ধর্ম–দর্শন

খাদ্য সুরক্ষায় ইসলামের ৫ দর্শন

খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু তাৎক্ষণিক কোনো ত্রাণ বিতরণ বা ব্যক্তিপর্যায়ের দান-খয়রাতের বিষয় নয়; বরং এটি পরিবেশগত প্রাচুর্য, রাষ্ট্রীয় দূরদর্শিতা এবং সুশাসনের এক সমন্বিত কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। আধুনিক বিশ্বে যখন খাদ্য সংকট, মূল্যস্ফীতি ও অপুষ্টি প্রকট আকার ধারণ করছে, তখন ইসলামি জীবনদর্শন ক্ষুধা দূরীকরণে এক সুদূরপ্রসারী ও বহুমাত্রিক রূপরেখা উপস্থাপন করে।

ইসলাম কৃষিকাজ ও বৃক্ষরোপণকে সদকায়ে জারিয়ার মর্যাদা দিয়েছে, শাসকদের নির্দেশ দিয়েছে জনগণের অভাব ও ক্ষুধার সরাসরি অংশীদার হতে এবং দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় রাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়ে তোলার স্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেছে।

মদিনা রাষ্ট্রের প্রধান হওয়া সত্ত্বেও নবীজির পারিবারিক জীবন ছিল চরম সংযমী ও কৃচ্ছ্রতাপূর্ণ। তিনি এবং তাঁর পরিবারবর্গ প্রায়ই রাতের পর রাত অভুক্ত অবস্থায় কাটাতেন।

১. বৃক্ষরোপণ ও কৃষিবিপ্লব

খাদ্য সুরক্ষার প্রাথমিক শর্ত হলো ভূমির সর্বোত্তম ব্যবহার ও কৃষিশস্যের নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন নিশ্চিত করা। ইসলাম কৃষিকাজ ও গাছ লাগানোকে নিছক পার্থিব পেশা নয়; বরং মহিমান্বিত ইবাদত ও সদকা হিসেবে ঘোষণা করেছে।

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মুসলিম যদি একটি বৃক্ষ রোপণ করে কিংবা কোনো শস্যবীজ বপন করে, অতঃপর তা থেকে কোনো মানুষ, পাখি কিংবা কোনো চতুষ্পদ জন্তু আহার করে—তবে তা রোপণকারীর জন্য একটি সদকা হিসেবে গণ্য হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৩২০)

পরিবেশ ও খাদ্য সুরক্ষার প্রশ্নে ইসলাম কতটা আপসহীন, তা নবীজির একটি ঐতিহাসিক বাণীতে ফুটে উঠেছে, ‘যদি কেয়ামত সমাগত হয়ে যায় এবং তোমাদের কারও হাতে একটি খেজুরগাছের চারা থাকে, তবে সে যেন কেয়ামত সংঘটিত হওয়ার পূর্বেই তা জমিনে রোপণ করে দেয়।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১২৯০২)

জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত উৎপাদনশীল থাকা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য খাদ্য ও বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যাওয়ার এমন দর্শন মানব ইতিহাসে বিরল।

২. শাসকের আত্মত্যাগ

জনগণ যখন খাদ্যাভাবে কষ্ট পায়, তখন শাসক বা নীতিনির্ধারকরা যদি রাজকীয় বিলাসবহনে গা ভাসিয়ে দেন, তবে সেই রাষ্ট্র কখনোই খাদ্য সংকটের টেকসই সমাধান করতে পারে না। ইসলাম নির্দেশ দেয়—শাসককে জনগণের দুঃখ-কষ্টের সহমর্মী হতে হবে।

মদিনা রাষ্ট্রের প্রধান হওয়া সত্ত্বেও নবীজির পারিবারিক জীবন ছিল চরম সংযমী ও কৃচ্ছ্রতাপূর্ণ। তিনি এবং তাঁর পরিবারবর্গ প্রায়ই রাতের পর রাত অভুক্ত অবস্থায় কাটাতেন; তাঁদের ঘরে রাতের কোনো খাবার থাকত না। আর তাঁদের অধিকাংশ আহারই ছিল সাধারণ যবের তৈরি রুটি।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩৬০)

১৮ হিজরির ঐতিহাসিক ‘আমুর রামাদাহ’ বা চরম দুর্ভিক্ষের সময়ে দ্বিতীয় খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) ঘোষণা দিয়েছিলেন, যতদিন সাধারণ জনগণের খাদ্যাভাব দূর না হবে, ততদিন তিনি ঘি, দুধ বা গোশত স্পর্শ করবেন না। শাসকের এই নৈতিক দায়বদ্ধতাই রাষ্ট্রের যাবতীয় সম্পদকে সাধারণ মানুষের ক্ষুধা নিবারণে নিয়োজিত করার প্রেরণা জোগায়।

প্রশাসনিক কর্মকর্তার মৌলিক চাহিদা অপূরণীয় থাকলে খাদ্য বণ্টনে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। যে কর্মী নিজের পরিবারের অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থানের দুশ্চিন্তায় জর্জরিত থাকে, তার কাছ থেকে দুর্নীতিমুক্ত সেবা পাওয়া সম্ভব নয়।

৩. কৌশলগত দূরদর্শিতা

খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে সম্ভাব্য সংকট ও বৈরী আবহাওয়া অনুধাবন করে রাষ্ট্রকে পূর্বপ্রস্তুতি নিতে হবে। কোরআনের সুরা ইউসুফে খাদ্য সংকট মোকাবিলায় কৌশলগত সংরক্ষণ ও সুষম বণ্টনের এক নিখুঁত বৈজ্ঞানিক রূপরেখা রয়েছে।

মিসরে আসন্ন সাত বছরের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের পূর্বাভাস পেয়ে তৎকালীন শাসককে নবী ইউসুফ (আ.) যে বাস্তবমুখী নীতি দিয়েছিলেন, কোরআনে তা এভাবে বিবৃত হয়েছে:

‘[ইউসুফ] বললেন, তোমরা একটানা সাত বছর চাষাবাদ করবে; অতঃপর তোমরা যা কাটবে, তার মধ্য থেকে অল্প যা তোমরা আহার করবে তা ছাড়া বাকি সমস্ত ফসল তার শিষ বা শিষের খোসাসহই রেখে দেবে। এরপর আসবে চরম দুর্ভিক্ষের কঠিন সাত বছর, যা তোমাদের পূর্বসঞ্চিত প্রায় সমস্ত ফসল খেয়ে ফেলবে—তবে অল্প কিছু যা তোমরা বীজের জন্য সংরক্ষণ করবে তা ছাড়া। এরপর আসবে এমন একটি বছর, যাতে মানুষ প্রচুর বৃষ্টি লাভ করবে এবং তাতে তারা রস ও তেল নিংড়াবে।’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৪৭-৪৯)

শস্যকে পোকা ও আর্দ্রতার হাত থেকে বাঁচাতে শিষসহ সংরক্ষণ করার এই কোরআনি নির্দেশনা আধুনিক কৃষিবিজ্ঞানের অন্যতম প্রধান নীতি। অর্থাৎ, কৃষিতে উদ্বৃত্ত উৎপাদন, বিজ্ঞানসম্মত গুদামজাতকরণ এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগারের দায়িত্বে সৎ ও দক্ষ জনবল নিয়োগ করা খাদ্য নিরাপত্তার অপরিহার্য শর্ত।

৪. সরকারি কর্মচারীদের অধিকারের নিশ্চয়তা

প্রশাসনিক কর্মকর্তার মৌলিক চাহিদা অপূরণীয় থাকলে খাদ্য বণ্টনে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। যে কর্মী নিজের পরিবারের অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থানের দুশ্চিন্তায় জর্জরিত থাকে, তার কাছ থেকে দুর্নীতিমুক্ত সেবা পাওয়া সম্ভব নয়।

রাসুল (সা.)  রাষ্ট্রীয় দায়িত্বপ্রাপ্তদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের রাষ্ট্রীয় কোনো কাজের দায়িত্বে নিয়োজিত হলো, অথচ তার বাসস্থান নেই—সে যেন একটি বাসস্থান গ্রহণ করে; যার স্ত্রী নেই, সে যেন বিবাহ করে; যার সেবক নেই, সে যেন একজন সেবকের সংস্থান করে; এবং যার বাহন নেই, সে যেন একটি বাহন গ্রহণ করে। এর অতিরিক্ত কিছু যদি কেউ অন্যায়ভাবে গ্রহণ করে, তবে তা হবে খেয়ানত বা আত্মসাৎ।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৯৪৫)

কর্মচারীদের সম্মানজনক জীবনযাত্রার সংস্থান করে দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব, যেন তারা অবৈধ উপার্জনের পথে পা না বাড়ায়।

রাষ্ট্রীয় ত্রাণ বা খাদ্য সহায়তা যখন কালোবাজারি ও দুর্নীতির শিকার হয়, তখন দরিদ্র মানুষ অনাহারে মারা যায়। ইসলাম দুর্নীতির সব পথ কঠোরভাবে বন্ধ করেছে।

৫. দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা

দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনাই হলো জাতীয় সম্পদ ধ্বংস এবং মানবসৃষ্ট খাদ্য সংকটের মূল কারণ। রাষ্ট্রীয় ত্রাণ বা খাদ্য সহায়তা যখন কালোবাজারি ও দুর্নীতির শিকার হয়, তখন দরিদ্র মানুষ অনাহারে মারা যায়। ইসলাম দুর্নীতির সব পথ কঠোরভাবে বন্ধ করেছে।

রাসুল (সা.) ‘ইবনুল লুতবিয়্যাহ’ নামক এক ব্যক্তিকে জাকাত আদায়ের দায়িত্বে পাঠিয়েছিলেন। তিনি ফিরে এসে কিছু মাল জমা দিয়ে বললেন, ‘এটি সরকারি তহবিল, আর এটি আমাকে উপহার হিসেবে দেওয়া হয়েছে!’

নবীজি (সা.) ক্ষোভ প্রকাশ করে মিম্বরে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিলেন, ‘আমি কাউকে কোনো দায়িত্বে পাঠালে সে কেন এমন কথা বলে যে—এটি আপনাদের সম্পদ আর এটি আমার উপহার? সে তার মা-বাবার ঘরে বসে রইল না কেন, তখন দেখত তাকে কেউ উপহার পাঠায় কি না! যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তাঁর শপথ—তোমাদের কেউ যদি অন্যায়ভাবে রাষ্ট্রের সামান্যতম সম্পদও আত্মসাৎ করে, তবে কেয়ামতের দিন সে তা নিজের ঘাড়ে বহন করে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হবে...।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৫৯৭)

অন্য বর্ণনায় এসেছে, দায়িত্বপ্রাপ্ত কেউ যদি রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে একটি সুঁই কিংবা তার চেয়েও তুচ্ছ বস্তু গোপনে রেখে দেয়, তবে তা-ও মারাত্মক আত্মসাৎ (গুলুল) হিসেবে গণ্য হবে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৮৩৩)