জেলি, ক্যান্ডি, মারশম্যালো, কেক, চকোলেট, আইসক্রিম, দই থেকে শুরু করে ওষুধের ক্যাপসুলের খোলস এবং রূপচর্চার প্রসাধন সামগ্রীতে জিলাটিনের উপস্থিতি আজ সর্বব্যাপী
জেলি, ক্যান্ডি, মারশম্যালো, কেক, চকোলেট, আইসক্রিম, দই থেকে শুরু করে ওষুধের ক্যাপসুলের খোলস এবং রূপচর্চার প্রসাধন সামগ্রীতে জিলাটিনের উপস্থিতি আজ সর্বব্যাপী

জিজ্ঞাসা

খাদ্যে জিলাটিন কি হালাল

বর্তমান বিশ্বায়িত খাদ্যশিল্প ও আধুনিক কনফেকশনারিতে ‘জিলাটিন’ একটি অত্যন্ত বহুল ব্যবহৃত উপাদান। জেলি, ক্যান্ডি, মারশম্যালো, চকোলেট, কেক, আইসক্রিম, দই থেকে শুরু করে ওষুধের ক্যাপসুলের খোলস এবং রূপচর্চার প্রসাধন সামগ্রীতে জিলাটিনের উপস্থিতি আজ সর্বব্যাপী।

কিন্তু বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি সচেতন মুসলিম ভোক্তার জন্য এটি সবসময়ই এক গভীর ধর্মীয় উদ্বেগের কারণ। প্রশ্ন জাগে—জিলাটিন কি হালাল? এটি কোন প্রাণী থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে? এটি কি ইসলামের নীতি মোতাবেক জবাইকৃত পশুর অংশ, নাকি এতে নিষিদ্ধ শুকরের চর্বি বা হাড়ের মিশ্রণ রয়েছে?

জিলাটিন কী এবং কীভাবে উৎপাদন হয়

রসায়ন ও খাদ্যবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে জিলাটিন হলো এক প্রকার গন্ধহীন, বর্ণহীন ও ভঙ্গুর প্রোটিন জাতীয় যৌগ, যা মূলত প্রাণিজ কোলাজেন থেকে তাপ ও রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় সংগ্রহ করা হয়।

সাধারণত গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া কিংবা শুকরের হাড়, চামড়া, ক্ষুর ও যোজক কলা (কানেক্টিভ টিস্যু) দীর্ঘক্ষণ ফুটিয়ে প্রক্রিয়াজাত করার মাধ্যমে এই ঘন জেলির মতো পদার্থ তৈরি করা হয়।

যেহেতু জিলাটিনের সিংহভাগই প্রাণিজ উপাদান থেকে নিষ্কাশিত হয়, তাই ফিকহের দৃষ্টিতে এর বিধান স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ভর করে সেই মূল প্রাণীর পরিচয় ও তার জবাই পদ্ধতির ওপর।

হালালও সুস্পষ্ট এবং হারামও সুস্পষ্ট; আর এই দুয়ের মাঝে রয়েছে বহু সন্দেহজনক বিষয়, যা অধিকাংশ মানুষ জানে না। অতএব যে ব্যক্তি সন্দেহজনক বিষয়গুলো থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখল, সে নিজের ধর্ম ও সম্মানকে নিষ্কলঙ্ক রাখল।
সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২

খাদ্যে হালাল-হারামের মানদণ্ড

ইসলামে যাবতীয় খাবারের ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো প্রাথমিক সব খাদ্যই হালাল, যতক্ষণ না তা হারাম হওয়ার কোনো সুস্পষ্ট দলিল পাওয়া যায়।

কোরআনে আল্লাহ-তাআলা ঘোষণা করেন, “হে মানবমণ্ডলী, জমিনে যা কিছু হালাল ও পবিত্র রয়েছে তা থেকে তোমরা আহার করো, আর শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না; নিঃসন্দেহে সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৬৮)

যেসব খাদ্যবস্তু মানুষের জন্য স্থায়ীভাবে হারাম করা হয়েছে, তার বিশদ বিবরণ দিয়ে আল্লাহ-তাআলা বলেছেন, “বলুন: যা আমার প্রতি ওহি করা হয়েছে তাতে আমি এমন কিছু পাই না যা কোনো আহারকারী ব্যক্তির জন্য ভক্ষণ করা হারাম—শুধু যদি তা মৃত প্রাণী হয়, কিংবা প্রবাহিত রক্ত, কিংবা শুকরের মাংস; কারণ নিশ্চয়ই তা অপবিত্র ও নিকৃষ্ট; অথবা এমন অবাধ্যতার পশু যা আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে উৎসর্গ করা হয়েছে।” (সুরা আনআম, আয়াত: ১৪৫)

মহানবী (সা.) আরও স্পষ্ট করেছেন যে যেকোনো হিংস্র শ্বাপদ জন্তু (যার শিকারি দাঁত রয়েছে) এবং যেকোনো শিকারি নখযুক্ত পাখি ভক্ষণ করা নিষিদ্ধ। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৯৩৪)

অনুরূপভাবে খাইবারের যুদ্ধে মহানবী (সা.) গৃহপালিত গাধার মাংস ভক্ষণ হারাম ঘোষণা করেছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪২১৯)

উৎসের ভিত্তিতে জিলাটিনের বিধান

প্রামাণ্য নীতিমালার আলোকে জিলাটিনকে চারটি প্রধান শ্রেণিতে বিভক্ত করা যায়:

উদ্ভিজ্জ ও কৃত্রিম জিলাটিন: যদি কোনো জিলাটিন সামুদ্রিক আগাছা, পেকটিন, স্টার্চ কিংবা অন্যান্য উদ্ভিজ্জ ও সিন্থেটিক উৎস থেকে তৈরি করা হয়, তবে তা সর্বসম্মতভাবে শতভাগ হালাল ও পবিত্র। এতে কোনো সন্দেহ বা সংশয় নেই।

হালাল প্রাণীর জিলাটিন: গরু, মহিষ, উট, ছাগল বা ভেড়ার মতো যেসব গৃহপালিত পশুর গোশত খাওয়া ইসলামে হালাল, সেসব পশুকে যদি বিসমিল্লাহ পড়ে ইসলামের নির্ধারিত নিয়মে জবাই করা হয়, তবে তাদের হাড় বা চামড়া থেকে নিষ্কাশিত জিলাটিন সম্পূর্ণ হালাল।

এমন জিলাটিন দিয়ে তৈরি মিষ্টি, আইসক্রিম বা ক্যাপসুল সেবনে কোনো ধর্মীয় বাধা নেই।

শুকরজাত জিলাটিন: শুকর অপবিত্র (নাজিসুল আইন)। অতএব শুকরের হাড়, চর্বি বা চামড়া থেকে তৈরি জিলাটিন সর্বাবস্থায় হারাম ও বর্জনীয়। বিশ্ববাজারে প্রক্রিয়াজাত সস্তা খাদ্যের একটি বড় অংশে এই ধরনের জিলাটিন ব্যবহৃত হয়, যা মুসলমানদের জন্য একেবারেই নিষিদ্ধ।

অপবিত্র উপায়ে মৃত প্রাণীর জিলাটিন: হালাল প্রাণী হলেও যদি তা ইসলামি নীতিমালার তোয়াক্কা না করে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করে, শ্বাসরোধ করে, পানিতে ডুবিয়ে বা ভোঁতা অস্ত্রের আঘাতে মেরে ফেলা হয়, তবে তা মৃত পশুর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। ফলে সেই প্রাণীর গোশত খাওয়া যেমন হারাম, তার হাড় বা চামড়া থেকে সংগৃহীত জিলাটিনও তদ্রূপ হারাম।

তবে প্রাণীটি যদি পশ্চিমা দেশে খ্রিষ্টান বা ইহুদিদের (আহলে কিতাব) দ্বারা তাদের ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী উপযুক্তভাবে জবাই করা হয় এবং তাতে কোনো নিশ্চিত অপবিত্রতা না থাকে, তবে তা গ্রহণ করার অবকাশ রয়েছে। কিন্তু আধুনিক স্বয়ংক্রিয় স্লটারহাউসের প্রক্রিয়া যদি সন্দেহযুক্ত হয়, তবে তা পরিহার করাই তাকওয়ার দাবি।

জিলাটিনে কোলাজেন প্রোটিনের সম্পূর্ণ সত্তাগত রূপান্তর ঘটে না; বরং এটি প্রোটিনেরই একটি বিশেষ ভগ্নাংশ। সুতরাং মূল উৎস অপবিত্র বা শুকর হলে জিলাটিনও অপবিত্র ও হারাম থাকবে।

রাসায়নিক রূপান্তর নিয়ে বিতর্ক

জিলাটিনের ক্ষেত্রে একটি আধুনিক ফিকহি তর্ক রয়েছে, যাকে বলা হয় ‘ইস্তিহালাহ’ বা রাসায়নিক রূপান্তর। এর অর্থ হলো, কোনো অপবিত্র বস্তু কি প্রক্রিয়াজাতকরণের ফলে তার গুণগত পরিচয় সম্পূর্ণ হারিয়ে সম্পূর্ণ নতুন এক পবিত্র বস্তুতে রূপান্তরিত হতে পারে?

ইসলামিক অর্গানাইজেশন ফর মেডিকেল সায়েন্সেস (আইওএমএস) এবং ইউরোপিয়ান ফতোয়া কাউন্সিলের একদল স্কলারের মতে, হাড় ও টিস্যুকে যখন তীব্র এসিড ও তাপে জিলাটিনে রূপ দেওয়া হয়, তখন তা ইস্তিহালাহ হয়ে যায় এবং তা ব্যবহার জায়েজ।

কিন্তু শাফেয়ি, হাম্বলি এবং ভারতীয় উপমহাদেশের হানাফি ফকিহদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের (যেমন দেওবন্দ ও সৌদি আরবের লাজনাহ দায়িমাহ) মত হলো, জিলাটিনে কোলাজেন প্রোটিনের সম্পূর্ণ সত্তাগত রূপান্তর ঘটে না; বরং এটি প্রোটিনেরই একটি বিশেষ ভগ্নাংশ। সুতরাং মূল উৎস অপবিত্র বা শুকর হলে জিলাটিনও অপবিত্র ও হারাম থাকবে। (ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ, ২২/২৬০; ফাতাওয়া শামি, ১/৩২৬)

মুসলিম ভোক্তার সতর্কতা

সন্দেহজনক খাদ্য পরিহার করা মুমিনের আত্মিক নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, “হালালও সুস্পষ্ট এবং হারামও সুস্পষ্ট; আর এই দুয়ের মাঝে রয়েছে বহু সন্দেহজনক বিষয়, যা অধিকাংশ মানুষ জানে না। অতএব যে ব্যক্তি সন্দেহজনক বিষয়গুলো থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখল, সে নিজের ধর্ম ও সম্মানকে নিষ্কলঙ্ক রাখল।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২)

মুসলিম ভোক্তাদের উচিত বাজারে যেকোনো প্রক্রিয়াজাত খাদ্য কেনার আগে পণ্যের গায়ে থাকা ‘হালাল লোগো’ বা উপাদান তালিকা খতিয়ে দেখা।

যদি পণ্যে শুধু ‘জিলাটিন’ লেখা থাকে কিন্তু তার উৎস হালাল কি না তা নিশ্চিত না হওয়া যায়, তবে তা পরিহার করাই নিরাপদ। তবে যদি ‘হালাল বোভিন জিলাটিন’ (হালাল গরুর জিলাটিন) কিংবা ‘ভেজিটেবল/ফিশ জিলাটিন’ লেখা থাকে, তবে তা নিঃসঙ্কোচে গ্রহণ করা যাবে।