টেলিস্কোপে নতুন হিজরি মাসের চাঁদ দেখছেন ফিলিপাইনের এক মুসলিম
টেলিস্কোপে নতুন হিজরি মাসের চাঁদ দেখছেন ফিলিপাইনের এক মুসলিম

চাঁদ দেখা: হিজরি ক্যালেন্ডার নিয়ে এক অমীমাংসিত বিতর্ক

চাঁদের নিজস্ব কোনো আলো নেই, সূর্যের আলোর প্রতিফলনেই সে রাতের আকাশে দ্যুতি ছড়ায়। সূর্য-পৃথিবী-চাঁদের পারস্পরিক কৌণিক অবস্থানের পরিবর্তনে চাঁদের দৃশ্যমান আকৃতি বদলায়, আর এই পরিবর্তনের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে হিজরি বর্ষপঞ্জি।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তারা তোমাকে নতুন চাঁদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলো, তা মানুষের জীবন পরিচালনা ও হজের জন্য সময় নির্ধারণের চিহ্ন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৯)

রমজানের রোজা, ঈদের তারিখ, হজ—এই গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতগুলো হিজরি মাসের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। কিন্তু আধুনিক মহাকাশবিজ্ঞানের যুগেও প্রতিবছর হিজরি মাসের চাঁদ নিয়ে, বিশেষ করে রমজান-ঈদের চাঁদ দেখা নিয়ে মুসলিম বিশ্বে যে বিভেদ তৈরি হয়, তা দুঃখজনক।

এই বিতর্কের মূল জায়গাটা কোথায়, আর এটা কতটা মীমাংসিত বা অমীমাংসিত, তা বোঝা জরুরি।

যখন চাঁদ ও সূর্য একই দ্রাঘিমাংশে চলে আসে, তখন চাঁদ পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যায়। এটাকে বলা হয় ‘জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক নতুন চাঁদ’ বা ‘ডার্ক মুন’।

দুই ধরনের ‘নতুন চাঁদ’

জ্যোতির্বিজ্ঞানে একটা সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। যখন চাঁদ ও সূর্য একই দ্রাঘিমাংশে চলে আসে, তখন চাঁদ পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যায়। এটাকে বলা হয় ‘জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক নতুন চাঁদ’ বা ‘ডার্ক মুন’।

এই মুহূর্তটা সারা পৃথিবীর জন্য একক, কোনো ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করে না। কিন্তু ইসলামের ভাষায় ‘নতুন চাঁদ’ মানে সূর্যের সঙ্গে সংযোগের পর চাঁদ যখন প্রথম একটা বাঁকা রুপালি রেখা হিসেবে পশ্চিম আকাশে দেখা দেয়।

এই দৃশ্যমানতা সূর্যাস্ত-চন্দ্রাস্তের সময়ের ব্যবধান আর পর্যবেক্ষকের অবস্থানের ওপর নির্ভরশীল।

চান্দ্রমাসের গড় দৈর্ঘ্য ২৯ দিন ১২ ঘণ্টা ৪৪ মিনিট ২ দশমিক ৮ সেকেন্ড। মধ্যযুগে আল-বাত্তানি, আল-বিরুনি, নাসিরুদ্দিন আত-তুসির মতো মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে এই হিসাব কষেছিলেন।

আজকের কম্পিউটার আর আধুনিক চন্দ্রসারণি দিয়ে পৃথিবীর যেকোনো জায়গা থেকে চাঁদের অবস্থান প্রায় নির্ভুলভাবে গণনা করা সম্ভব।

প্রযুক্তিগত মানদণ্ড

চাঁদ দেখা নিয়ে বিভ্রান্তি কমাতে ১৯৭৮ সালে ইস্তাম্বুল সম্মেলনে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের পরামর্শে দুটি মানদণ্ড নির্ধারিত হয়—সূর্যাস্তের সময় দিগন্ত থেকে চাঁদের উচ্চতা অন্তত ৫ ডিগ্রি, আর চাঁদ-সূর্যের মধ্যকার কৌণিক দূরত্ব অন্তত ৮ ডিগ্রি।

তারা তোমাকে নতুন চাঁদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলো, তা মানুষের জীবন পরিচালনা ও হজের জন্য সময় নির্ধারণের চিহ্ন।
কোরআন, সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৯

এই মানদণ্ড আজও উত্তর আমেরিকা ফিকহ কাউন্সিল, ইউরোপিয়ান কাউন্সিল ফর ফতোয়া অ্যান্ড রিসার্চসহ একাধিক প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে। অবশ্য পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু দেশ ২০২১ সাল থেকে আরেকটু শিথিল মানদণ্ড (৩ ডিগ্রি উচ্চতা, ৬ দশমিক ৪ ডিগ্রি কৌণিক দূরত্ব) গ্রহণ করেছে।

বিতর্ক কেন হয়

প্রযুক্তিগত মানদণ্ডে ব্যাপক ঐকমত্য থাকলেও এই হিসাবকে ঠিক কতটা জায়গা দেওয়া হবে, তা নিয়ে ফকিহদের মধ্যে বাস্তব ও অমীমাংসিত মতভেদ আছে। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা চাঁদ দেখে রোজা রাখো, চাঁদ দেখেই রোজা ভাঙো (ঈদ করো), আর আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলে ত্রিশ দিন পূর্ণ করো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯০৯)

প্রশ্নটা হলো, এই হাদিসের ‘দেখা’কে কি ‘চোখে দেখা’ মানতে হবে, নাকি বৈজ্ঞানিক হিসাবের মাধ্যমেও তা পূরণ হতে পারে?

আন্তর্জাতিক ইসলামি ফিকহ একাডেমি (আম্মান, ১৯৮৬) এই প্রশ্নে একটা তুলনামূলক রক্ষণশীল অবস্থান নিয়ে বলেছে যে সরাসরি চাঁদ দেখা বাধ্যতামূলক, জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাব শুধু সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করা যাবে, কিন্তু নির্ভরযোগ্য সাক্ষীর সাক্ষ্যকে বাতিল করার ক্ষমতা এই হিসাবের নেই।

বহু জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি আজও এই অবস্থানে অটল।

অন্যদিকে মিসরের রাষ্ট্রীয় ফতোয়া বোর্ড (দারুল ইফতা আল-মিসরিয়্যাহ) এবং ফকিহ মুস্তফা আজ-জারকার মতো কিছু আধুনিক আলেম আরেকটু এগিয়ে একটা অবস্থান নিয়েছেন। তাদের মতে, যদি গাণিতিক হিসাব নিশ্চিতভাবে বলে যে চাঁদ দেখা বৈজ্ঞানিকভাবে অসম্ভব, তাহলে কারও চাক্ষুষ সাক্ষ্যকে ভুল বলে প্রত্যাখ্যান করা যাবে। (মুস্তফা আজ-জারকা, আশ-শরিয়াতুল ইসলামিয়্যাহ ফি সাউবিল আসর, ২/১৫, দারুল কলম, দামেস্ক, ১৯৯৮)

এই অবস্থানের একটা প্রাচীন ভিত্তিও আছে। ইমাম সুবকি এই যুক্তিতে একমত ছিলেন যে সাক্ষ্য যেহেতু সম্ভাব্যতার (জান্নি) স্তরের, আর গাণিতিক হিসাব নিশ্চিত (কাতঈ), তাই নিশ্চিতের সঙ্গে সাংঘর্ষিক সম্ভাব্যতা গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু এই মতটা পূর্বেকার ফিকহেও সংখ্যালঘু মত ছিল, সর্বসম্মত নয়।

অর্থাৎ ‘বিজ্ঞান বনাম চাঁদ দেখা’ বিতর্কটা এখনো মীমাংসিত নয়—এটা একটা সক্রিয় আলোচনা, যেখানে দুটো সম্মানিত অবস্থানই বিদ্যমান।

ইসলামের প্রথম যুগের ফকিহরা জ্যোতির্বিজ্ঞানকে সন্দেহের চোখে দেখতেন, কারণ তখন জ্যোতির্বিজ্ঞান আর জ্যোতিষশাস্ত্রের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য ছিল না, আজকের বিজ্ঞান সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো।

নমনীয়তার একটা চিরন্তন নীতি

নবীজি (সা.)-এর একটা বৈশিষ্ট্য ছিল, দুটি বিকল্পের মুখোমুখি হলে তিনি সব সময় সহজটা বেছে নিতেন। কোরআনে তাঁর এই কোমল স্বভাবের কথা এসেছে, তিনি মুমিনদের প্রতি অত্যন্ত দয়ার্দ্র। (সুরা তাওবা, আয়াত: ১২৮)

আল্লাহও বলেছেন, ‘আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান, কঠিন করতে চান না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৫)

ইসলামের প্রথম যুগের ফকিহরা জ্যোতির্বিজ্ঞানকে সন্দেহের চোখে দেখতেন, কারণ তখন জ্যোতির্বিজ্ঞান আর জ্যোতিষশাস্ত্রের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য ছিল না, আজকের বিজ্ঞান সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো। এই পার্থক্যটা মাথায় রেখেই সমকালীন আলোচনা এগোনো দরকার।

হিজরি ক্যালেন্ডার শুধু তারিখ পরিবর্তনের মাধ্যম নয়, উম্মাহর ঐক্যের একটা প্রতীক। মেঘ বা ভুল রিপোর্টের কারণে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে কয়েক দিনের ব্যবধান তৈরি হওয়াটা সত্যিই দুঃখজনক।

কিন্তু এই সমস্যার সমাধান একরৈখিক নয়, বিজ্ঞানের হিসাবকে ‘সহায়ক’ হিসেবে ব্যবহারের ব্যাপারে মোটামুটি ঐকমত্য থাকলেও, তাকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তদাতা বানানো নিয়ে ফকিহদের মধ্যে মতভেদ এখনো বাস্তব। এই বিতর্ককে সরলীকৃত না করে, তার জটিলতা স্বীকার করে এগোনোই সবচেয়ে সৎ পথ।