উত্তরায়ণ উৎসবে ঘুড়ি ও আলোয় আলোকিত একটি রাত
উত্তরায়ণ উৎসবে ঘুড়ি ও আলোয় আলোকিত একটি রাত

মকর সংক্রান্তিতে এল পিঠে-পুলির উৎসব

জীর্ণ শীতের সাজে যখন প্রকৃতি তার কায়া লুকোতে থাকে তখন প্রবল উত্তুরে হাওয়ার মধ‍্যে যে তিথিটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সমস্ত মোহমায়া ভুলে পুনরায় জাগ্রত করে, তার পরিচয় মকর সংক্রান্তি। বঙ্গদেশে তাকেই পৌষ সংক্রান্তি বলা হয়ে থাকে।

সাধারণত পৌষ মাসের শেষ দিনে এই উৎসব তিথিটি পালিত হয়। ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ‍্যে বা অঞ্চলে যদিও এর ভিন্ন ভিন্ন পরিচিতি, যেমন তামিলনাড়ুতে একে পোঙ্গল বলে। আসামে এই সংক্রান্তি তিথি ভোগালি বিহু নামে পরিচিত। গুজরাটে তাকেই বলা হয় উত্তরায়ণ।

এছাড়া সমগ্র উত্তর ভারত জুড়ে যেমন, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, হিমাচল প্রদেশ ও জম্মুতে লোহরি বলা হয়ে থাকে। কর্ণাটকে বলা হয় মকর সংক্রমণ। এছাড়া ওড়িশা, মহারাষ্ট্র, গোয়া, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা এবং কেরলের লোকেরা মকর সংক্রান্তি উৎসব বলেই জানে।

ভারতবর্ষের বাইরেও মকর সংক্রান্তি পালিত হয় নেপালে, থাইল্যান্ডে, কম্বোডিয়ায়, মায়ানমারে, লাওসে এবং অবশ্যই বাংলাদেশে।

পৌষ ও মাঘ মাসের সন্ধিক্ষণের তিথিটির নাম সংক্রান্তি। সাধারণত হিন্দু বা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পঞ্জিকায় এই দিনটিকে বলা হয়ে থাকে মকর সংক্রান্তি। আর এই সংক্রান্তিতে দেশ-বিদেশের নানা স্থানে দেখা যায় বিভিন্ন নিয়ম মেনে পালিত হচ্ছে নানা আচার অনুষ্ঠান।

সংক্রান্তি’ শব্দটি সংস্কৃত থেকে এসেছে। সংক্রান্তি শব্দের অর্থ সঞ্চার বা গমন। সাধারণত সূর্যের এক রাশি থেকে অন‍্য রাশিতে গমন বা প্রবেশ করাকে বোঝানো হয়।

তবে এইদিন বিশেষ আচারটি হল গঙ্গাস্নান বা নদীবক্ষে স্নানের রীতি। হিন্দু ধর্মের পৌরাণিক ইতিহাসে কিংবদন্তি আছে যে এইদিনে কপিল মুনির আশ্রমে পুণ‍্যতোয়া গঙ্গা প্রবেশ করেছিল। আর সেই সঙ্গে মুক্তি পায় রাজা সগরের ষাট হাজার পুত্র।

সেই কারণে এই কাহিনির কথা স্মরণে রেখে মনে করা হয় যে এই পুণ‍্যতিথিতে গঙ্গা স্নান অত‍্যন্ত পুণ‍্যের। যেহেতু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে গঙ্গা হল পুণ‍্যতোয়া, পতিতোদ্ধারিণী এবং পুণ‍্যদায়িনী, তাই তার পবিত্র স্পর্শে দেহমনের সমস্ত পাপ বা কলুষ মুছে যায়।

এই পৌরাণিক কাহিনিকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গে গঙ্গাসাগর মেলার বিশাল আয়োজন হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাধু-সন্ন‍্যাসীরা আসেন সাগরসঙ্গমে স্নান করার জন্য। সাধারণ পুণ‍্যার্থীরাও দলে দলে আসেন।

আরেকটি কিংবদন্তিও আছে। শোনা যায়, মকর সংক্রান্তিতে মহাভারতের মহাবীর পিতামহ ভীষ্ম শরশয‍্যা থেকে ইচ্ছামৃত‍্যু গ্রহণ করেছিলেন। তাই দিনটি একটি বিশেষ দিন। এছাড়াও শোনা যায়, সূর্য এই তিথিতে নিজের ছেলে মকর রাশির অধিপতি শনির বাড়িতে এক মাসের জন‍্য ঘুরতে গিয়েছিলেন।

সনাতন ধর্মের পৌরাণিক কাহিনির শেষ নেই যেন। আরও একটি জনশ্রুতি রয়েছে যে, এই বিশেষ দিনে দেবতাদের সঙ্গে অসুরদের যুদ্ধ শেষ হয়েছিল। অসুর নিধন করে তাদের খণ্ডিত মুণ্ডু পুঁতে দেওয়া হয় মন্দিরা পর্বতে। সেই থেকে অশুভ শক্তির বিনাশ করে শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠা এই তিথির অন‍্যতম উদ্দেশ‍্য।

রাশিচক্রের নিরিখে এই তিথিতে সূর্য মকর রাশি যাকে ইংরেজিতে ক‍্যাপ্রিকর্ন বলা হয়, সেখানে প্রবেশ করে। প্রায় প্রতি বছর জানুয়ারি মাসের ১৪ বা ১৫ তারিখে মকর সংক্রান্তি পালিত হয় ।

সংক্রান্তি’ শব্দটি সংস্কৃত থেকে এসেছে। সংক্রান্তি শব্দের অর্থ সঞ্চার বা গমন। সাধারণত সূর্যের এক রাশি থেকে অন‍্য রাশিতে গমন বা প্রবেশ করাকে বোঝানো হয়। এছাড়া মাসের শেষদিনকে অর্থাৎ যে দিন মাস পূর্ণ হয় সেই দিনকেই সংক্রান্তি বলা হয়।

এইদিন বিশেষ আচারটি হল গঙ্গাস্নান বা নদীবক্ষে স্নানের রীতি

রাশিবিজ্ঞানীরা বলছেন, এক হাজার বছর আগে মকর সংক্রান্তি হত ৩১ ডিসেম্বর নাগাদ। আবার পাশাপাশি তাঁদের হিসেব মতো আগামী এক হাজার বছর পরে মকর সংক্রান্তি পড়বে ফেব্রুয়ারি মাসে। ফলে দেখা যাচ্ছে শীতের প্রকোপ হ্রাস বা বৃদ্ধির সঙ্গে এই তিথির কোনো সম্পর্ক নেই।

যদিও সমাজে জনশ্রুতি পৌষ সংক্রান্তিতে ভয়ানক শীত পড়ে। যাইহোক দেখা যায় পৌষ সংক্রান্তির পর শীতের কামড় কমতে থাকে। সূর্যের উত্তরে যাত্রার ফলে আবহাওয়ার এই পরিবর্তন লক্ষ‍্য করা যায়। একে উত্তরায়ণ বলা হয় ।

মকর সংক্রান্তি তিথিতে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর পালিত যে সমস্ত উৎসব সেসবের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, মূলত ফসল উৎপাদনকে কেন্দ্র করেই বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। বঙ্গভূমি যেহেতু নদীমাতৃক আর্দ্র জলবায়ু অঞ্চল তাই ফসল উৎপাদনের সঙ্গে এখানকার উৎসবে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ লক্ষ‍্য করা যায়।

পৌষ সংক্রান্তিতে গ্রাম বাংলার ঘরে ঘরে পিঠেপুলির আয়োজন চোখে পড়ে। সনাতন হিন্দুরা পিতৃপুরুষ ও বাস্তুদেবতার জন‍্য শীতের খেজুর গুড় আর তিল দিয়ে তৈরি তিলুয়া নৈবেদ‍্য হিসেবে উৎসর্গ করে।

পৌষ সংক্রান্তিতে গ্রাম বাংলার ঘরে ঘরে পিঠেপুলির আয়োজন চোখে পড়ে। সনাতন হিন্দুরা পিতৃপুরুষ ও বাস্তুদেবতার জন‍্য শীতের খেজুর গুড় আর তিল দিয়ে তৈরি তিলুয়া নৈবেদ‍্য হিসেবে উৎসর্গ করে। এছাড়াও নতুন চালের গুড়োয় তৈরি পিঠে ও পায়েসকেও অর্ঘ‍্য দেয়।

গ্রাম বাংলার নানা প্রান্তে পিঠে গড়ার সময় ছড়াগান গেয়ে থাকেন গৃহবধূরা। পশ্চিমবঙ্গে বাঁকুড়া, পুরুলিয়ায় টুসু উৎসব হয় এইসময়ে। নাচে গানে মাতোয়ারা হয় এখানকার আদিবাসীরা।

তামিলনাড়ু যার পূর্বতন নাম ছিল মাদ্রাজ, সেখানে মকর সংক্রান্তির দিন মহাধুমধাম করে পোঙ্গল পালন করা হয়। জীর্ণ পুরাতনকে বিসর্জন দিয়ে নতুনের আবাহন হল পোঙ্গলের মূলমন্ত্র। পাশাপাশি পাঞ্জাবে পালিত হয় লোহরি।

ভীষণ শীতের প্রকোপ থেকে বাঁচতে এইদিনে কাঠকুটো জড়ো করে আগুন জ্বালান পাঞ্জাবিরা। এরপর চাল-ডাল-ও মরশুমি সবজি দিয়ে খিচুড়ি তৈরি করে সকলে মিলে মহানন্দে তা খেয়ে থাকে। সঙ্গে থাকে সুজির হালুয়া আর দুধ, গুড় ও চালের পায়েস।


দীপান্বিতা দে : শিশুতোষ গ্রন্থপ্রণেতা ও প্রাবন্ধিক