পাথেয়

নিজের পরিবর্তন চান? আল্লাহ কখন পরিবর্তন ঘটান জেনে নিন

পরিবর্তন আমরা সবাই চাই। অভাবী চায় সচ্ছলতা, পাপী চায় মুক্তি, অস্থির হৃদয় চায় প্রশান্তি। কিন্তু পরিবর্তন চাইলেও এর জন্য প্রথম পদক্ষেপটি নিতে আমরা প্রায়ই প্রস্তুত থাকি না।

আমাদের ধারণা, সময় হলে আপনা-আপনি সব ঠিক হয়ে যাবে। এই অপেক্ষায় কেটে যায় জীবন, এমনকি কয়েক প্রজন্ম; কিন্তু কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আর আসে না।

অথচ পবিত্র কোরআনে আল্লাহ–তাআলা পরিবর্তনের এক চিরন্তন সূত্র জানিয়ে দিয়েছেন, যা আমাদের এই অপেক্ষার মানসিকতা নিয়ে নতুন করে ভাবায়।

আয়াতটির অর্থ, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা নিজেরা পরিবর্তন করে।’ (সুরা রাদ, আয়াত: ১১)

আয়াতটি ছোট, কিন্তু এর বার্তা গভীর। পরিবর্তনের প্রথম শর্ত নিজের সাধ্যের মধ্যে যতটুকু সম্ভব, ততটুকু বদলানো। বাকিটা আল্লাহর হাতে।

চেষ্টা বান্দার দায়িত্ব, ফলাফল আল্লাহর দান।

আগে নিজেকে বদলাতে হয়

মুফাসসিরগণ এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, আল্লাহ কোনো জাতিকে দেওয়া নেয়ামত ততক্ষণ পর্যন্ত ছিনিয়ে নেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরাই নিজেদের ভেতরের অবস্থা, মানে ইমান, আমল ও আনুগত্য নষ্ট করে ফেলে। (তাফসিরে ইবনে কাসির, সুরা রাদ ১১ নম্বর আয়াতের তাফসির)

অর্থাৎ বাইরের অবস্থার সঙ্গে ভেতরের অবস্থার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ভেতরটা না বদলালে বাইরের পরিস্থিতি বদলায় না। ব্যক্তি কিংবা জাতি, সবার জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য।

তবে এখানে লক্ষণীয় হলো, আয়াতটি এ কথা বলছে না যে মানুষ নিজের চেষ্টায় একাই সবকিছু বদলে ফেলতে পারে। পরিবর্তনের চূড়ান্ত ক্ষমতা আল্লাহরই হাতে। কিন্তু আল্লাহর নিয়ম হলো, বান্দা আগে পদক্ষেপ নেবে, তারপর তিনি ফল দেবেন।

সচ্ছলতা চাইলে করণীয়

বিষয়টি একটি উদাহরণ দিয়ে বোঝা যায়। কেউ চান তাঁর জীবনে সচ্ছলতা আসুক। কিন্তু তিনি এর জন্য প্রয়োজনীয় কোনো পদক্ষেপ নেন না। চাকরিতে আবেদন করা, নতুন ব্যবসার সুযোগ খোঁজা, দক্ষতা বাড়ানো, এগুলো তাঁর কর্তব্য ছিল। উপায় অবলম্বন না করে শুধু পরিবর্তনের অপেক্ষা করা আল্লাহর বিধান নয়।

বৈষয়িক চেষ্টার পাশাপাশি রিজিক বৃদ্ধির কিছু আধ্যাত্মিক পদক্ষেপের কথাও কোরআন-হাদিসে এসেছে।

প্রথমত, হারাম উপার্জন থেকে মুক্ত হওয়া। আল্লাহ বলেন, ‘যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ বের করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেন, যা সে কল্পনাও করে না।’ (সুরা তালাক, আয়াত: ২–৩)

দ্বিতীয়ত, নিজের যা আছে, তার জন্য আল্লাহর কাছে মন থেকে কৃতজ্ঞ হওয়া। কারণ, আল্লাহর ঘোষণা, ‘তোমরা যদি কৃতজ্ঞ হও, আমি অবশ্যই তোমাদের আরও বাড়িয়ে দেব।’ (সুরা ইব্রাহিম, আয়াত: ৭)

তৃতীয়ত, দান করা এবং আত্মীয়দের হক আদায় করা। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে চায় তার রিজিক প্রশস্ত হোক এবং আয়ু বৃদ্ধি পাক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫,৯৮৬)

আল্লাহর প্রিয় হতে চাইলে

বৈষয়িক জীবনের মতো আধ্যাত্মিক জীবনেও একই সূত্র প্রযোজ্য। কেউ পাপ ছাড়তে চান, কিন্তু গুনাহের যে মাধ্যম, তা হাত থেকে ছুড়ে ফেলতে চান না। যে অ্যাপ পথভ্রষ্ট করে, যে আড্ডা পাপের দিকে টানে, যে বন্ধু ভুল পথে নিয়ে যায়, সেগুলো ধরে রেখে পরিবর্তনের আশা করা অর্থহীন।

আল্লাহর প্রিয় হতে চাইলে আগে চেষ্টা করতে হবে। তওবা করতে হবে। পাপের উপকরণ ও পরিবেশ থেকে সরে আসতে হবে। ভুল পথে টেনে নেওয়া সঙ্গ ত্যাগ করে সৎ ও ধর্মভীরু মানুষের সাহচর্য খুঁজে নিতে হবে।

এই চেষ্টার প্রতিদানের ঘোষণা আল্লাহ নিজেই দিয়েছেন, ‘যারা আমার পথে চেষ্টা-সাধনা করে, আমি অবশ্যই তাদের আমার পথে পরিচালিত করব।’ (সুরা আনকাবুত, আয়াত: ৬৯)

অর্থাৎ হেদায়াতের জন্য শর্ত হলো চেষ্টা করা। যে মনেপ্রাণে হিদায়াত চায় এবং সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেয়, আল্লাহ তাকে ফিরিয়ে দেন না।

আয়াতের শিক্ষা

আয়াতটির মূল উদ্দেশ্য মানুষকে অলসতা ও অজুহাতের মানসিকতা থেকে জাগিয়ে তোলা। ‘ভাগ্যে থাকলে হবে’ বলে হাত গুটিয়ে বসে থাকা তাওয়াক্কুল (আল্লাহ ভরসা) নয়; বরং তাওয়াক্কুল হলো সাধ্যমতো চেষ্টা করে ফলাফল আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়া।

আল্লাহর ওপর ভরসা করার এই শিক্ষা মহানবী (সা.) একটি ঘটনায় চমৎকারভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন। এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আমি কি উট ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা করব, নাকি বেঁধে রেখে?’ তিনি বললেন, ‘আগে উট বাঁধো, তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করো।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২,৫১৭)

অর্থাৎ উপায় অবলম্বন আল্লাহ-ভরসার পরিপন্থী নয়; বরং এটাই প্রথম ধাপ।

নিজের জীবনে, পরিবারে বা সমাজে আমরা যে পরিবর্তনই চাই না কেন, প্রশ্নটা নিজেদেরই করতে হবে। এর জন্য আমরা নিজেরা কোন পদক্ষেপ নিয়েছি। কারণ, আল্লাহর সাহায্য নেমে আসে তখনই, যখন বান্দা প্রথম পদক্ষেপ ফেলে।

পরিবর্তন আসলে দূরের কিছু নয়। এর চাবিকাঠি আল্লাহ আমাদের হাতের নাগালেই রেখেছেন। শুধু দরকার আমাদের নিজেদের পরিবর্তনের ইচ্ছা।

  • নাজমুস সাকিব : এমফিল গবেষক, আরবি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়