
এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করে যদি আপনাকে একটি ‘দানকৃত সম্পদ’ বা ‘ওয়াকফ’ কল্পনা করতে বলা হয়, তবে আপনার চোখের সামনে কী ভেসে উঠবে?
সম্ভবত একটি বহুতল আবাসিক ভবন যার ভাড়া গরিবদের মাঝে বিলিয়ে দেওয়া হয়, অথবা একটি বিশাল খেজুর বাগান, কিংবা কোনো মসজিদ বা মাদ্রাসা। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আমাদের সামষ্টিক মানসপটে ওয়াকফের এই ‘প্রথাগত প্রতিচ্ছবি’ গেঁথে আছে।
আমাদের কাছে ওয়াকফ মানেই হলো স্থাবর সম্পত্তি, জমি বা দালানকোঠা—এমন কিছু যা শক্ত, ছোঁয়া যায় এবং যার গায়ে হাত দিয়ে বলা যায়, “এটি আল্লাহর মালিকানাধীন সম্পদ।”
কিন্তু বর্তমান একবিংশ শতকে আমরা সম্পদের ধারণায় এক ঐতিহাসিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলোর দিকে তাকান—গুগল, মাইক্রোসফট বা অ্যাপলের প্রকৃত সম্পদ কোথায়?
একটি আবাসিক ভবন ওয়াকফ করার পরিবর্তে আপনি জীবন রক্ষাকারী কোনো ওষুধের ‘পেটেন্ট’ বা স্বত্ব ওয়াকফ করেন যা লাখো মানুষের প্রাণ বাঁচাবে, অথবা একটি শিক্ষামূলক মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ওয়াক্ফ করেন যা বিনামূল্যে লাখো শিক্ষার্থী ব্যবহার করবে
তাদের অফিস ভবন বা জমির মালিকানায়? উত্তরটি হবে—না। তাদের প্রকৃত সম্পদ লুকিয়ে আছে ‘অস্পৃশ্য’ বা ‘বিমূর্ত’ (ইনটেঞ্জিবল) সম্পদের মাঝে; যেমন—সফটওয়্যার কোড, পেটেন্ট (বৌদ্ধিক স্বত্ব), ট্রেডমার্ক এবং ডেটা।
বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিকে সচল রাখার মূল চাবিকাঠি হলো এই ‘লুকানো রত্নগুলো’।
উন্নত অর্থনীতিগুলোতে এখন দৃশ্যমান সম্পদের চেয়ে অদৃশ্য বা বিমূর্ত সম্পদে বিনিয়োগের পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে গেছে। পৃথিবী ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার এখন ‘আইডিয়া’ বা চিন্তার পেছনে ব্যয় করছে। সেই বিবেচনায় অনেক আলেম ‘জ্ঞানভিত্তিক ওয়াক্ফের কথা সামনে এনেছেন।
একে সংজ্ঞায়িত করা যায় এভাবে, “জনকল্যাণে বৌদ্ধিক এবং জ্ঞানতাত্ত্বিক সম্পদ স্বেচ্ছায় এবং স্থায়ীভাবে উৎসর্গ করা।”
ধরুন, একটি আবাসিক ভবন ওয়াকফ করার পরিবর্তে আপনি জীবন রক্ষাকারী কোনো ওষুধের ‘পেটেন্ট’ বা স্বত্ব ওয়াকফ করেন যা লাখো মানুষের প্রাণ বাঁচাবে, অথবা একটি শিক্ষামূলক মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ওয়াকফ করেন যা বিনামূল্যে লাখো শিক্ষার্থী ব্যবহার করবে—তবে এর প্রভাব কতটুকু সুদূরপ্রসারী হতে পারে?
এখানে ওয়াকফের ধারণাটি কেবল জমির সীমানা থেকে বেরিয়ে এসে মেধাস্বত্ব, সফটওয়্যার এবং আধুনিক ডিজিটাল সম্পদের বিশাল আকাশে ডানা মেলেছে।
ইসলামি শরিয়তে সম্পদের এই ব্যাপক ব্যবহারের ভিত্তি পাওয়া যায়। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “তোমরা যা ভালোবাসো তা থেকে ব্যয় না করা পর্যন্ত তোমরা কখনোই পুণ্য লাভ করবে না।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৯২)
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, “এটি কি কোনো নতুন উদ্ভাবন বা বিদআত? আমাদের পূর্বসূরিরা কি স্থাবর সম্পত্তি ছাড়া অন্য কিছু ওয়াকফ করতেন?”
মিশরের আল-আজহার বা মরক্কোর আল-কারাউইন বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল সম্পূর্ণ ওয়াকফভিত্তিক। ওয়াকফের অর্থে কেবল দেয়ালই নির্মিত হয়নি, বরং পান্ডুলিপি তৈরি, বিজ্ঞানীদের সহায়তা এবং কালি ও কাগজের জোগানও নিশ্চিত করা হতো।
ওয়াকফ ছিল রাজনীতির প্রভাব থেকে ‘জ্ঞান’কে মুক্ত রাখার রক্ষাকবচ। অতীতের সেই ‘হস্তলিখিত পান্ডুলিপি’ আর ‘মাদ্রাসা’ আজ রূপান্তরিত হয়েছে ‘সফটওয়্যার’, ‘লার্নিং প্ল্যাটফর্ম’ এবং ‘পেটেন্টে’। কাঠামো পরিবর্তিত হলেও মূল সত্তা বা ‘সাদাকায়ে জারিয়া’ একই রয়ে গেছে।
যখন মানুষ মৃত্যুবরণ করে, তখন তিনটি মাধ্যম ছাড়া তার আমল বন্ধ হয়ে যায়: সদকায়ে জারিয়া, এমন জ্ঞান যা দ্বারা মানুষ উপকৃত হয় এবং নেককার সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬৩১
হাদিসে এসেছে, “যখন মানুষ মৃত্যুবরণ করে, তখন তিনটি মাধ্যম ছাড়া তার আমল বন্ধ হয়ে যায়: সদকায়ে জারিয়া, এমন জ্ঞান যা দ্বারা মানুষ উপকৃত হয় এবং নেককার সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬৩১)
এখানে লক্ষ্যণীয় যে, ‘উপকারী জ্ঞান’ নিজেই একটি সদকা বা ওয়াকফের মর্যাদা রাখে, যা যুগে যুগে নতুন রূপ নিতে পারে।
ডিজিটাল অর্থনীতির যুগে জ্ঞানভিত্তিক ওয়াকফের এমন কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা প্রথাগত স্থাবর সম্পত্তির নেই:
১. অবারিত বিস্তৃতি: একটি ভবনে সীমিত সংখ্যক মানুষ থাকতে পারে। কিন্তু একটি ওয়াকফকৃত শিক্ষামূলক অ্যাপ একই সময়ে পৃথিবীর পাঁচ মহাদেশের কোটি কোটি মানুষ ব্যবহার করতে পারে, যার জন্য অতিরিক্ত কোনো খরচও নেই।
২. ক্রমাগত ক্রমবর্ধমান মূল্য: দালানকোঠা পুরনো হলে সংস্কারের প্রয়োজন হয় এবং এর মান কমে। কিন্তু একটি ‘ওপেন সোর্স’ সফটওয়্যার বা বৌদ্ধিক সম্পদ মানুষ যত বেশি ব্যবহার ও উন্নত করে, তার মূল্য ও উপযোগিতা তত বাড়ে।
৩. দ্রুততা ও নমনীয়তা: বর্তমান দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে ডিজিটাল সম্পদ তৈরি এবং স্থানান্তর করা স্থাবর সম্পত্তির তুলনায় অনেক সহজ ও দ্রুত।
এত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও ‘জ্ঞানভিত্তিক ওয়াকফ’ বাস্তবায়নে কিছু আইনি ও ফতোয়ার জটিলতা রয়েছে। পূর্বেকার ফিকহি অনুসারে ওয়াকফের জন্য কিছু কঠোর শর্ত রয়েছে যা মূলত দৃশ্যমান সম্পদের ওপর ভিত্তি করে তৈরি:
স্থায়িত্বের শর্ত: ওয়াকফ হতে হবে চিরস্থায়ী। কিন্তু আইনিভাবে একটি পেটেন্টের মেয়াদ থাকে মাত্র ২০ বছর, এরপর তা উন্মুক্ত হয়ে যায়। এক্ষেত্রে চিরস্থায়িত্বের শর্ত কীভাবে পূরণ হবে?
হস্তান্তর বা দখল: ওয়াকফকৃত বস্তু অবশ্যই দখলযোগ্য (কব্জ) হতে হবে। কিন্তু একটি ‘আইডিয়া’ বা ‘সফটওয়্যার কোড’ কীভাবে হাতে ধরে বুঝিয়ে দেওয়া সম্ভব?
এই চ্যালেঞ্জগুলো দেখে মনে হতে পারে জ্ঞানভিত্তিক ওয়াকফ করা অসম্ভব। কিন্তু ইসলামি ফিকহ অত্যন্ত সুপরিসর।
যেমন—মালিকি মাজহাবে অস্থায়ী ওয়াকফ বা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ওয়াকফের বৈধতা রয়েছে। বর্তমান যুগের অনেক ইসলামি বিশেষজ্ঞ এই বিমূর্ত সম্পদের ওয়াকফকে বৈধ মনে করেন।
ইমাম আল-মাওয়ার্দি (রহ.) এবং পরবর্তী সময়ের ফকিহরা এ বিষয়ে সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ দিয়েছেন। তারা মনে করেন, সম্পদের উপযোগিতা বা মুনাফাই হচ্ছে ওয়াকফের আসল উদ্দেশ্য।
ওয়াকফের মূল উদ্দেশ্য হলো মূল বস্তুটিকে সংরক্ষিত রাখা এবং এর থেকে প্রাপ্ত উপকার বা মুনাফাকে আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করা।আল্লামা ইবনে কুদামা (রহ.)
ইবনে কুদামা তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, “ওয়াকফের মূল উদ্দেশ্য হলো মূল বস্তুটিকে সংরক্ষিত রাখা এবং এর থেকে প্রাপ্ত উপকার বা মুনাফাকে আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করা।” (আল-মুগনি, ৮/১৮৪, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৮৫)
এ সূত্র ধরে বলা যায়, যদি কোনো বৌদ্ধিক সম্পদ বা ডিজিটাল স্বত্ব থেকে জনকল্যাণমূলক মুনাফা অর্জিত হয়, তবে তাকে ওয়াকফের আওতায় আনা সম্ভব। বর্তমান যুগের ‘হুকমি দখল’ বা আইনি নিবন্ধনের মাধ্যমেই দখলের শর্ত পূরণ হতে পারে।
আমরা যদি আমাদের সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজগুলোকে টেকসই এবং আধুনিক করতে চাই, তবে ওয়াকফকে প্রথাগত ‘সেবা’ প্রদানকারী যন্ত্র থেকে আধুনিক ‘উন্নয়নমূলক’ হাতিয়ারে রূপান্তর করতে হবে।
জ্ঞানভিত্তিক ওয়াকফ কেবল সময়ের দাবি নয়, বরং আমাদের সভ্যতার হারানো ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের একটি সুযোগ। ট্রিলিয়ন ডলারের যে মেধা-সম্পদ আজ কেবল বাণিজ্যিক স্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে, তাকে যদি ওয়াকফের ছায়াতলে আনা যায়, তবে তা মুসলিম জাতির জন্য সীমাহীণ উপকারী হবে।
স্থাবর সম্পত্তির যুগ শেষ হয়ে যায়নি ঠিকই, কিন্তু ‘আইডিয়া’ বা চিন্তার মাধ্যমে বিশ্বকে জয় করার যুগ শুরু হয়ে গেছে অনেক আগেই।