মধ্যযুগের মুসলিম বিজ্ঞানীদের সোনালী ইতিহাসে যে কজন মনীষী আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন, আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে জাবির ইবনে সিনান আল-বাত্তানি তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য। পাশ্চাত্যে তিনি ‘আলবাটেগনিয়াস’ (Albategnius) নামে পরিচিত।
তাঁকে তাঁর সময়ের শ্রেষ্ঠ জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং মধ্যযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মেধাবী হিসেবে গণ্য করা হয়।
৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দের দিকে হাররানের বাত্তান নামক স্থানে তাঁর জন্ম। বিজ্ঞানের প্রাথমিক পাঠ তিনি পেয়েছিলেন তাঁর বাবা জাবির ইবনে সিনান আল-বাত্তানির কাছে, যিনি নিজেও ছিলেন একজন প্রথিতযশা বিজ্ঞানী।
উচ্চতর শিক্ষার সন্ধানে আল-বাত্তানি সিরিয়ার রাক্কা শহরে পাড়ি জমান এবং সেখানেই তাঁর কর্মজীবনের অধিকাংশ সময় অতিবাহিত করেন।
তিনি ৪৮৯টি নক্ষত্রের তালিকা তৈরি করেন এবং সূর্য বছরের দৈর্ঘ্য নিরুপণ করেন ৩৬৫ দিন ৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট ২৪ সেকেন্ড, যা আধুনিক হিসাবের অত্যন্ত কাছাকাছি।
আল-বাত্তানির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো তাঁর কিতাব আল-জিজ। ৫৭ অধ্যায়ের এই বিশাল গ্রন্থে তিনি মহাকাশীয় গোলক, রাশিচক্র এবং গাণিতিক নানা জটিল বিষয়ের অবতারণা করেছেন।
১০ম শতাব্দীর বিখ্যাত বই বিক্রেতা ইবনে আন-নাদিম তাঁর আল-ফিহরিস্ত গ্রন্থে আল-বাত্তানি সম্পর্কে লিখেছেন, “তিনি ছিলেন জ্যামিতি এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের একজন মহান নেতা। তাঁর পর্যবেক্ষণগুলো গ্রিক বিজ্ঞানী টলেমির চেয়েও অনেক বেশি নির্ভুল ছিল।”
এই গ্রন্থে তিনি ৪৮৯টি নক্ষত্রের তালিকা তৈরি করেন এবং সূর্য বছরের দৈর্ঘ্য নিরুপণ করেন ৩৬৫ দিন ৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট ২৪ সেকেন্ড, যা আধুনিক হিসাবের অত্যন্ত কাছাকাছি।
আল-বাত্তানির সবচেয়ে বড় অবদান হলো গণিতে গ্রিক পদ্ধতির পরিবর্তে ত্রিকোণমিতিক অনুপাতের ব্যবহার। তিনি প্রথম ব্যক্তি যিনি গ্রিকদের ‘কর্ড’ (Chord) ব্যবহারের পরিবর্তে ‘সাইন’ (Sine) বা সাইন অনুপাতের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেন এবং তা ব্যবহার শুরু করেন।
এ ছাড়া তিনি ‘কোট্যাঞ্জেন্ট’ (Cotangent) ধারণার উন্নয়ন ঘটান এবং এর জন্য গাণিতিক টেবিল তৈরি করেন। ত্রিকোণমিতিতে তাঁর এই উদ্ভাবন জ্যোতির্বিজ্ঞানের জটিল হিসাবকে অনেক সহজ করে দিয়েছিল।
বিজ্ঞানে তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ চাঁদের একটি সমতল এলাকাকে তাঁর নামানুসারে ‘আলবাটেগনিয়াস’ নামকরণ করা হয়েছে।
জ্যোতির্বিজ্ঞানে আল-বাত্তানি কেবল প্রাচীন তত্ত্ব অনুসরণ করেননি, বরং নিজ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে টলেমির অনেক ভুল সংশোধন করেছেন।
সূর্যগ্রহণ: তিনি প্রমাণ করেন যে পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব সব সময় এক থাকে না। এর ফলে তিনি দেখান যে পূর্ণ সূর্যগ্রহণের পাশাপাশি ‘বলয়গ্রাস’ সূর্যগ্রহণ হওয়াও সম্ভব।
অয়নচলন: তিনি বিষুবরেখার অয়নচলন (Precession of Equinoxes) প্রতি বছর ৫৪.৫ সেকেন্ড হিসেবে নিখুঁতভাবে গণনা করেন।
কপারনিকাসের ঋণ স্বীকার: আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের জনক কোপারনিকাস তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ডি রেভোলিউশনিবাস’ (১৫৪৩)-এ আল-বাত্তানির কাছে তাঁর ঋণের কথা অকপটে স্বীকার করেছেন। টাইকো ব্রাহে, কেপলার এবং গ্যালিলিওর মতো বিজ্ঞানীরাও আল-বাত্তানির কাজ দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন।
জনশ্রুতি আছে, রাক্কা শহরের একদল মানুষের ওপর অন্যায্য কর আরোপের প্রতিবাদ জানাতে বাগদাদ যাওয়ার পথে ৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে এই মহান বিজ্ঞানীর মৃত্যু হয়।
বিজ্ঞানে তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ চাঁদের একটি সমতল এলাকাকে তাঁর নামানুসারে ‘আলবাটেগনিয়াস’ নামকরণ করা হয়েছে।
এমনকি আধুনিক পপ কালচারেও তাঁর নাম উজ্জ্বল; জনপ্রিয় সায়েন্স ফিকশন সিরিজ ‘স্টার ট্রেক’-এর একটি মহাকাশযানের নাম রাখা হয়েছে ‘ইউএসএস আল-বাত্তানি’।
সূত্র: অ্যাবাউট ইসলাম ডট নেট