পুরাকালে অযোধ্যার সূর্যবংশীয় রাজা অজের পুত্র ছিলেন রাজা দশরথ। তাঁর তিন রানি হলেন কৌশল্যা, কৈকেয়ী ও সুমিত্রা। কথিত আছে পূর্বজন্মে দশরথ ও কৌশল্যা দেবী এক আশীর্বাদ লাভ করেন, যে আশীর্বাদে ছিল ভগবান বিষ্ণুর সপ্তম অবতারের পিতামাতা হওয়ার দুর্লভ সম্মান।
এদিকে বিবাহের বহু বছর পরও তাঁদের কোনো সন্তান হচ্ছে না দেখে একদিন বশিষ্ঠ মুনির পরামর্শে রাজা দশরথ ঠিক করলেন সরযূ নদীর তীরে পুত্রকামেষ্ঠি যজ্ঞ করবেন। সেই অনুযায়ী তিনি বিশাল আয়োজন করেন যজ্ঞের।
যজ্ঞশেষে অগ্নিদেব হবিষ্যাণ পায়েসের একটি পাত্র হাতে নিয়ে আবির্ভূত হন। অগ্নিদেব রাজা দশরথকে আশীর্বাদ করলেন এবং তাঁকে সেই দিব্য পায়েষান্ন্য তাঁর স্ত্রীদের মধ্যে ভাগ করে দিতে বললেন।
দশরথ পায়েসকে তিন ভাগ করে তিন স্ত্রীকে দিলেন খেতে। রানিরা তিনজনেই এরপর গর্ভবতী হন। রানিদের মধ্যে তখন আনন্দের বন্যা বইতে লাগল।
এরপর দিন কাটে, মাস পার হয়ে চৈত্র মাস এসে পড়ে। চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষের নবমী তিথিতে যখন সমস্ত গ্রহের অবস্থান অনুকূল পরিস্থিতিতে ছিল, তখন চারপাশের প্রকৃতিও ছিল মনোরম। এই দিনে দশরথের প্রথম স্ত্রী কৌশল্যা দেবী একটি পুত্রসন্তান প্রসব করেন।
বিষ্ণুর সহস্রনামের মধ্যে ৩৯৪তম নামটি হল রাম। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, ভগবান বিষ্ণু ত্রেতা যুগে অধর্ম বিনাশ করে ধর্মের পুনঃস্থাপনের জন্য রাম রূপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।
চারিদিকে এই খবর ছড়িয়ে পড়লে অযোধ্যা নগরীর প্রজারা আনন্দ উৎসবে মেতে ওঠে। এমনকী স্বর্গ থেকে দেবতারাও অযোধ্যা নগরীর উপর পুষ্পবৃষ্টি করেন।
সেদিন আরও তিন পুত্রের জন্ম দেন কৈকেয়ী ও সুমিত্রা। তাঁরা হলেন ভরত, লক্ষ্মণ ও শত্রুঘ্ন। কৈকেয়ী হলেন ভরতের জননী আর সুমিত্রা ছিলেন লক্ষ্মণ ও শত্রুঘ্নের।
এরা চারজনই বিষ্ণুর অবতার। তাঁদের নামকরণের জন্য বশিষ্ঠ মুনির উপর ভার দেওয়া হয়। সর্বপ্রথমে তিনি রামের নাম রাখেন, যা তিনটি অক্ষর নিয়ে গঠিত ‘র – অ – ম’। এই তিনটি অক্ষর অগ্নি, ভানু এবং হিমকার (আগুন, সূর্য, চন্দ্র)-এর মূল মন্ত্রের প্রতীক।
বিষ্ণুর সহস্রনামের মধ্যে ৩৯৪তম নামটি হল রাম। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, ভগবান বিষ্ণু ত্রেতা যুগে অধর্ম বিনাশ করে ধর্মের পুনঃস্থাপনের জন্য রাম রূপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।
দশরথের ঘরে এই চার পুত্রের অভিষেক লগ্নকে স্মরণীয় করার জন্য এই দিনটি রাম নবমী হিসেবে পালন করা হয়ে থাকে।
পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থিত সনাতন ধর্মাবলম্বীরাও এই পবিত্র তিথিকে যথাযোগ্যভাবে স্মরণ করে থাকেন। সর্বত্র মন্দির আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হয়।
রাম নবমী বৈদিক যুগেও পালিত হত। মধ্যযুগে ভারতে ভক্তি আন্দোলনের সময় এটি জনপ্রিয়তা লাভ করে। এখনও চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষের নবমী তিথিতে ভারতের অযোধ্যা থেকে শুরু করে সারাদেশে রাম নবমী উৎসব পালিত হয়।
এই উপলক্ষ্যে ভগবান রামের ছোট মূর্তি তৈরি করে তাঁকে পোশাক পরানো, স্নান করানো এবং পরে দোলনায় রাখা হয়। অনেকেই দিনভর উপবাস বা ব্রত পালন করেন, পবিত্র সরযূ নদীতে স্নান করেন।
পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থিত সনাতন ধর্মাবলম্বীরাও এই পবিত্র তিথিকে যথাযোগ্যভাবে স্মরণ করে থাকেন। সর্বত্র মন্দির আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হয়। সেখানে রামায়ণ পাঠ, ভজন ও কীর্তন বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দিনটি পালিত হয়ে থাকে।
বিভিন্ন শহরে রাম, সীতা ও লক্ষ্মণের মূর্তিশোভিত শোভাযাত্রা বের হয়। বিভিন্ন জায়গায় মেলা বসে।
অশুভ শক্তির উপর শুভ শক্তির বিজয় এবং আদর্শ জীবনবোধে সত্য, ন্যায়পরায়ণতা, ত্যাগ ও সৌহার্দ্যের গুরুত্ব উপলব্ধি ও জাগ্রত করাই এই উৎসব পালনের মূল লক্ষ্য।
দীপান্বিতা দে : প্রাবন্ধিক ও শিশুতোষ গ্রন্থপ্রণেতা