অনেকেই ইসলাম পালনের শুরুতে প্রবল উদ্যম নিয়ে প্রায় সব ধরনের ইবাদত শুরু করেন। কিন্তু একপর্যায়ে অতিরিক্ত বোঝার চাপে ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে ইবাদত ছেড়ে দেন এবং পূর্বাবস্থায় ফিরে যান।
কখনও কখনও তাদের ইমানের অবস্থা আগের চেয়েও শোচনীয় হয়ে যায়। আবার অনেকে ইবাদতে মনোযোগ দিতে পারেন না বলে এর প্রকৃত স্বাদও পান না।
ইসলামের পথে নতুন পথচলায় অনেকেই মোস্তাহাব (পছন্দনীয়) বিষয়কে ওয়াজিব পর্যায়ের মনে করে ফেলেন কিংবা মোবাহ (বৈধ) বিষয়কে হারাম ভেবে বসেন।
আধ্যাত্মিকতার সর্বোচ্চ স্তর তথা ‘ইহসান’-এর স্তরে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময়ের সাধনা প্রয়োজন। প্রাথমিক স্তরের মুসলিমদের জন্য এই আধিক্য মাঝে মাঝে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
ইসলাম কখনোই ইবাদতে বাড়াবাড়ি করতে বলে না, আবার সব ছেড়ে দিতেও বলে না। ইসলাম সহজ ও মধ্যমপন্থার এক ধর্ম। অতিরিক্ত আমল যেন আমাদের ওপর এতটা ভারী না হয়ে যায় যে, আমাদের ফরজ আমলেই অলসতা চলে আসে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সাধ্য জানেন। তিনি তাঁর প্রিয় বান্দাদের ওপর এমন কোনো বোঝা চাপিয়ে দেন না যা বহন করা অসম্ভব। “আল্লাহ কারো ওপর তার সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে দেন না।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৮৬)
আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য পরিমাণের চেয়ে ধারাবাহিকতা ও ইখলাস অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ছোট আমল হলেও যদি তা নিয়মিত করা হয়, তবে তা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয়।
আমল ছোট হোক বা বড়, তা আল্লাহর কাছে পৌঁছাতে হলে ‘ইখলাস’ বা বিশুদ্ধ নিয়ত থাকা জরুরি। ইখলাস মানে হলো আমলটি শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা।
আল্লাহর রাসুল (সা.) ইখলাসপূর্ণ আমলের গুরুত্ব বুঝিয়ে বলেছেন, “আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা শুধু সে আমলই গ্রহণ করেন, যা ইখলাসের সাথে এবং শুধু তাঁকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে করা হয়।” (সুনান নাসায়ি, হাদিস: ৩১৪০)
আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য পরিমাণের চেয়ে ধারাবাহিকতা ও ইখলাস অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ছোট আমল হলেও যদি তা নিয়মিত করা হয়, তবে তা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয়।
আম্মাজান আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, আল্লাহর রাসুল (সা.) এক নারীকে (তার অত্যধিক নামাজের বর্ণনার প্রেক্ষিতে) উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, “থামো, তোমাদের যতটুকু সামর্থ্য আছে ততোটুকুই করা উচিত। আল্লাহর শপথ, আল্লাহ তাআলা ততোক্ষণ পর্যন্ত সওয়াব দিতে বিরত হন না, যতক্ষণ না তোমরা নিজেরা পরিশ্রান্ত হয়ে পড়। আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয় আমল সেটাই, যা আমলকারী নিয়মিত করে থাকে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৭৮৫)
অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়ার চেয়ে অল্প আলোর পথ আঁকড়ে ধরে থাকাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। দ্রুত দৌড়ে থেমে যাওয়ার চেয়ে ধৈর্য ধরে ধীরে গন্তব্যে পৌঁছানো অনেক ভালো।
ইবাদতের শুরুর দিকের প্রবল উদ্যমকে কীভাবে কাজে লাগানো উচিত, সে সম্পর্কে খ্যাতিমান আলেম আহমাদ মুসা জিবরিল একটি চমৎকার উপমা দিয়েছেন, ইবাদত করা হলো নতুন গাড়ি কেনার মতো। দোকানদার আপনাকে বলে দেবে—আস্তে আস্তে ইঞ্জিনের জড়তা কাটাতে। শুরুতেই সত্তর মাইল বেগে চালাতে শুরু করলে হবে না। এক দিনে অনেক ইবাদত করে পরদিন ছেড়ে দেওয়ার চাইতে, নিয়মিত অল্প অল্প ইবাদত করাই উত্তম।” (ধূলিমলিন উপহার: রামাদান)
ফরজ আমলের পাশাপাশি আমরা এমন কিছু নফল আমল বেছে নিতে পারি যা নিয়মিত করা আমাদের জন্য সহজ হবে:
শেষ রাতের দুই রাকআত সালাত (তাহাজ্জুদ)।
চাশতের নামাজ বা দিনের প্রথম প্রহরের নফল নামাজ।
প্রতিদিন নিয়মিত কিছুটা সময় কোরআন তেলাওয়াত।
প্রতিটি ফরজ নামাজের পর জিকির ও ইস্তিগফার।
সাধ্যমতো নিয়মিত কিছু সদকা করা।
অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়ার চেয়ে অল্প আলোর পথ আঁকড়ে ধরে থাকাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। দ্রুত দৌড়ে থেমে যাওয়ার চেয়ে ধৈর্য ধরে ধীরে গন্তব্যে পৌঁছানো অনেক ভালো।
আল্লাহ তাআলা আমাদের আমলগুলোকে ইখলাসপূর্ণ করুন এবং আমাদের চিরস্থায়ী গন্তব্যে পৌঁছানোর পথ সহজ করে দিন। আমিন।
writerismat@gmail.com
ইসমত আরা: শিক্ষক ও লেখক