একপাশে এশিয়া, অন্যপাশে ইউরোপ—মাঝখানে বয়ে চলা নীল জলরাশির বসফরাস প্রণালী। এই প্রণালীর কোল ঘেঁষেই দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাস ও আধুনিকতার সন্ধিস্থল তুরস্ক। তুর্কিদের কাছে রমজান মানে কেবল উপবাস নয়, এটি যেন ওসমানিয়া ঐতিহ্যের এক রাজকীয় পুনর্জাগরণ।
আধুনিক তুরস্ক এখন ধর্ম ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনে এমন এক রমজান পালন করে, যা পুরো বিশ্বের পর্যটকদের জন্য এক বিস্ময়।
তুরস্কের রমজানে আতিথেয়তার এক অনন্য নজির দেখা যায় ইস্তাম্বুলের উসকুদার এলাকায়। ২০২২ সালে এখানে আয়োজিত হয়েছিল আধুনিক তুরস্কের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় গণ-ইফতার। বসফরাস প্রণালীর তীরে অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘মেইডেনস টাওয়ার‘ বা কুমারী দুর্গের সামনে প্রায় দুই কিলোমিটার দীর্ঘ দস্তরখান বিছানো হয়েছিল।
বসফরাস প্রণালীর তীরে অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘মেইডেনস টাওয়ার‘ বা কুমারী দুর্গের সামনে প্রায় দুই কিলোমিটার দীর্ঘ দস্তরখান বিছানো হয়েছিল।
সেই আয়োজনে প্রায় ৮০ হাজার মানুষ একসঙ্গে ইফতার করেছিলেন। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সামলাতে কয়েক ঘণ্টা আগে থেকেই ওই এলাকার রাস্তাঘাট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তুর্কিদের কাছে এটি কেবল খাবারের আয়োজন নয়, বরং পবিত্র ‘লাইলাতুল কদর’ বা ২৭ রমজানের এক বিশেষ উদযাপনে পরিণত হয়েছিল।
ধনী-গরিব নির্বিশেষে আশি হাজার মানুষ যখন ববফরাসের পড়ন্ত বিকেলের সূর্য আর সমুদ্রের মৃদু বাতাসের মাঝে ইফতার করেন, তখন তা এক অপার্থিব দৃশ্যের অবতারণা করে।
তুরস্কের শহরগুলোতে এখনো একটি প্রাচীন ঐতিহ্য টিকে আছে, তা হলো ‘সাহরির ড্রামার’ বা দাউলজু। ওসমানি সাম্রাজ্যের আমল থেকে চলে আসা এই প্রথা অনুযায়ী, ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে একদল মানুষ বিশাল তুর্কি ড্রাম (দাউল) বাজিয়ে সাহরির সময় মানুষকে জাগিয়ে তোলেন।
আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও এই ঐতিহ্যটি তুর্কিরা সগৌরবে ধরে রেখেছে, যা রমজানের এক অবিচ্ছেদ্য আবহ তৈরি করে।
বর্তমান তুরস্কে রমজান এখন সামাজিক সংহতির এক অনন্য রূপ।
ইস্তাম্বুলের এসনলার পৌরসভা যেমন চালু করেছে ‘হ্যালো ইফতার‘ নামক একটি হটলাইন। যেসব পরিবার কর্মব্যস্ততা বা শারীরিক অসুস্থতার কারণে ইফতার তৈরি করতে পারে না, তারা এই নম্বরে ফোন করলেই চার পদের পুষ্টিকর গরম খাবার সরাসরি তাদের বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়।
এটি তুরস্কের আধুনিক সমাজসেবা ও ধর্মীয় ত্যাগের এক চমৎকার উদাহরণ।
যেসব পরিবার কর্মব্যস্ততা বা শারীরিক অসুস্থতার কারণে ইফতার তৈরি করতে পারে না, তারা এই নম্বরে ফোন করলেই চার পদের পুষ্টিকর গরম খাবার সরাসরি তাদের বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়।
তুর্কি ইফতারের মেনু যেমন রাজকীয়, তেমনি রুচিশীল। তাদের ইফতারের শুরু হয় সাধারণত নিচের খাবারগুলো দিয়ে:
রমজান পিদেসি: এটি রমজানের বিশেষ এক ধরনের নরম রুটি, যা তিল ও কালোজিরা ছিটিয়ে তৈরি করা হয়।
হুরমা ও জলপাই: তুর্কিরা খেজুরকে বলে ‘হুরমা‘। খেজুরের পাশাপাশি জলপাই দিয়ে ইফতার শুরু করতে তারা পছন্দ করে।
শোরবা: মশুর ডাল বা টমেটোর তৈরি বিশেষ স্যুপ দিয়ে পেটকে খাবারের জন্য প্রস্তুত করা হয়।
কাবাব ও কোফতা: মূল খাবারে থাকে বিভিন্ন পদের কাবাব, সবজি এবং ঐতিহ্যবাহী চালের পোলাও।
মিষ্টিমুখ: ইফতারের পর তারা ‘গুল্লাচ‘ নামক এক বিশেষ মিষ্টি খান, যা দুধ, ডালিম ও পেস্তা বাদাম দিয়ে তৈরি। এরপর অবশ্যই থাকে বিখ্যাত তুর্কি চা বা কফি।
তুরস্কের আজকের এই উৎসবমুখর রমজানের পেছনের ইতিহাসটি মসৃণ নয়। ১৯২৩ সালে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর তুরস্ক যখন কঠোর ধর্মনিরপেক্ষ নীতির দিকে ঝুঁকে পড়েছিল, তখন এক সময় জনসমক্ষে রোজা রাখা বা ইসলামি রীতিনীতি পালন করা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে।
ঐতিহাসিক তথ্যানুয়ায়ী, ১৯৩০-এর দশকে সাহরির ড্রাম বাজানো নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানানো হয়ে এবং সরকারি দপ্তরগুলোতে রোজা রাখাকে ‘আধুনিকতার পরিপন্থী‘ মনে করা হতো। কিন্তু ১৯৫০-এর দশকে ডেমোক্রেটিক পার্টির বিজয়ের পর এই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে।
১৯৩০-এর দশকে সাহরির ড্রাম বাজানো নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানানো হয়ে এবং সরকারি দপ্তরগুলোতে রোজা রাখাকে ‘আধুনিকতার পরিপন্থী‘ মনে করা হতো।
১৯৫০ সালে পুনরায় আরবিতে আজান চালু করার মাধ্যমে তুরস্কের সাধারণ মানুষের ধর্মীয় পরিচয়ের পুনর্জাগরণ ঘটে। সেই সংকটের দিনগুলো কাটিয়ে তুরস্ক আজ আবারও রমজান সংস্কৃতির এক বিশ্বস্ত কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
তুরস্কের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর শানলি উরফা এখন ২০২৯ সালের জন্য ‘বিশ্ব রন্ধনশৈলীর রাজধানী‘ হওয়ার দৌড়ে রয়েছে। এখানকার ইফতার সংস্কৃতিও বেশ প্রাচীন।
তারা মনে করেন, হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর আতিথেয়তার ধারা তারা আজও বজায় রাখছেন। এখানকার প্রায় ৪০০ পদের স্থানীয় খাবার তুরস্কের ইফতারকে আরও বেশি সমৃদ্ধ করেছে।
সূত্র: আল–জাজিরা ও আনাদোলু