নবীদের কাহিনী

পিতাকে যেভাবে ধর্মের পথে ডেকেছেন নবী ইব্রাহিম (আ.)

সুরা মারইয়ামের ৪১ থেকে ৪৮ নম্বর আয়াতে হজরত ইব্রাহিম (আ.) এবং তাঁর মূর্তিপূজারী পিতা আজরের মধ্যকার কথোপকথন বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। পিত–পুত্রের এই সংলাপকে পারিবারিক বিতর্ক ভাবলে ভুল হবে, বরং এটি যুক্তি বনাম অযুক্তি, নম্রতা বনাম ঔদ্ধত্য এবং সত্য বনাম মিথ্যার চিরন্তন লড়াইয়ের এক জীবন্ত দলিল।

নবী ইব্রাহিমেরএই দাওয়াতি পদ্ধতির বিশেষ ৫ দিক এখানে আলোচনা করা হলো।

সত্য সবসময়ই যৌক্তিক এবং অসত্য সবসময়ই স্ববিরোধী। তিনি চাইছিলেন তাঁর পিতা যেন অন্ধ অনুকরণ ত্যাগ করে স্বাধীনভাবে নিজের বিবেককে ব্যবহার করেন।

১. যুক্তি ও বিচারবুদ্ধির প্রাধান্য

হজরত ইব্রাহিম (আ.) যখন তাঁর পিতাকে ধর্মের পথে আহ্বান করেন, তখন তিনি অলৌকিক কোনো নিদর্শনের চেয়ে যুক্তি ও বিচারবুদ্ধির ওপর বেশি গুরুত্ব দেন। তিনি জানতেন, তাঁর পিতা ওহী বা আসমানি কিতাবে বিশ্বাসী নন; তাই তাকে বোঝানোর প্রধান মাধ্যম হতে পারে বিবেক ও বুদ্ধিবৃত্তি।

তিনি পিতাকে প্রশ্ন করলেন, যিনি কানে শোনেন না, চোখে দেখেন না এবং কোনো উপকার বা অপকার করতে পারেন না, তাঁর ইবাদত কেন করা হবে? (সুরা মারইয়াম, আয়াত: ৪২)

আসলে সত্য সবসময়ই যৌক্তিক এবং অসত্য সবসময়ই স্ববিরোধী। তিনি চাইছিলেন তাঁর পিতা যেন অন্ধ অনুকরণ ত্যাগ করে স্বাধীনভাবে নিজের বিবেককে ব্যবহার করেন।

কিন্তু তাঁর পিতা পৌত্তলিক আভিজাত্য ও অহংকারে এতটা অন্ধ ছিলেন যে তিনি সত্যের বিপরীতে থাকাটা বেছে নেন।

২. নম্রতা বনাম শত্রুতা

পিতার সঙ্গে কথা বলার সময় ইব্রাহিম (আ.) সর্বোচ্চ শিষ্টাচার প্রদর্শন করেন। তিনি সম্বোধনের ক্ষেত্রে বারবার ‘ইয়া আবাতি’ (হে আমার প্রিয় পিতা) শব্দটি ব্যবহার করেন (সুরা মারইয়াম, আয়াত: ৪২-৪৫)

আরবি ভাষায় এটি কোনো সন্তান কর্তৃক তার পিতাকে ডাকার সবচেয়ে শ্রুতিমধুর ও সম্মানজনক শব্দ।

তিনি তাঁর পিতাকে আল্লাহর আজাব এবং শয়তানের বন্ধু হওয়ার পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করার সময় ‘আর-রহমান’ (পরম দয়ালু) গুণবাচক নামটি ব্যবহার করেন। এর মাধ্যমে তিনি পিতার মনে আশার আলো জাগাতে চেয়েছিলেন যে আল্লাহ অত্যন্ত দয়ালু; শিরক ত্যাগ করে ফিরে এলে তিনি অবশ্যই ক্ষমা করবেন।

ইসলামে হেদায়েত বা সঠিক পথের দিশা সম্পূর্ণ আল্লাহর হাতে। তবে মানুষ তার স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি ব্যবহার করে সত্য গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়।

বিপরীত দিকে, তাঁর পিতার আচরণ ছিল রুক্ষ ও আক্রমণাত্মক। তিনি ইব্রাহিমকে ‘হে আমার পুত্র’ বলে সম্বোধন করার সৌজন্য দেখাননি; বরং সরাসরি নাম ধরে ডেকে পাথর মেরে হত্যা করার এবং গৃহত্যাগের হুমকি দেন। (সুরা মারইয়াম, আয়াত: ৪৬)

মিথ্যা যখন যুক্তিতে হেরে যায়, তখন সে শক্তির ভাষায় কথা বলতে শুরু করে। এমনকি পিতার এই চরম দুর্ব্যবহারের মুখেও ইব্রাহিম (আ.) বললেন, “আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক, আমি আমার রবের কাছে আপনার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব।” (সুরা মারইয়াম, আয়াত: ৪৭)

৩. স্বাধীনতা ও হেদায়েতের স্বরূপ

ইব্রাহিম (আ.) পিতাকে আল্লাহ কর্তৃক অনুমোদিত সত্য বেছে নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “আপনি আমার অনুসরণ করুন, আমি আপনাকে সঠিক পথ দেখাব।” (সুরা মারইয়াম, আয়াত: ৪৩)

ইসলামে হেদায়েত বা সঠিক পথের দিশা সম্পূর্ণ আল্লাহর হাতে। তবে মানুষ তার স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি ব্যবহার করে সত্য গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। মানুষ নিজে সত্যের পথে চলতে চায়, আর আল্লাহ তাকে সেই পথে চলা সহজ করে দেন।

ইব্রাহিম (আ.) এখানে একজন পথপ্রদর্শক হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেছেন, যিনি শুধু আল্লাহর দেখানো পথটিই মানুষের সামনে তুলে ধরছেন।

৪. আসমানি জ্ঞানের গুরুত্ব

ইব্রাহিম (আ.) তাঁর পিতাকে বলেছিলেন, “হে আমার পিতা, আমার কাছে এমন জ্ঞান এসেছে যা আপনার কাছে আসেনি।” (সুরা মারইয়াম, আয়াত: ৪৩)

এখানে তিনি সাধারণ জ্ঞান এবং ওহির জ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট করেছেন। ওহির জ্ঞান হলো নির্ভুল ও পরম সত্য, যা মানুষের অর্জিত সীমাবদ্ধ জ্ঞানকে পূর্ণতা দান করে।

তাঁর পিতা হয়তো জাগতিক অনেক বিষয়ে অভিজ্ঞ ছিলেন, কিন্তু জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য ও পরকাল সম্পর্কে তাঁর কোনো জ্ঞান ছিল না। ইব্রাহিম (আ.) অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে তাকে বোঝাতে চাইলেন যে জাগতিক জ্ঞান দিয়ে সবকিছু বিচার করা সম্ভব নয়; মুক্তির জন্য আল্লাহর দেওয়া বিশেষ ইলম বা জ্ঞান অপরিহার্য।

তাঁর দাওয়াত আমাদের শেখায় কীভাবে পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেও বিনয় বজায় রাখা যায় এবং কীভাবে যুক্তির মাধ্যমে সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করা যায়।

৫. অন্ধ অনুকরণের অবসান

নবী ইব্রাহিমের এই সংলাপ আমাদের শিক্ষা দেয়, মানুষের জীবনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সত্যের সন্ধান করা। শুধু পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য বা সামাজিক রীতির দোহাই দিয়ে ভুল পথে অবিচল থাকা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

কোরআনের বর্ণনামতে, ইব্রাহিম (আ.) ছিলেন সত্যনিষ্ঠ ও একনিষ্ঠ মুসলিম। (সুরা নিসা, আয়াত: ১২৫)

তিনি প্রথাগত ধর্মের বিপরীতে যুক্তি ও প্রমাণের ভিত্তিতে সত্যকে গ্রহণ করেছিলেন। সত্যের অনুসারীদের উচিত যুক্তির আলো দিয়ে মিথ্যার অন্ধকার দূর করা। তাঁর দাওয়াত আমাদের শেখায় কীভাবে পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেও বিনয় বজায় রাখা যায় এবং কীভাবে যুক্তির মাধ্যমে সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করা যায়।