ধর্ম–দর্শন

‘প্রত্যেকটি ভালো কাজই সদকা’

ইসলামে ‘সদকা’ বা দান কেবল বিত্তশালীদের জন্য নির্ধারিত কোনো ইবাদত নয়, বরং এটি প্রতিটি মুমিনের জন্য প্রতিদিনের একটি জীবনধারা।

নবীজি (সা.)-এর গভীর অর্থপূর্ণ সংক্ষিপ্ত বাণীগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো, “প্রত্যেকটি ভালো কাজই সদকা।”

এই নির্দেশনার মাধ্যমে তিনি দানের ধারণাকে অর্থের গণ্ডি থেকে বের করে এনে এক বিশাল মানবিক ও নৈতিক দিগন্তে ছড়িয়ে দিয়েছেন।

হাদিসের পাঠ ও অর্থ

হজরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে আছে, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, “প্রত্যেকটি নেক কাজ বা কল্যাণকর কাজই হলো সদকা।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০২১)

মুহাদ্দিসদের মতে, এখানে ‘সদকা’ মানে হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে সওয়াব বা পুরস্কার। যদি কেউ সওয়াবের নিয়তে ভালো কাজ করে, তবে সে নিশ্চিতভাবে পুরস্কার পাবে। আর যদি নিয়ত ছাড়াও স্বাভাবিক পরোপকার করে, তবে তাতেও আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিদানের সম্ভাবনা থাকে।

সদকার ব্যাপকতা: টাকা ছাড়াও যা করা সম্ভব

ইসলামি আইনজ্ঞদের মতে, ‘মারুফ’ বা কল্যাণকর কাজ বলতে এমন প্রতিটি কথা বা কাজকে বোঝায়, যা শরিয়ত ও বিবেক অনুযায়ী সুন্দর।

ইবনুল বাত্তাল (র.)-এর মতে, কোনো ব্যক্তি যা কিছু কল্যাণকর বলে বা করে, তা-ই তার জন্য সদকা হিসেবে লেখা হয়। এর ফলে একজন হতদরিদ্র মানুষও একজন ধনাঢ্য ব্যক্তির সমান সওয়াব অর্জনের সুযোগ পায়।

নিচে হাদিসে বর্ণিত আর্থিক নয় এমন কিছু সদকার উদাহরণ দেওয়া হলো:

১. জিকির ও তাসবিহ: সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার এবং লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা প্রতিটিই এক একটি সদকা।

নবীজি (সা.) গরিব সাহাবিদের সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, তোমরা ধনী হতে না পারলেও জিকিরের মাধ্যমে তাদের সমান সওয়াব পেতে পারো। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০০৬)

২. সামাজিক সদাচার ও সাহায্য:

  • ভাইয়ের সামনে মুচকি হাসি দেওয়া।

  • পথ হারানো ব্যক্তিকে পথ দেখানো।

  • দৃষ্টিহীন বা ক্ষীণদৃষ্টির ব্যক্তিকে পথ চলতে সাহায্য করা।

  • রাস্তা থেকে পাথর, কাঁটা বা হাড় সরিয়ে দেওয়া।

  • নিজের বালতি থেকে পানি অন্যের পাত্রে ঢেলে দেওয়া। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৯৫৬)

৩. শরীর ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের শুকরিয়া: আমাদের শরীরের প্রতিটি জোড়া বা হাড়ের বিপরীতে প্রতিদিন সদকা দেওয়া আবশ্যক।

মানুষের শরীরে ৩৬০টি জোড়া রয়েছে। কেউ যদি ৩৬০ বার জিকির করে অথবা মানুষকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকে কিংবা পথ থেকে আবর্জনা সরায়, তবে সে ঐ দিনের জন্য তার শরীরকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করে নিল। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০০৭)

৪. দাম্পত্য সম্পর্ক ও ন্যায়বিচার: এমনকি নিজের স্ত্রীর সঙ্গে সময় কাটানো বা দুজন মানুষের বিবাদ মিটিয়ে দেওয়াও সদকা হিসেবে গণ্য হয়। নবীজি (সা.) শিখিয়েছেন, হালাল উপায়ে চাহিদা পূরণ করাও ইবাদত।

৫. অনিষ্ট করা থেকে বিরত থাকা: কেউ যদি নেক কাজ করার ক্ষমতা বা সুযোগ না পায়, তবে সে যেন অন্তত অন্যের ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকে। আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর ভাষায়, নিজের অনিষ্ট থেকে মানুষকে বাঁচিয়ে রাখো, কারণ এটিও তোমার নিজের জন্য একটি সদকা।

কেন এই ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ?

ইসলামের এই শিক্ষায় কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বার্তা রয়েছে:

  • আশার আলো: এটি গরিব-ধনী নির্বিশেষে সবার জন্য সওয়াবের দুয়ার খুলে দেয়।

  • সামাজিক শান্তি: হাসি, রাস্তা পরিষ্কার রাখা এবং মানুষকে সাহায্য করার মাধ্যমে একটি মানবিক ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠিত হয়।

  • সতত ইবাদত: এটি আমাদের শেখায় যে, ইবাদত কেবল জায়নামাজে সীমাবদ্ধ নয়; বরং দিনযাপনের প্রতিটি ভালো কাজই আল্লাহর সন্তুষ্টির মাধ্যম।

আমরা অনেক সময় বড় কোনো নেক কাজ করার সুযোগ খুঁজি, অথচ হাতের কাছে থাকা ছোট ছোট ভালো কাজগুলো অবহেলা করি।

একজনের মন ভালো করে দেওয়া একটি হাসি কিংবা রাস্তা থেকে সরানো একটি কাঁটা যে আল্লাহর কাছে সদকা হিসেবে কবুল হতে পারে—এই বিশ্বাস আমাদের জীবনকে আরও সুন্দর ও সার্থক করে তুলতে পারে।