এই নির্বাচনে আমাদের সাপোর্ট করছেন এবং তাদের সাপোর্ট চাইবেন।’
কেউ ‘সাপোর্ট’ দিতে চাইলে পোর্টালে এসে জানাবেন, কতজনের সাপোর্ট সংগ্রহ করতে পেরেছেন বলে উল্লেখ করেন তাসনিম জারা। এ প্রসঙ্গে তিনি লেখেন, ‘পরবর্তীতে এখান থেকেই তাঁদের কাছে “ভোটার স্লিপ” বা আমাদের ইশতেহার পাঠিয়ে দিতে পারবেন।’
তাসনিম জারা লিখেছেন, ‘যদি আপনিও আমাদের মতো মনে করেন যে এই মডেলটি নতুন রাজনীতির যে স্বপ্ন আমরা দেখেছিলাম, তা বাস্তবায়নে সহায়ক হবে, তাহলে আমাদের একজন ‘ক্যাম্পেইনার’ হিসেবে যুক্ত হোন। খুঁজে দেখুন ঢাকা-৯ এলাকায় আপনার পরিচিত কেউ আছেন কি না, বা এমন কেউ আছেন কি না, যিনি ঢাকা-৯ এলাকার মানুষকে চেনেন। তাঁদের আমাদের কথা বলুন।’
ঢাকা-৯ আসনের এই স্বতন্ত্র প্রার্থী লিখেছেন, ‘আমাদের কাছে আপনার সাপোর্ট শুধু একটা ভোট না, এটা রাজনীতির যে নতুন ধারা আমরা তৈরি করতে চাই, সেই মডেল কাজ করবে কি না, সেটা প্রমাণেরও উপায়। এটা কাজ করলে দেশ পরিবর্তনের একটা শক্তিশালী “টুলকিট” আমরা পেয়ে যাব।’
সময় খুব অল্প উল্লেখ করে তাসনিম জারা লিখেছেন, ‘আপনার সাহায্য প্রয়োজন।’
তাসনিম জারা তাঁর পোস্টের শেষে ‘প্রজেক্ট ঢাকা-৯’–এর ওয়েব ঠিকানা দিয়েছেন। এই ওয়েবসাইট ভিজিট করতে বলেছেন ভোটারদের।