ইতিহাস

ইবনে খালদুনের শিক্ষাদর্শন: তিন পর্বের পাঠদান ও প্রস্তাবনা

শিক্ষাকে কিছু তথ্য মুখস্থ করানোর মাধ্যম হিসেবে না দেখে ইবনে খালদুন দেখেছিলেন মানব মনস্তত্ত্ব, সমাজবিকাশ ও সভ্যতার এক অপরিহার্য শিল্প হিসেবে।

তাঁর অমর সৃষ্টি আল-মুকাদ্দিমাহ-র ষষ্ঠ পরিচ্ছেদে তিনি বিভিন্ন জ্ঞানের শ্রেণিবিন্যাস এবং শিক্ষাদানের পদ্ধতি নিয়ে যে দীর্ঘ ও গভীর আলোচনা করেছেন।

শিক্ষা একটি অর্জিত শিল্প

ইবনে খালদুনের দৃষ্টিতে জ্ঞান মানুষের জন্মগত কোনো বৈশিষ্ট্য নয়। মানুষ কোনো জ্ঞান নিয়ে জন্মায় না; বরং জন্মের পর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে সে তা অর্জন করে। 

মানুষের চিন্তাশক্তি সবসময় চারপাশের জগতকে বুঝতে চায় এবং এই বোঝার তাগিদ থেকেই সমাজে নানা বিদ্যা ও পেশার উৎপত্তি হয়।

ইবনে খালদুন জ্ঞানকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করেছেন: প্রথমটি হলো মানুষের বুদ্ধি ও চিন্তাপ্রসূত প্রাকৃতিক বা দার্শনিক বিজ্ঞান (যেমন গণিত, যুক্তিবিদ্যা ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞান); আর দ্বিতীয়টি হলো ওহি ও ঐতিহ্যের ওপর নির্ভরশীল ধর্মীয় শাস্ত্র।

সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, ইবনে খালদুন শিক্ষাদানকে একটি ‘সিনাআহ’ বা বিশেষায়িত শিল্প ও পেশা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর মতে, ভালো পড়াতে পারাটা নিছক কোনো ব্যক্তিগত গুণ বা মোহে আবিষ্ট হওয়ার বিষয় নয়; এটি চর্চার মাধ্যমে অর্জিত এক বিশেষ দক্ষতা।

ইসলামের প্রথম যুগে শিক্ষা ছিল কেবল শুনে শুনে ধর্ম পৌঁছানোর একটি অনানুষ্ঠানিক ধারা। কিন্তু পরবর্তীতে যখন মুসলিম সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটল এবং জটিল গবেষণার প্রয়োজন পড়ল, তখন শিক্ষাদানের জন্য নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ও নীতিমালার প্রয়োজন হয়ে পড়ল। (আল-মুকাদ্দিমাহ, পৃষ্ঠা: ৪৩৪, দারুল ফিকর, বৈরুত, ২০০১)।

যেহেতু শিক্ষাদান একটি অর্জিত দক্ষতা, তাই যুগে যুগে শিক্ষকদের শিক্ষাদান পদ্ধতিতে পার্থক্য দেখা গেছে। ইবনে খালদুন অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, শিক্ষাদানের কোনো একটিমাত্র চূড়ান্ত বা একক পথ নেই; বরং শিক্ষার্থীর অবস্থাভেদে পদ্ধতির বৈচিত্র্য থাকাই স্বাভাবিক।

অনেক শিক্ষক শুরুতেই ক্লাসে এসে ছাত্রদের এমন সব জটিল সংজ্ঞা ও দুর্বোধ্য তত্ত্বের মুখে ফেলে দেন, যা দেখে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ ও আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। ইবনে খালদুন তাঁর যুগের শিক্ষকদের এই ভুলের তীব্র সমালোচনা করেছেন।

ধাপে ধাপে বোধের নির্মাণ

অনেক শিক্ষক শুরুতেই ক্লাসে এসে ছাত্রদের এমন সব জটিল সংজ্ঞা ও দুর্বোধ্য তত্ত্বের মুখে ফেলে দেন, যা দেখে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ ও আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। ইবনে খালদুন তাঁর যুগের শিক্ষকদের এই ভুলের তীব্র সমালোচনা করেছেন।

তাঁর মতে, মানুষের শেখার ক্ষমতা একবারে বা জাদুর মতো তৈরি হয় না; এটি গড়ে ওঠে অত্যন্ত ধীরে এবং ধাপে ধাপে। 

বিশেষ করে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো বিমূর্ত জটিল বিষয় শুরুতেই আলোচনা না করে চোখের সামনে দেখা বাস্তব ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য উদাহরণ ব্যবহার করা উচিত।

তিনি নতুন শিক্ষার্থীদের একসাথে অনেকগুলো বিষয় না পড়িয়ে একটি বা সর্বোচ্চ দুটি বিষয়ে মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেন; কারণ একসাথে একাধিক কঠিন শাস্ত্রের মুখোমুখি হলে শিশু কোনোটিতেই পারদর্শিতা অর্জন করতে পারে না।

ইবনে খালদুন যে কার্যকর শিক্ষাপদ্ধতির প্রস্তাব করেছেন, তা মূলত তিনটি চক্রে বা তিন পর্বে সম্পন্ন হয়:

প্রথম পর্ব: এই ধাপে শিক্ষক শিক্ষার্থীর সামনে পুরো বিষয়ের একটি সহজ ও সামগ্রিক রূপরেখা তুলে ধরবেন। কোনো জটিল তাত্ত্বিক বিতর্ক বা সূক্ষ্ম মতভেদে না গিয়ে শুধু মৌলিক দিকগুলো সহজ উদাহরণের মাধ্যমে বুঝিয়ে দেওয়া হবে। 

এতে শিক্ষার্থীর মনে বিষয়টির প্রতি ভীতি দূর হবে এবং একটি প্রাথমিক ধারণাগত প্রস্তুতি তৈরি হবে।

দ্বিতীয় পর্ব: দ্বিতীয় দফায় শিক্ষক বিষয়টিকে আরেকটু বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করবেন। এখানে প্রাথমিক সারসংক্ষেপ থেকে বেরিয়ে তত্ত্বের গভীরে যাওয়া হবে, নানা ব্যাখ্যার তুলনা করা হবে এবং মতপার্থক্যগুলোর যৌক্তিক কারণ ব্যাখ্যা করা হবে। এর ফলে শিক্ষার্থীর বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্যতা আরও মজবুত হবে।

তৃতীয় পর্ব: শেষ দফায় এসে শিক্ষক আর কোনো অস্পষ্টতা বা জটিল গ্রন্থি অপূর্ণ রাখবেন না। বিষয়ের যাবতীয় কঠিন প্রশ্নের উত্তর এবং জটিল সমস্যার সমাধান এমনভাবে দেওয়া হবে, যেন শিক্ষার্থীর স্মৃতি ও যুক্তিতে বিষয়টি চিরতরে গেঁথে যায় এবং সে এই জ্ঞানের ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব বা ‘মালাকাহ’ লাভ করতে পারে। (আল-মুকাদ্দিমাহ, পৃষ্ঠা: ৫৩৮–৫৪০, দারুল ফিকর, বৈরুত, ২০০১)।

ইবনে খালদুনের ভাষায় এটিই হলো প্রকৃত ‘উপকারী শিক্ষা’। কিন্তু তাঁর সময়কার শিক্ষকেরা এই মনস্তাত্ত্বিক পর্যায়গুলোকে উপেক্ষা করে শুরুতেই কঠিন ধাঁধা নিয়ে শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করতেন, যা কোমলমতি মনের জন্য চরম ক্ষতিকর।

বেত্রাঘাত মেধা বিকাশের ঘাতক

শিক্ষাদানে শারীরিক শাস্তি ও কড়াকড়ির বিরুদ্ধে ইবনে খালদুনের অবস্থান ছিল রীতিমতো বৈপ্লবিক। তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে শিক্ষায় কঠোরতা ও শারীরিক নির্যাতন শিক্ষার্থীর ক্ষতি করে তিনটি দিক থেকে:

১. এটি শিক্ষার্থীর ভেতরের স্বাভাবিক উদ্দীপনা ও শেখার আনন্দকে মেরে ফেলে এবং তাকে অলস বানিয়ে দেয়।

২. শাস্তির ভয়ে শিশু প্রতিনিয়ত সত্য গোপন করতে এবং মিথ্যা ও অনৈতিক আচরণের আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।

৩. এটি শিশুর ব্যক্তিত্বকে কুঁকড়ে ফেলে এবং তাকে ভেতর থেকে ধূর্ত, চাটুকার ও প্রতারক হিসেবে গড়ে তোলে।

শিশুকে শুরুতেই কোরআন মুখস্থে না বসিয়ে প্রথমে ভাষা ও কবিতা শেখানো উচিত, এরপর গণিত শেখানো দরকার। ভাষা ও হিসাবের মতো ব্যবহারিক জ্ঞানে যখন শিশুর বোধশক্তি তৈরি হবে, তখন তাকে কোরআনের অর্থ ও পাঠ শেখানো উচিত; এরপর আসবে ধর্মতত্ত্ব ও অন্যান্য গভীর জ্ঞান।
ইবনুল আরাবি, মধ্যযুগের জ্ঞানতাত্ত্বিক

ইবনে খালদুন এতটাই দূরদর্শী ছিলেন যে তিনি রাষ্ট্রকে এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার দাবি জানিয়েছিলেন। তিনি প্রস্তাব করেছিলেন, তৎকালীন বাজার ও জননিরাপত্তা তদারককারী সরকারি কর্মকর্তার (মুহতাসিব) দায়িত্ব হওয়া উচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নজরদারি করা, যেন কোনো শিক্ষক শিশুদের গায়ে অন্যায়ভাবে আঘাত বা অতিরিক্ত প্রহার করতে না পারেন। (আল-মুকাদ্দিমাহ, পৃষ্ঠা: ৫৪৩, দারুল ফিকর, বৈরুত, ২০০১)

পাঠ্যক্রম বৈচিত্র্যের প্রস্তাবনা

তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন ভূখণ্ডের শিক্ষাব্যবস্থা বিশ্লেষণ করে ইবনে খালদুন পাঠ্যক্রমের নানা চিত্র তুলে ধরেছেন। সব মুসলিম সমাজেই শিক্ষার ভিত্তি ছিল পবিত্র কোরআন। তবে অঞ্চলভেদে এর সাথে অন্যান্য বিষয় যুক্ত করার ক্ষেত্রে ভিন্নতা ছিল:

উত্তর আফ্রিকা: এখানে শিশুরা ছোটবেলায় কেবল পবিত্র কোরআন মুখস্থ করত এবং এতে পূর্ণ দক্ষতা অর্জনের পরই কেবল ভাষা ও হস্তলিপি শিখত।

আন্দালুসিয়া: মুসলিম স্পেনের শিক্ষকেরা ছিলেন অনেক বেশি ভারসাম্যপূর্ণ। তাঁরা কোরআনের পাশাপাশি সমান গুরুত্ব দিয়ে শিশুদের কবিতা, চিঠি লেখার শিল্প, আরবি সাহিত্যের ব্যাকরণ এবং নান্দনিক হস্তলিপি শেখাতেন।

তিউনিসিয়া অঞ্চল: তাঁরা কোরআনের পাশাপাশি হাদিসের প্রাথমিক পাঠ ও নানা বিদ্যার মৌলিক নিয়মাবলি শেখাতেন এবং তিলাওয়াতের বিশুদ্ধতার ওপর বেশি নজর দিতেন।

মিসর-সিরিয়া: তাঁরা কোরআন ও জ্ঞানের মৌলিক বিষয়গুলোর ওপর জোর দিলেও হস্তলিপি শেখার কাজটি স্বতন্ত্র ও পেশাদার চারুলিপিকারদের হাতে ছেড়ে দিতেন।

এই আঞ্চলিক রূপরেখাগুলোর মধ্যে ইবনে খালদুন স্পেনের প্রখ্যাত বিচারপতি ও পণ্ডিত কাজী আবু বকর ইবনুল আরাবির দেওয়া শিক্ষাপদ্ধতিকে সবচেয়ে বেশি সমর্থন করেছিলেন। 

ইবনুল আরাবি প্রস্তাব করেছিলেন, শিশুকে শুরুতেই কোরআন মুখস্থে না বসিয়ে প্রথমে ভাষা ও কবিতা শেখানো উচিত, এরপর গণিত শেখানো দরকার। ভাষা ও হিসাবের মতো ব্যবহারিক জ্ঞানে যখন শিশুর বোধশক্তি তৈরি হবে, তখন তাকে কোরআনের অর্থ ও পাঠ শেখানো উচিত; এরপর আসবে ধর্মতত্ত্ব ও অন্যান্য গভীর জ্ঞান।

ইবনুল আরাবির যুক্তি ছিল, ভাষা না বুঝলে এবং যুক্তিবোধ তৈরি না হলে শিশু কোরআনের গভীর বাণী ও প্রজ্ঞাকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারবে না। ইবনে খালদুন এই চিন্তাকে অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত ও আধুনিক বলে সাধুবাদ জানিয়েছিলেন।