হজ আরবি শব্দ, হজের আভিধানিক অর্থ হলো, ইচ্ছা করা ও সফর বা ভ্রমণ করা। ইসলামি পরিভাষায় হজ হলো নির্দিষ্ট সময়ে নির্ধারিত স্থানে বিশেষ কিছু কর্ম সম্পাদন করা। হজের নির্দিষ্ট সময় হলো ৮ জিলহজ থেকে ১৩ জিলহজ পর্যন্ত ছয় দিন। হজের নির্ধারিত স্থান হলো মক্কা শরিফে—কাবা, সাফা-মারওয়া, মিনা, আরাফা, মুজদালিফা ইত্যাদি এবং মদিনা শরিফে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রওজা শরিফ জিয়ারত করা। হজের বিশেষ আমল বা কর্মকাণ্ড হলো ইহরাম, তাওয়াফ ও সাই, অকুফে আরাফা, অকুফে মুজদালিফা, অকুফে মিনা, দম ও কোরবানি, হলক ও কছর এবং জিয়ারতে মদিনা রওজাতুল রাসুল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইত্যাদি।
পবিত্র হজ আল্লাহ তাআলার একটি বিশেষ বিধান। হজ ইসলামের পঞ্চ স্তম্ভের একটি। আর্থিক ও শারীরিকভাবে সমর্থ পুরুষ ও নারীর ওপর হজ ফরজ। হজ সম্পর্কে কোরআন শরিফে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহর তরফ হতে সে সকল মানুষের জন্য হজ ফরজ করে দেওয়া হয়েছে, যারা তা আদায়ের সামর্থ্য রাখে।’ (সুরা আলে ইমরান; আয়াত: ৯৭)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, প্রকৃত হজের পুরস্কার বেহেশত ব্যতীত অন্য কিছুই হতে পারে না। সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে যাঁরা হজ পালন করবেন, আল্লাহ তাআলা তাঁদের হজ কবুল করবেন এবং তাঁদের জন্য অফুরন্ত রহমত ও বরকত অবধারিত। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘হজ ও ওমরাহ মানুষকে নিষ্পাপে পরিণত করে, যেভাবে লোহার ওপর হতে মরিচা দূর করা হয়।’ (তিরমিজি)। রাসুলে করিম (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি যথাযথভাবে হজ পালন করে, সে পূর্বেকার পাপ হতে এরূপ নিষ্পাপ হয়ে যায় যেরূপ সে মাতৃগর্ভ হতে ভূমিষ্ঠ হওয়ার দিন নিষ্পাপ ছিল।’ (বুখারি)। খোদাপ্রেমিকের পক্ষে হজ সম্পাদন অত্যাবশ্যক।
হজের ফরজ তিনটি: ১. ইহরাম বা ইচ্ছা করা, ২. অকুফে আরাফা করা (৯ জিলহজ জোহর হতে ১০ জিলহজ ফজরের পূর্ব পর্যন্ত যেকোনো সময় আরাফাতে অবস্থান করা), ৩. তওয়াফে জিয়ারত করা (১০ জিলহজ ভোর হতে ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত যেকোনো সময় কাবা ঘর তাওয়াফ করা)।
হজের ওয়াজিব সাতটি: ১. মুজদালিফা নামক স্থানে কিছু সময় অবস্থান করা (আরাফাত থেকে মিনাতে ফেরার পথে ১০ জিলহজ ভোর [সুবহে সাদিক] হতে সূর্যোদয় পর্যন্ত সময়ের মধ্যে)। ২. সাফা ও মারওয়া সাই করা বা দৌড়ানো, ৩. শয়তানকে পাথর মারা, ৪. তামাত্তু ও কিরান হজে কোরবানি করা, ৫. মাথার চুল কামিয়ে বা কেটে ইহরাম খোলা, ৬. বিদায়ী তাওয়াফ করা, ৭. মদিনা শরিফে রওজাতুন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিয়ারত করা। (ইউসুফ ইসলাহী, আসান ফিকাহ, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৫০)।
হজের সুন্নত ১০টি: ১. ইফরাদ ও কিরান হজকারীর জন্য তাওয়াফে কুদুম বা প্রথম তাওয়াফ করা, ২. তাওয়াফের সময় (প্রথম ৩ চক্করে) রমল করা (সৈনিকের মতো বীরদর্পে চলা), ৩. খলিফা অথবা তাঁর প্রতিনিধি খুতবা (ভাষণ) দেওয়ার তিন জায়গায় যাওয়া। ক. ৭ জিলহজ মক্কা শরিফে, খ. ৯ জিলহজ আরাফাতে, গ. ১১ জিলহজ মিনাতে, ৪. ৮ জিলহজ মক্কা শরিফ হতে মিনাতে গিয়ে জোহর, আসর, মাগরিব, এশা ও পরের দিন ফজরের নামাজ আদায় করা এবং রাতে সেখানে অবস্থান করা, ৫. ৯ জিলহজ সূর্যোদয়ের পর মিনা হতে আরাফাতের দিকে রওনা হওয়া, ৬. অকুফে আরাফা বা আরাফাতে অবস্থানের জন্য জোহরের পূর্বে গোসল করা, ৭. ৯ জিলহজ আরাফাতে অবস্থান করে সূর্যাস্তের পর মুজদালিফার দিকে রওনা হওয়া, ৮. মুজদালিফায় গিয়ে মাগরিব ও এশা একত্রে (এশার ওয়াক্তে জাময়ে তাখির) আদায় করা, ৯. ১০, ১১ ও ১২ জিলহজ মিনাতে রাত্রি যাপন করা, ১০. মিনা হতে মক্কা শরিফ প্রত্যাবর্তনকালে (মসজিদে খাইফের নিকটে) ‘মুহাচ্ছার’ নামক জায়গায় কিছু সময় অবস্থান করা।
ওমরাহ আরবি শব্দ; ওমরাহর আভিধানিক অর্থ হলো ধর্মকর্ম, ইবাদত, সুখকর, সেবা, স্থিতিশীল, জীবন, মহাপ্রাচীন, স্থাপত্য-স্থাপনা, প্রাপ্তি, অভ্যর্থনা, জিয়ারত বা সফর ও ইচ্ছা। যিনি ওমরাহ করেন, তাঁকে ‘মুতামির’ বলা হয়। (লিসান)। ইসলামি পরিভাষায় ওমরাহ হলো নির্ধারিত স্থানে নির্দিষ্ট কর্ম সম্পাদন করা। ওমরাহর নির্দিষ্ট কাজকর্ম হলো ইহরাম, তাওয়াফ ও সাই, হলক ও কসর ইত্যাদি। ওমরাহর নির্ধারিত স্থান হলো কাবা শরিফ, সাফা-মারওয়া ইত্যাদি। আফাকি তথা দূরবর্তী ওমরাহ সম্পাদনকারীর জন্য মদিনা মুনাওয়ারা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর রওজা শরিফ জিয়ারত করা সুন্নত।
ওমরাহ সম্পাদনের বিশেষ কোনো সময় সুনির্দিষ্ট নেই; তবে হজের সময় (৮ জিলহজ থেকে ১৩ জিলহজ পর্যন্ত ৬ দিন ওমরাহ পালন করা বিধেয় নয়; এই ছয় দিন ছাড়া বছরের যেকোনো দিন যেকোনো সময় ওমরাহ পালন করা যায়। হজের সফরেও ওমরাহ করা যায়। একই সফরে একাধিক ওমরাহ করতে বাধা নেই। হজের পূর্বেও (হজ না করেও) ওমরাহ করা যায় এবং হজের পরও বারবার ওমরাহ করা যায়। হজ যেমন জীবনে একবার ফরজ; তেমনি ওমরাহ জীবনে অন্তত একবার সুন্নত।
ওমরাহ সম্পর্কে কোরআন করিমে রয়েছে: ‘নিশ্চয় সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনাবলির অন্যতম; তাই যারা হজ করবে বা ওমরাহ করবে, তারা দুইয়ের এ প্রদক্ষিণ (সাই) করবে।’ (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ১৫৮)। ওমরাহ পালন করা গুরুত্বপূর্ণ সুজাত আমল। এটি পুরুষ ও নারী সবার জন্য প্রযোজ্য। ওমরাহর ফরজ দুটি: ১. ইহরাম বা ইচ্ছা করা, ২. তাওয়াফে জিয়ারত করা। ওমরাহর ওয়াজিব দুটি: ১. সাফা ও মারওয়া সাই করা বা দৌড়ানো, ২. মাথার চুল কামিয়ে বা কেটে ইহরাম খোলা।
রমজান মাসে ওমরাহ পালন করা হজের তুল্য সওয়াব; শাওয়াল মাসও ওমরাহ করার জন্য উত্তম সময়। তবে হজ ফরজ থাকা অবস্থায় তা আদায়ের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও হজ সম্পন্ন না করে বারবার ওমরাহ করা অযৌক্তিক; কারণ, শত ওমরাহ করলেও ফরজ হজের আদায় হবে না।
মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী: যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি, সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম।
smusmangonee@gmail.com