উৎসব

রথযাত্রার কাহিনি

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বারো মাসে তেরো পার্বণের অন্যতম প্রধান পার্বণ যে রথযাত্রা, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। ঘন বর্ষার দিনে আষাঢ়ের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে মূলত পূর্ব ভারতে রথযাত্রা মহাধুমধামে উদ্‌যাপিত হতে দেখা যায়। 

বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী পুরী শহরেই এর ব্যাপক আকার আজ সারা পৃথিবীর সব ধর্মের মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

কিন্তু কীভাবে এই রথযাত্রার প্রচলন হয়েছে, তা জানতে ফিরে যেতে হয় পুরাকালে। পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে জানা যায়— শ্রীকৃষ্ণের প্রয়াণের পর দ্বারকার সাগরপারে তাঁর দেহ সৎকার অসম্পূর্ণ থেকে যায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে। সেই অর্ধদগ্ধ দেহ সাগরের জলে ভাসতে ভাসতে তৎকালীন কলিঙ্গ রাজ্যের সমুদ্রোপকূলে এসে পৌঁছায়।

সেখানে তখন শবর আদিবাসীদের দল সেই অর্ধদগ্ধ মৃতদেহটিকে কাছের এক গভীর অরণ্যে নিয়ে গিয়ে ‘নীলমাধব’ নামে পূজা করতে শুরু করে। পরে একটি মন্দিরও বানায় তারা।

ধীরে ধীরে নীলমাধবের খ্যাতি চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়লে পার্শ্ববর্তী অবন্তী নগরের রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন (যিনি কিনা বিষ্ণুর ভক্ত ছিলেন) সেই নীলমাধবকে নিজের কাছে নিয়ে আসতে গেলে শবরদের কাছে প্রতিহত হন।

পরাজিত ইন্দ্রদ্যুম্ন তখন বিষ্ণুর শরণাপন্ন হলে বিষ্ণু স্বপ্নে জানান পুরীর সমুদ্র উপকূলে একটি কাঠের টুকরো ভেসে এলে সেই কাঠের টুকরো দিয়ে নীলমাধবের মূর্তি বানিয়ে পূজা করতে।

এরপর বন্ধ ঘরে শুরু হয় মূর্তি গড়ার কাজ। কারণ, বৃদ্ধ দারুশিল্পীর কড়া নির্দেশ ও নিষেধ ছিল যে মূর্তি গড়ার সময় কেউ যেন কাজে বাধা না দেয়। এদিকে ইন্দ্রদ্যুম্নের আর তর সয় না।

একদিন অধৈর্য হয়ে কাজের অগ্রগতি দেখতে কৌতূহলবশত দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে দেখেন মূর্তি অর্ধসমাপ্ত ও দারুশিল্পীও নেই। পুরাণ বলে, এই শিল্পী হলেন স্বয়ং বিশ্বকর্মা। তখন ইন্দ্রদ্যুম্নের হা-হুতাশ করা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না।

তাঁকে বিমর্ষ হতে দেখে নারদ মুনি পরামর্শ দেন যে এই অর্ধসমাপ্ত মূর্তিকেই পূজা করতে। সেই থেকে পুরীর মন্দিরে জগন্নাথদেব পূজিত হয়ে আসছেন এবং রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নই পুরীর রথযাত্রার প্রচলন করেন।

প্রতিবছরই অক্ষয় তৃতীয়ার দিন পুরীর রাজার প্রাসাদের সামনে প্রশস্ত স্থানে রথ তৈরির কাজ শুরু হয়। রথযাত্রা শুরুর ষোলো দিন আগে মহাধুমধাম করে স্নানযাত্রা হয়। সাধারণত জ্যৈষ্ঠ মাসের পূর্ণিমায় জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরামকে স্নান করানো হয়ে থাকে।

যথারীতি তারপর জগন্নাথদেবের জ্বর আসে। তখন এক পক্ষকাল জগন্নাথদেব মন্দিরের মধ্যে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের আড়ালে থাকেন। এই সময় নতুন মূর্তি তৈরি হয় তিন দেবতার।

এরপর রথের দিন তিনটি আলাদা আলাদা রথে চাপেন জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরাম। রথগুলোকে ফুলের মালা দিয়ে সাজানো হয়। মূল মন্দির থেকে রথ যাত্রা শুরু করে তিন কিলোমিটার দূরের গুন্ডিচা মন্দিরে পৌঁছায়। সেটাই তাঁদের ‘মাসির বাড়ি’। 

জগন্নাথের ৪৫ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট ১৬ চাকার রথের নাম নান্দীঘোষ বা কপিধ্বজ। রথে জগন্নাথের সঙ্গী থাকেন মদনমোহন এবং সারথি ও রক্ষী হলেন দারুকা ও গরুড়।

যদিও রথযাত্রী হিসেবে আরও ৯ দেবতা নান্দীঘোষে অবস্থান করেন। তাঁরা হলেন গোবর্ধন, কৃষ্ণ, নরসিংহ, রাম, নারায়ণ, হনুমান, রুদ্র, বরাহ ও ত্রিবিক্রম।

৮৩২টি কাঠের টুকরো জোড়া লাগিয়ে বানানো হয় নান্দীঘোষকে। লাল ও হলুদ কাপড়ে মোড়া নান্দীঘোষের মাথায় ত্রৈলোক্যমোহিনী ধ্বজা ওড়ানো হয়। রথ টানে শঙ্খ, বলাহক, শ্বেতা ও হরিদাশ্ব নামের চারটি ঘোড়ার প্রতীক। এই রথের দড়ির নাম শঙ্খচূড়া নাগুনি।

এ ছাড়া সুভদ্রা ও বলরামের রথের নাম যথাক্রমে দর্পদলন বা পদ্মধ্বজ এবং তালধ্বজ। ১২ চাকাবিশিষ্ট পদ্মধ্বজের উচ্চতা ৪৩ ফুট এবং ১৪ চাকাবিশিষ্ট তালধ্বজের উচ্চতা ৪৪ ফুট। পদ্মধ্বজ ৫৯৩টি ও তালধ্বজ ৭৬৩টি কাঠের টুকরোর দ্বারা নির্মিত। 

পদ্মধ্বজের বৈশিষ্ট্য হলো লাল ও কালো কাপড়ে মোড়া এবং মাথায় নদম্বিকা পতাকা ওড়ে। তালধ্বজে থাকে লাল ও সবুজ কাপড়ের সাজসজ্জা, সঙ্গে মাথায় উন্নানি পতাকা শোভা পায়। সুভদ্রার রথের সারথি অর্জুন ও রক্ষী জয়দুর্গা। রশি বা দড়ির নাম স্বর্ণচূড়া নাগুনি।

একই রকমভাবে বলরামের রথের সারথি ও রক্ষী মাতলি ও বাসুদেব। রশির নাম বাসুকি নাগ। দুটি রথেই চারটি করে মোট আটটি ঘোড়া আছে।

পুরীর রাজা কপিধ্বজ, পদ্মধ্বজ ও তালধ্বজের যাত্রার প্রাক্কালে সোনার ঝাঁটা দিয়ে যাত্রাপথ ঝাঁটানোর পর শুরু হয় রথযাত্রা।

এক সপ্তাহ পর উল্টোরথে জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরাম—তিন ভাইবোন ফিরে আসেন নিজের বাড়িতে। পরে রথ তিনটির কাঠ খুলে নিয়ে মূল মন্দিরে জগন্নাথদেবের ভোগের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই রথযাত্রার বিশেষত্ব হলো সব জাত-শ্রেণিনির্বিশেষে অংশগ্রহণ।

বাংলা সাহিত্যে রথযাত্রা নিয়ে বঙ্কিমচন্দ্র থেকে রবীন্দ্রনাথ অনেকেই লিখেছেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাস ‘রাধারানী’তে মাহেশের রথের মেলায় রাধারানীর হারিয়ে যাওয়ার কাহিনি রয়েছে। মাহেশের রথের বয়স ৬৩০ বছর। 

ঐতিহ্য ও প্রাচীনত্বে এই মাহেশের রথ বাংলার প্রথম এবং বিশ্বের দ্বিতীয়। কিংবদন্তি আছে, জগন্নাথদেবের ভক্ত ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারী পুরীতে গিয়ে দেবতার দর্শন না পেয়ে মনঃকষ্টে উপবাস করতে শুরু করলে দেবতা স্বপ্নে তাঁকে গঙ্গার ধারে বসে অপেক্ষা করতে আদেশ করেন।

শ্রীরামপুরের কাছে মাহেশের ঘাটে গঙ্গায় নিমকাঠ ভেসে এলে তিনি সেই কাঠ দিয়ে জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরামের মূর্তি তৈরি করে পূজা দেন।

শোনা যায়, পুরী যাওয়ার পথে নবদ্বীপ থেকে এসে শ্রীচৈতন্য মাহেশের এই জগন্নাথ মন্দির দর্শন করেছিলেন। চৈতন্যদেব পুরীর সঙ্গে নাম মিলিয়ে এই স্থানের নামকরণ করেছিলেন নব-নীলাচল। পরবর্তী সময়ে শ্রীরামকৃষ্ণদেবও মাহেশের রথ দেখতে গিয়েছিলেন।

এই রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে শেরশাহ নির্মিত গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের দুই পাশে মেলা বসে। বঙ্কিমচন্দ্র এই মেলার কথাই উপন্যাসে লিখেছেন।

বাংলাদেশেও অনেক জায়গায় সাড়ম্বরে ও উৎসবমুখর পরিবেশে রথযাত্রা উদ্‌যাপিত হয়। বাংলাদেশে রথযাত্রার মহাসমারোহ ঘটে ঢাকার ধামরাইতে।

বিষ্ণুর অবতার হিসেবে যশোমাধব দেবের মন্দিরের বিগ্রহ যশোমাধব, কানাই ও বলাই এবং আদ্যাদেবীর মূর্তি শোভিত ছয়তলাবিশিষ্ট বিশাল রথ গত ৪০০ বছরের বেশি সময় ধরে টানা হয়। এই শোভাযাত্রায় দূরদূরান্ত থেকে ভক্তরা এসে যোগ দেন।

এই রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে এক মাসব্যাপী মেলা বসে। মেলায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নাগরদোলা, সার্কাস, পুতুলনাচ, মাটির পুতুল, বাঁশের খেলনা, বিভিন্ন কুটির শিল্পজাত সামগ্রী, খাবারের দোকান থাকে।

এই রথযাত্রাকে নিয়ে পল্লিকবি জসীমউদ্‌দীন লিখেছিলেন,

‘ধামরাই রথ, কোন অতীতের বৃদ্ধ সূত্রধর,

কতকাল ধরে গড়েছিল এরে করি অতি মনোহর।

সূক্ষ্ম হাতের বাটালি ধরিয়া কঠিন কাঠেরে কাটি,

কত পরী আর লতাপাতা ফুল গড়েছিল পরিপাটি।

রথের সামনে যুগল অশ্ব, সেই কত কাল হতে,

ছুটিয়া চলেছে আজিও তাহারা আসে নাই কোন মতে।’

  • দীপান্বিতা দে : শিশুতোষ গ্রন্থপ্রণেতা ও প্রাবন্ধিক