সড়ক মানুষের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কর্মস্থলে যাওয়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত, ব্যবসা–বাণিজ্য কিংবা জরুরি প্রয়োজনে মানুষের চলাচলের জন্য নিরাপদ সড়ক অপরিহার্য।
ইসলাম মানুষের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার পাশাপাশি অন্যের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তার প্রতিও গুরুত্ব দিয়েছে। তাই রাস্তায় চলাচলের সময় কাউকে কষ্ট না দেওয়া, প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করা, পথ পরিষ্কার রাখা এবং অন্যের অধিকার রক্ষা করাও ইসলামের নৈতিক শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত।
রাসুল (সা.) রাস্তায় বসার ব্যাপারে সাহাবিদের সতর্ক করেছিলেন। একান্ত প্রয়োজন হলে রাস্তার হক আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন। সেই হকের মধ্যে দৃষ্টি সংযত রাখা, কাউকে কষ্ট না দেওয়া, সালামের জবাব দেওয়া এবং ভালো কাজে উৎসাহিত করা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখার কথা এসেছে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬২২৯)
রাস্তা মানুষের ব্যক্তিগত জায়গা নয়। তাই রাস্তায় এমন কোনো আচরণ করা উচিত নয়, যাতে অন্যের চলাচল ব্যাহত হয় কিংবা কেউ নিরাপত্তাহীনতায় পড়ে।
এর মাধ্যমে বোঝা যায়, রাস্তা মানুষের ব্যক্তিগত জায়গা নয়। এখানে চলাচলকারী প্রত্যেক মানুষের অধিকার রয়েছে। তাই রাস্তায় এমন কোনো আচরণ করা উচিত নয়, যাতে অন্যের চলাচল ব্যাহত হয় কিংবা কেউ নিরাপত্তাহীনতায় পড়ে।
রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়াকে ইসলাম ইমানের একটি শাখা হিসেবে উল্লেখ করেছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ইমানের শাখাগুলোর মধ্যে রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়াও রয়েছে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৩৫)
আজকের বাস্তবতায় এর ব্যাপ্তি আরও বড়। রাস্তার ওপর নির্মাণসামগ্রী ফেলে রাখা, যেখানে–সেখানে আবর্জনা রাখা, ফুটপাত দখল করা কিংবা যান চলাচলের পথে অপ্রয়োজনীয় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা মানুষের নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
ইসলাম মানুষের জীবন ও নিরাপত্তাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। রাসুল (সা.) রাস্তার হকের মধ্যে ‘কাউকে কষ্ট না দেওয়া’কে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬২২৯)
সড়কে অতিরিক্ত গতি, বেপরোয়া চালনা, ভুলভাবে ওভারটেক করা কিংবা অসতর্কভাবে গাড়ি চালানোর ফলে চালক নিজের পাশাপাশি অন্য মানুষের জীবনও ঝুঁকিতে ফেলতে পারেন। তাই যানবাহন চালানোর ক্ষেত্রে সতর্কতা ও সংযম ইসলামের সামগ্রিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
কোনো ব্যক্তিকে তার বাহনে উঠতে সাহায্য করা কিংবা তার মালপত্র তুলে দেওয়া সদকা।সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৯৮৯
সড়ক শুধু গাড়ির জন্য নয়; পথচারী, শিশু, নারী, বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধী মানুষেরও নিরাপদে চলাচলের অধিকার রয়েছে। ইসলাম দুর্বল ও অসহায় মানুষের সহযোগিতাকে উৎসাহিত করেছে।
রাসুল (সা.) বলেছেন, কোনো ব্যক্তিকে তার বাহনে উঠতে সাহায্য করা কিংবা তার মালপত্র তুলে দেওয়া সদকা। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৯৮৯)
অন্যের পথচলা সহজ করে দেওয়া তাই নিছক সামাজিক সৌজন্য নয়। এটি সওয়াবের কাজও হতে পারে। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তির নিরাপদ চলাচলের সুযোগ নিশ্চিত করা সমাজের দায়িত্বশীলতার পরিচয়।
অনেক সময় অপরিচিত মানুষ রাস্তা চিনতে না পেরে বিপাকে পড়ে। ইসলাম এমন ব্যক্তিকে সঠিক পথ দেখানোতেও সওয়াবের কথা বলেছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, পথ না চেনা ব্যক্তিকে পথ দেখিয়ে দেওয়া সদকা। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৯৫৬)
বর্তমান সময়ে এর সঙ্গে আরও অনেক বিষয় যুক্ত হয়েছে। ভুল তথ্য দিয়ে কাউকে বিপদে ফেলা, ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল পথ দেখানো কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে সাহায্য না করা ইসলামের মানবিক শিক্ষার সঙ্গে যায় না।
পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। মানুষের চলাচলের পথে পড়ে থাকা কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়া সওয়াবের কাজ। রাস্তা থেকে মানুষের জন্য কষ্টদায়ক একটি গাছের ডাল সরিয়ে দেওয়ার কারণে আল্লাহ–তাআলা এক ব্যক্তিকে ক্ষমা করেছেন, এমন ঘটনা সহিহ হাদিসে এসেছে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৯১৪)
তাই রাস্তা ও ফুটপাতে ময়লা ফেলা, কাচ বা ধারালো বস্তু ফেলে রাখা কিংবা এমন কিছু করা; যাতে পথচারী আহত হতে পারে, তা থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন। নিজের ঘরের পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি জনসাধারণের ব্যবহারের জায়গার প্রতিও দায়িত্বশীল হতে হবে।
সড়ক দুর্ঘটনায় অসতর্কতা অনেক সময় মানুষের মৃত্যু ও স্থায়ী পঙ্গুত্বের কারণ হয়। তাই যানবাহন চালানোর সময় নিজের নিরাপত্তার পাশাপাশি অন্যের জীবনের কথাও মনে রাখা প্রয়োজন।
মানুষের জীবন ইসলামে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো প্রাণকে হত্যা করল প্রাণের বিনিময় ছাড়া অথবা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করার অপরাধ ছাড়া, সে যেন সব মানুষকেই হত্যা করল।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত: ৩২)
সড়ক দুর্ঘটনায় অসতর্কতা অনেক সময় মানুষের মৃত্যু ও স্থায়ী পঙ্গুত্বের কারণ হয়। তাই যানবাহন চালানোর সময় নিজের নিরাপত্তার পাশাপাশি অন্যের জীবনের কথাও মনে রাখা প্রয়োজন।
ইচ্ছাকৃত ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ কিংবা চরম অসতর্কতা মানুষের জীবনের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে শরিয়তের আলাদা বিধান রয়েছে। অনিচ্ছাকৃত হত্যার ক্ষেত্রেও কোরআন ক্ষতিপূরণ ও কাফফারার বিধান দিয়েছে। (সুরা নিসা, আয়াত: ৯২)
নিরাপদ সড়ক গড়ে তোলা একক কোনো ব্যক্তির কাজ নয়। চালককে দায়িত্বশীল হতে হবে, পথচারীকে নিয়ম মানতে হবে, পরিবহনমালিক ও শ্রমিকদের সতর্ক হতে হবে এবং রাষ্ট্রকে কার্যকর আইন ও নিরাপদ অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে।
ইসলামের নীতিতে মানুষের জানমাল রক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই রাস্তা নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ, পথচারীর জন্য নিরাপদ ব্যবস্থা, যানবাহনের যথাযথ নিয়ন্ত্রণ ও আইন প্রয়োগ—সব ক্ষেত্রেই জনস্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
সড়ক শুধু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার পথ নয়। এটি মানুষের জীবন, জীবিকা ও দৈনন্দিন প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত। ফলে ইসলাম রাস্তার প্রতিও মানুষের দায়িত্ব নির্ধারণ করেছে।
আমরা যদি রাস্তায় চলাচলের সময় অন্যের অধিকারকে নিজের অধিকারের মতো গুরুত্ব দিই, প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করি, অসহায় মানুষকে সহযোগিতা করি এবং নিজের আচরণে অন্যের জীবনকে ঝুঁকিতে না ফেলি, তাহলে নিরাপদ সড়ক গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব।
ইফতেখারুল হক হাসনাইন: আলেম ও প্রাবন্ধিক