কোরআনের উপমায় প্রাণ–প্রকৃতি ২

প্রকৃতি থেকে মানবজীবনের ৩ শিক্ষা

কোরআন প্রাণপ্রকৃতির উপমা দিয়ে মানুষকে শুধু আল্লাহর কুদরত চিনতে শেখায়নি; বরং নিজের জীবন নিয়েও ভাবতে শিখিয়েছে, আমাদের চারপাশের জগৎকে নতুন করে দেখতে শিখিয়েছে।

ইতিপূর্বে আমরা দেখেছি পাথরের ওপরে আলগা মাটি, উঁচু ভূমির বাগান, একই শ্রেণির গাছে ফলনের ভিন্নতা কিংবা বাতাসে উড়ে যাওয়া ছাইয়ের উপমা দিয়ে কোরআন কী গভীর বার্তা দিয়েছে।

এখন আমরা দেখব, মৌমাছির জীবনব্যবস্থা, ফসলের বেড়ে ওঠা ও শুকিয়ে যাওয়া এবং খাদের কিনারার উপমার মধ্য দিয়ে কোরআন মানুষকে কী শিক্ষা দেয়।

৫. মৌমাছির জীবনব্যবস্থা থেকে শিক্ষা

আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘আপনার পালনকর্তা মৌমাছিকে আদেশ করলেন—তুমি পাহাড়ে, গাছে এবং মানুষ যে মাচান তৈরি করে তাতে ঘর বানাও। অতঃপর প্রত্যেক ফল থেকে আহার করো এবং তোমার প্রতিপালকের সহজ পদ্ধতি অনুসরণ করো। এর পেট থেকে বিভিন্ন রঙের পানীয় বের হয়। এতে মানুষের জন্য রয়েছে আরোগ্য। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল মানুষের জন্য নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা নাহল, আয়াত ৬৮–৬৯)

মৌমাছির জীবনব্যবস্থার উদাহরণ দিয়ে আল্লাহ–তাআলা আমাদের অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে ইশারা দিয়েছেন। যেমন:

প্রকৃতির ক্ষুদ্রতম প্রাণীর মধ্যেও আল্লাহ-তাআলা যে নিখুঁত ব্যবস্থা, শৃঙ্খলা ও হেকমত রেখেছেন, তা নিয়ে চিন্তা করলেই মানুষের সামনে সৃষ্টিকর্তার কুদরত আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ক. ওহি মোতাবেক জীবন চালানো: মৌমাছি নিজের খেয়াল-খুশি অনুযায়ী চলে না; আল্লাহ–তাআলা তাকে যে পথে চলার নির্দেশ দিয়েছেন, সে সেই পথেই চলে। কোথায় বাসা বানাবে, কোথা থেকে আহার করবে এবং কীভাবে চলবে—সবকিছুর মধ্যেই রয়েছে আল্লাহর নির্ধারিত নিয়ম।

মানুষের জীবনও অর্থবহ হয় তখনই, যখন সে নিজের প্রবৃত্তি ও খেয়াল-খুশির পরিবর্তে আল্লাহর দেওয়া বিধানকে জীবনের পথনির্দেশ হিসেবে গ্রহণ করে। নিজের বুদ্ধি ও প্রবৃত্তিকে ওহির ওপর প্রাধান্য না দিয়ে আল্লাহর দেখানো ‘সহজ পথ’ অনুসরণ করাই মানুষের প্রকৃত সাফল্যের পথ।

খ. অন্যের ক্ষতি না করা: মৌমাছি তার খাদ্যের জন্য পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর উৎস বেছে নেয়। ফুল থেকে রস সংগ্রহ করে এবং সেই রস থেকেই মধুর মতো উপকারী বস্তু তৈরি করে। একই সঙ্গে তাতে মানুষের জন্য আরোগ্যও রয়েছে। তার কর্মের সুফল শুধু তার নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং অন্যরাও তা থেকে উপকৃত হয়। মানুষেরও এমন হওয়া উচিত।

তা ছাড়া মৌমাছি মধু সংগ্রহ করতে এমনভাবে ফুলের ওপর বসে, সেই ফুলের কোনো ক্ষতি হয় না। একটি হাদিসে এই বিষয়টিকে এভাবে বলা হয়েছে: সেই সত্তার কসম, যার হাতে মুহাম্মদের প্রাণ—নিশ্চয় মুমিনের উদাহরণ মৌমাছির মতো। সে পবিত্র জিনিস খায়, (পেট থেকে) পবিত্র জিনিসই বের করে, আর সে যখন (ফুলের ওপর) বসে, তখন তা ভেঙে ফেলে না কিংবা নষ্টও করে না।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ৬৮৭২)

গ. চিন্তাশীলতার তাগিদ: আয়াতের শেষে আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই এতে চিন্তাশীল মানুষের জন্য নিদর্শন রয়েছে।’

অর্থাৎ মৌমাছিকে শুধু দেখলেই হবে না; তার জীবনব্যবস্থা থেকে শিক্ষা নিতে হবে। প্রকৃতির ক্ষুদ্রতম প্রাণীর মধ্যেও আল্লাহ-তাআলা যে নিখুঁত ব্যবস্থা, শৃঙ্খলা ও হেকমত রেখেছেন, তা নিয়ে চিন্তা করলেই মানুষের সামনে সৃষ্টিকর্তার কুদরত আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এর উপমা হলো বৃষ্টি, যার উৎপন্ন ফসল কৃষকদের আনন্দ দেয়, তারপর সেগুলো শুকিয়ে যায়, ফলে আপনি ওগুলো পীতবর্ণ দেখতে পান, অবশেষে সেগুলো খড়কুটায় পরিণত হয়। আর আখিরাতে রয়েছে কঠিন শাস্তি এবং আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। আর দুনিয়ার জীবন প্রতারণা সামগ্রী ছাড়া কিছু নয়।
সুরা হাদিদ, আয়াত ২০

৬. ফসলের জীবন থেকে শিক্ষা

আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘হে মানুষ, পুনরুত্থান সম্বন্ধে যদি তোমাদের সন্দেহ হয়, তাহলে (ভেবে দেখো যে) আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি মাটি হতে, তারপর বীর্য হতে, তারপর রক্তপিণ্ড হতে, তারপর পূর্ণাকৃতি বা অপূর্ণাকৃতি মাংসপিণ্ড হতে; যাতে আমি তোমাদের নিকট (আমার সৃজনশক্তির মহিমা) ব্যক্ত করি। আমার ইচ্ছা অনুযায়ী তা এক নির্দিষ্ট কালের জন্য মাতৃগর্ভে স্থিত রাখি, তারপর আমি তোমাদেরকে শিশুরূপে বের করি; পরে যাতে তোমরা পরিণত বয়সে উপনীত হও।

‘তোমাদের মধ্যে কারও কারও মৃত্যু ঘটানো হয় এবং তোমাদের মধ্যে কাউকেও প্রত্যাবৃত্ত করা হয় অকর্মণ্য (স্থবিরতার) বয়সে; যার ফলে সে যা কিছু জানত, সে সম্বন্ধেও সজ্ঞান থাকে না। আর তুমি ভূমিকে দেখো শুষ্ক, এরপর তাতে আমি বৃষ্টি বর্ষণ করলে তা শস্য-শ্যামল হয়ে আন্দোলিত ও ও বাড়বাড়ন্ত হয়ে ওঠে এবং তা উৎপন্ন করে সর্বপ্রকার নয়নাভিরাম উদ্ভিদ।’ (সুরা হজ, আয়াত ৫)

একই রকম উপমার আরেকটি আয়াত এমন: ‘তোমরা জেনে রাখো, নিশ্চয় দুনিয়ার জীবন খেল-তামাশা, ক্রীড়া-কৌতুক, জাঁকজমক, পারস্পরিক গর্ব-অহংকার, ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে প্রাচুর্য লাভের প্রতিযোগিতা ছাড়া আর কিছু নয়। এর উপমা হলো বৃষ্টি, যার উৎপন্ন ফসল কৃষকদের আনন্দ দেয়, তারপর সেগুলো শুকিয়ে যায়, ফলে আপনি ওগুলো পীতবর্ণ দেখতে পান, অবশেষে সেগুলো খড়কুটায় পরিণত হয়। আর আখিরাতে রয়েছে কঠিন শাস্তি এবং আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। আর দুনিয়ার জীবন প্রতারণা সামগ্রী ছাড়া কিছু নয়।’ (সুরা হাদিদ, আয়াত ২০)

বৃষ্টির পানি পেয়ে শুকনো জমি যেমন হঠাৎ সজীব হয়ে ওঠে, চারদিকে সবুজ শস্যের সমারোহ দেখা দেয়, কৃষকের চোখে-মুখে আনন্দ ফুটে ওঠে; তেমনই মানুষের জীবনও জন্ম, শৈশব ও কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে এসে পূর্ণতা লাভ করে। তখন শরীরের শক্তি, সৌন্দর্য ও কর্মক্ষমতা দেখে মনে হয়, এই সময় বুঝি দীর্ঘদিন এমনই থাকবে।

কিন্তু ঋতুর পরিবর্তনের সঙ্গে যেমন সবুজ শস্য শুকিয়ে হলুদ হয়ে যায়, মানুষের জীবনেও ধীরে ধীরে জরা ও বার্ধক্য নেমে আসে। যে শরীর একসময় ছিল শক্তিশালী, সেটিই একদিন দুর্বল হয়ে পড়ে; যে মুখে ছিল তারুণ্যের দীপ্তি, সেখানে বয়সের ছাপ স্পষ্ট হয়। শেষ পর্যন্ত মৃত্যু এসে দুনিয়ার সব আয়োজনের পরিসমাপ্তি ঘটায়।

কোরআন এই পরিবর্তনকে শস্যের জন্ম, সজীবতা, শুকিয়ে যাওয়া ও খড়কুটায় পরিণত হওয়ার দৃশ্যের মাধ্যমে আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরেছে। দুনিয়ার জীবনও এমনই—এর সৌন্দর্য যতই আকর্ষণীয় হোক, তা স্থায়ী নয়।

তাই যৌবন, সম্পদ, সন্তান-সন্ততি কিংবা দুনিয়ার সাফল্য নিয়ে অহংকার করার কিছু নেই। এগুলো সবই একদিন ফুরিয়ে যাবে। বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে থেমে থাকে না; বরং এর পরিণতির কথা মনে রেখে স্থায়ী আখেরাতের জন্য প্রস্তুতি নেয়।

কল্পনা করুন, একজন লোক পাহাড় বা খাদের একেবারে কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে। একটু ভারসাম্য হারালেই সে গভীর খাদে পড়ে যেতে পারে। দুর্বল ইমানের মানুষের অবস্থাও ঠিক এমন।

৭. দোদুল্যমান ইমানের উপমা

আল্লাহ–তাআলা বলেন: ‘আর মানুষের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহর ইবাদত করে এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে। তার কোনো কল্যাণ হলে তাতে সে সন্তুষ্ট হয়; কিন্তু তার ওপর কোনো পরীক্ষা এলে সে পিছিয়ে যায়। ফলে সে দুনিয়া ও আখিরাত—উভয়ই হারায়। এটাই সুস্পষ্ট ক্ষতি।’ (সুরা হজ, আয়াত ১১)

কল্পনা করুন, একজন লোক পাহাড় বা খাদের একেবারে কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে। একটু ভারসাম্য হারালেই সে গভীর খাদে পড়ে যেতে পারে। দুর্বল ইমানের মানুষের অবস্থাও ঠিক এমন। যতক্ষণ জীবনে সুখ, স্বাচ্ছন্দ্য ও কল্যাণ থাকে, ততক্ষণ সে আল্লাহর ইবাদতে স্থির থাকে; কিন্তু বিপদ-পরীক্ষা এলেই তার ইমান টলে যায়।

আয়াতে এমন অবস্থাকে বোঝাতে ‘হারফুন’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যার অর্থ কিনারা বা প্রান্ত। অর্থাৎ, সে ইমানের সুদৃঢ় ভূমিতে নয়, বরং একেবারে কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে। ফলে সামান্য পরীক্ষাতেই সে সেখান থেকে পিছলে পড়ে এবং দুনিয়া ও আখিরাত—উভয়ই হারায়।

এটাই কোরআনের চিত্রময় বর্ণনার এক অপূর্ব নিদর্শন—মাত্র একটি শব্দের মাধ্যমে দোদুল্যমান ইমানের মানসিক ও আধ্যাত্মিক অবস্থাকে চোখের সামনে দৃশ্যমান করে তোলা হয়েছে।

  • মওলবি আশরাফ: আলেম, লেখক ও অনুবাদক

    mawlawiashraf@gmail.com