মক্কার অস্বীকারকারীরা প্রশ্ন তুলেছিল, কেন পুরো কোরআন একসঙ্গে নাজিল হলো না?
আল্লাহ-তাআলা এর উত্তর দিয়েছেন এভাবে, “যাতে আমি এর মাধ্যমে তোমার অন্তরকে মজবুত করি এবং আমি তা স্পষ্টভাবে ক্রমে ক্রমে পাঠ করেছি।” (সুরা ফুরকান, আয়াত: ৩২)
২৩ বছর ধরে মানবজাতির পথপ্রদর্শক হিসেবে এই মহাগ্রন্থের অবতরণ প্রক্রিয়া ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
ওহির তীব্রতা
ওহি নাজিলের সময় নবীজিকে এক কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হতো।
আয়েশা (রা.) বলেন, হারিস ইবনে হিশাম যখন নবীজিকে ওহি আসার পদ্ধতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন, তিনি উত্তর দিলেন, “কখনো তা ঘণ্টার আওয়াজের মতো আমার কাছে আসে, আর এটিই আমার জন্য সবচেয়ে কঠিন হয়। এরপর যখন সেই অবস্থা শেষ হয়, তখন যা বলা হয়েছে তা আমি আত্মস্থ করে ফেলি। আবার কখনো ফেরেশতা মানুষের রূপ ধরে আমার সঙ্গে কথা বলেন।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২)
কখনো তা ঘণ্টার আওয়াজের মতো আমার কাছে আসে, আর এটিই আমার জন্য সবচেয়ে কঠিন হয়। এরপর যখন সেই অবস্থা শেষ হয়, তখন যা বলা হয়েছে তা আমি আত্মস্থ করে ফেলি। আবার কখনো ফেরেশতা মানুষের রূপ ধরে আমার সঙ্গে কথা বলেন।সহিহ বুখারি, হাদিস: ২
আয়েশা (রা.) আরো বলেন, হাড়কাঁপানো শীতের দিনেও ওহি নাজিল শেষ হলে নবীজির কপাল থেকে ঘাম ঝরতে দেখা যেত।
শুরুতে নবীজি (সা.) ওহি ভুলে যাওয়ার আশঙ্কায় দ্রুত জিহ্বা নাড়াতেন।
তখন আল্লাহ-তাআলা অভয় দিয়ে আয়াত নাজিল করলেন, “তাড়াতাড়ি আয়ত্ত করার জন্য আপনি ওহি চলাকালে আপনার জিহ্বা নাড়াবেন না। এর সংরক্ষণ ও পাঠ করানোর দায়িত্ব আমারই।” (সুরা কিয়ামাহ, আয়াত: ১৬-১৭)
এরপর থেকে জিবরাইল (আ.) ওহি নিয়ে এলে তিনি কেবল নিশ্চুপ হয়ে শুনতেন এবং এরপর অলৌকিকভাবে দীর্ঘ দীর্ঘ সুরা তাঁর মুখস্থ হয়ে যেত।
কেন তিনি উম্মি নবী
মহানবী (সা.) কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করেননি; তিনি ছিলেন ‘উম্মি’ বা নিরক্ষর। এটি ছিল মহান আল্লাহর এক বিশেষ পরিকল্পনা। যদি তিনি আগে থেকেই লিখতে বা পড়তে পারতেন, তবে সংশয়বাদীরা দাবি করত যে তিনি অন্য কোনো বই দেখে এটি লিখে নিয়েছেন।
কুরআন বলছে, “এর আগে তো আপনি কোনো কিতাব পাঠ করেননি এবং আপনার ডান হাত দিয়ে তা লেখেননি; তেমন হলে বাতিলপন্থীরা অবশ্যই সন্দেহ করত।” (সুরা আনকাবুত, আয়াত: ৪৮)
মক্কার সেই নিরক্ষর সমাজে কোনো লাইব্রেরি বা একাডেমি ছিল না, ফলে কোরআন যে সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা বাণী, তা প্রমাণের জন্য নবীজির নিরক্ষরতা ছিল এক বড় ঢাল।
পুরো কোরআন একসঙ্গে কদরের রাতে প্রথম আসমানের ‘বাইতুল ইজ্জাহ’তে অবতীর্ণ হয় এবং সেখান থেকে প্রয়োজনে ক্রমে ক্রমে দুনিয়ায় আসে।আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)
কোরআন নাজিলের সময়কাল
পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, “রমজান মাস, যাতে কোরআন নাজিল করা হয়েছে।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৫)
এই ‘নাজিল হওয়া’র ব্যাখ্যা নিয়ে মুফাসসিরদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর মতে, পুরো কোরআন একসঙ্গে কদরের রাতে প্রথম আসমানের ‘বাইতুল ইজ্জাহ’তে অবতীর্ণ হয় এবং সেখান থেকে প্রয়োজনে ক্রমে ক্রমে দুনিয়ায় আসে।
তবে অনেক আধুনিক গবেষক এবং মুফাসসির মনে করেন, এই আয়াতের সবচেয়ে সঠিক ব্যাখ্যা হলো—রমজান মাসে কদরের রাতে প্রথম কোরআন নাজিলের সূচনা হয়েছিল।
ইবনে ইসহাক ও আবু সুলাইমান আল-দামেশকির মতে, কোরআনের প্রথম অংশ যেহেতু রমজানে এসেছিল, তাই একে রমজানে নাজিল হওয়া বলা হয়েছে। তাফসিরে মানার-এ এই মতটিকেই জোরালোভাবে সমর্থন করা হয়েছে।
চূড়ান্ত মোজেজা
নবীজি (সা.) বলেছিলেন, “প্রত্যেক নবীকে এমন কিছু মোজেজা দেওয়া হয়েছিল যা দেখে মানুষ ঈমান এনেছে। আর আমাকে দেওয়া হয়েছে এই ওহি বা কোরআন। আমি আশা করি কেয়ামতের দিন আমার অনুসারীই সবচেয়ে বেশি হবে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৯৮১)
২৩ বছরের ব্যবধানে টুকরো টুকরো হয়ে নাজিল হওয়া এই গ্রন্থটি আজ মানবজাতির জন্য আলোকবর্তিকা হয়ে টিকে আছে, যার একটি অক্ষরও আজ পর্যন্ত পরিবর্তন করা সম্ভব হয়নি।