ফাতেমা সমরকন্দি

বই ছিল যার বিয়ের কাবিন

মধ্য এশিয়ার তুর্কিস্তান ভূখণ্ড, যা শাশ অঞ্চলের দুই প্রবহমান নদী সিহুন ও জিহুনের কোল ঘেঁষে চীনের সীমান্ত ও তিব্বত পর্যন্ত বিস্তৃত, সেখানেই অবস্থিত কাসান নামের এক সমৃদ্ধ নগরী।

সুরম্য এক দুর্গ আর তার ফটকে বহমান ‘আখসিকিত’ উপত্যকা নিয়ে এই শহরটি ছিল তৎকালীন ইসলামের ছায়াতলে এক শান্তিময় জনপদ। 

এই নগরীর একটি সম্ভ্রান্ত গৃহের ছায়াতলে জন্ম নেন ফাতেমা। পিতা মুহাম্মদ ইবনে আহমদ সমরকন্দি (আবু মনসুর নামে পরিচিত) ছিলেন সেকালের শ্রেষ্ঠ ফকিহদের একজন। তিনি হানাফি ফিকহের অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত তুহফাতুল ফুকাহা গ্রন্থের রচয়িতা।

ফাতেমার সুখ্যাতি তুর্কিস্তানে ছড়িয়ে পড়লে তৎকালীন অনেক রাজা–রাজন্য এবং নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ফাতেমার পাণিপ্রার্থী হয়ে দূত পাঠান।

ইল্‌মি পরিবেশে বেড়ে ওঠা

শিশু ফাতেমা বেড়ে ওঠার সময়ই তাঁর পিতা হানাফি ফিকহের কালজয়ী গ্রন্থ তুহফাতুল ফুকাহার রচনা সমাপ্ত করেন। রচনাটি দ্রুতই হানাফি মাজহাবের নির্ভরযোগ্য প্রামাণ্যগ্রন্থে পরিণত হয়।

সেকালে প্রসিদ্ধ মুখতাসার আল-কুদুরির চেয়েও তথ্যসমৃদ্ধ হওয়ায় সমরকন্দির মর্যাদা ও খ্যাতি বহুগুণ বেড়ে যায়।

তবে শাস্ত্রীয় জ্ঞানচর্চা সমরকন্দিকে তাঁর পারিবারিক দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। তিনি তাঁর কন্যার লালন-পালন ও আদব শিক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন। ফাতেমাও ছিলেন অনন্য মেধার অধিকারিণী।

ইমাম আব্দুল হাই লখনভি তাঁর আল-ফাওয়াইদুল বাহিয়্যাহ ফি তারাজিমিল হানাফিয়্যা বইতে লিখেছেন, ফাতেমা ছিলেন একজন প্রাজ্ঞ ফকিহা ও আল্লামা। তিনি তাঁর পিতার কাছে ফিকহ শেখেন এবং তাঁর লেখা তুহফাতুল ফুকাহা মুখস্থ করেন।’ 

জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি তিনি আরবি অক্ষরলিপিতেও (ক্যালিগ্রাফি) অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেন। সমরকন্দি পরিবারের এই কন্যা খুব দ্রুতই তাঁর প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তার জন্য কাসান নগরীর বিখ্যাত ব্যক্তিতে পরিণত হন।

দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তাঁর কাছে আসা জটিল ফতোয়াগুলো দেখিয়ে পিতা তাঁর মতামত জানতে চাইতেন। ফাতেমা নিজের সুন্দর হাতের লেখায় সেই সব ফতোয়ার ওপর মন্তব্য লিখতেন এবং পিতার স্বাক্ষরের নিচে নিজের স্বাক্ষরও দিতেন। এ কারণে সমরকন্দির ফতোয়াতেগুলোতে দুটি স্বাক্ষর দেখা যায়।

ফাতেমা নিজের সুন্দর হাতের লেখায় সেই সব ফতোয়ার ওপর মন্তব্য লিখতেন এবং পিতার স্বাক্ষরের নিচে নিজের স্বাক্ষরও দিতেন।

বিয়ের প্রস্তাব ও পিতার বিচক্ষণতা

ফাতেমার সুখ্যাতি তুর্কিস্তানে ছড়িয়ে পড়লে তৎকালীন অনেক রাজা–রাজন্য এবং নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ফাতেমার পাণিপ্রার্থী হয়ে দূত পাঠান। কিন্তু পিতা সমরকন্দি সবিনয়ে সবার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন।

তিনি কন্যাকে এভাবে হাতছাড়া করতে চাচ্ছিলেন না যিনি তাঁর সমস্ত জ্ঞান ও আদর্শের ধারক।

আবু বকর ইবনে মাসউদ কাসানি নামে এক ছাত্র দীর্ঘ দিন সমরকন্দির সান্নিধ্যে থেকে উসুল ও ফিকহ শাস্ত্রে দক্ষতা অর্জন করেন। এমনকি তাঁর বিখ্যাত তুহফাতুল ফুকাহা গ্রন্থের একটি ব্যাখ্যাগ্রন্থও রচনা করেন—বাদায়িউস সানায়ে; যা আজও হানাফি ফিকহের শ্রেষ্ঠ রেফারেন্স গ্রন্থগুলোর একটি।

গ্রন্থটি দেখে সমরকন্দি এতটাই অভিভূত হন যে তিনি কন্যা ফাতেমাকে কাসানির সঙ্গে বিয়ে দিতে রাজি হন এবং সেই গ্রন্থকেই বিয়ের মোহরানা ধার্য করেন।

সে সময়ের ফকিহরা এই চমৎকার ঘটনা নিয়ে বলতেন, ‘তিনি উস্তাদের তুহফা ব্যাখ্যা করলেন, আর উস্তাদ তাঁকে নিজের কন্যাকে তুহফা দিলেন।’

তুহফা অর্থ উপঢৌকন। আবার সমরকন্দি রচিত গ্রন্থের নামও তুহফা। ফলে এই বিয়ে যেন হলো এক উপহারের বিনিময়ে আরেক উপহার।

বিয়ের পর ফতোয়ার কাগজে সমরকন্দির স্বাক্ষরের পাশে যোগ হয় তৃতীয় একটি স্বাক্ষর—সেটা ফাতেমার স্বামী কাসানির।

সংসার পরবর্তী জীবন ও জনকল্যাণ

বিয়ের পরও ফাতেমা নিয়মিত শিক্ষাদান চালিয়ে যান এবং অগণিত শিক্ষার্থী তাঁর কাছে ইল্‌ম অর্জন করেন। নারীরা তাঁদের ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় সমস্যার সমাধানে তাঁর শরণাপন্ন হতেন এবং তাঁকে আদর্শ হিসেবে মানতেন।

আলেপ্পোর ‘হালাবিয়া’ মাদ্রাসার ফকিহদের জন্য রমজানে নিয়মিত ইফতারের ব্যবস্থা শুরু করেন তিনি। জনশ্রুতি আছে, তাঁর হাতে দুটি স্বর্ণের বালা ছিল, যা বিক্রি করে তিনি এই ইফতারের খরচ চালাতেন।

তিনি মসজিদে বসে দরসে দিতেন, ফতোয়া দিতেন; এমনকি পুরুষরাও তাঁর দরসে আসতেন।

ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে, তিনি ফিকহের সূক্ষ্ম বিষয়গুলোতে বেশ দক্ষ ছিলেন এবং সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের মাধ্যমে সমাজ সংস্কারে ভূমিকা রাখতেন।

স্বামী কাসানির সঙ্গে তিনি রোম থেকে সিরিয়া পর্যন্ত সফর করেন এবং আলেপ্পো শহরে স্থায়ী হন। সেখানে সুলতান নুরুদ্দিন মাহমুদ ও আইয়ুবি শাসকদের সময় মুসলিম জনসাধারণের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন।

আলেপ্পোর ‘হালাবিয়া’ মাদ্রাসার ফকিহদের জন্য রমজানে নিয়মিত ইফতারের ব্যবস্থা শুরু করেন তিনি। জনশ্রুতি আছে, তাঁর হাতে দুটি স্বর্ণের বালা ছিল, যা বিক্রি করে তিনি এই ইফতারের খরচ চালাতেন।

সুবাইতা নওরিন : লেখক ও গল্পকার