জ্ঞান কখনোই শুধু ব্যক্তির সম্পদ নয়; এটি সভ্যতারও চরিত্র। মানুষ যেমন জানে, তেমনি সভ্যতাও জানে। ব্যক্তি দুনিয়াটাকে কেমন করে বোঝে, অনেক সময় তার নির্ধারক হয় এই সওয়াল যে লোকটি কোন সভ্যতার ভাষা, শিক্ষা, প্রতিষ্ঠান, ইতিহাস ও নৈতিক কল্পনার মধ্যে বেড়ে উঠেছে?
ফলে জ্ঞানকে সেরেফ ব্যক্তিগত আকলি কর্মকাণ্ড হিসেবে ব্যাখ্যা করলে তার বৃহত্তর সামাজিক ও ঐতিহাসিক বুনিয়াদ গরহাজির থেকে যায়। ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা তাই জ্ঞানের একটি সভ্যতাগত মাত্রা খাড়া করে।
কারণ, কোনো সভ্যতা শুধু প্রযুক্তি, স্থাপত্য কিংবা অর্থনীতির ওসিলায় আলাদা হয় না; তার সবচেয়ে আসলি পার্থক্য নিহিত থাকে সে পৃথিবীকে কীভাবে পড়ে এবং সেই পাঠের ভিত্তিতে মানুষের অবস্থান কীভাবে নির্ধারণ করে।
ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার নজরে প্রত্যেক সভ্যতার কেন্দ্রে একটি মৌলিক জ্ঞানরীতি কার্যকর থাকে। এই জ্ঞানরীতিই নির্ধারণ করে, মানুষ প্রকৃতিকে কী নামে ডাকবে, ইতিহাসকে কী অর্থ দেবে, রাষ্ট্রের গরজ কী হবে, অর্থনীতির সরহদ কতটুকু এবং মানুষের সাফল্যের সংজ্ঞা কী।
প্রকৃতি তখন মানুষের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, আবার মানুষের সম্পূর্ণ মালিকানাধীন দৌলতও নয়। মানুষ তার শুধু ভোক্তা নয়; সে খলিফা। আর খিলাফতের অর্থ আধিপত্য নয়; আমানতদারি।
ফলে সভ্যতার সংকট শুধু প্রযুক্তির সংকট নয়; তার গভীরে থাকে জ্ঞানদৃষ্টিরও সংকট। একটি সভ্যতা তার জ্ঞানের ধরন বদলালে ধীরে ধীরে তার আখলাক, রাজনীতি, শিক্ষা এবং সংস্কৃতিও বদলাতে থাকে। কারণ জ্ঞান সভ্যতার পয়লা স্থপতি।
এইখানে ইসলামি সভ্যতার স্বাতন্ত্র্য জাহির হয়। ইসলামি সভ্যতা প্রকৃতিকে কখনো শুধু বস্তু হিসেবে পাঠ করেনি। প্রকৃতিকে সে আয়াত হিসেবে পাঠ করেছে। আয়াত মানে নিদর্শন। আয়াত এমন সত্তা, যা নিজের দিকে নয়, নিজের ঊর্ধ্বের সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে।
এই পাহাড়, নদী, বৃক্ষ, দিন-রাত, বৃষ্টি-রোদ হয়ে ওঠে একটি বৃহত্তর নেজামের ভাষা। তারা আল্লাহর হিকমাহ, কুদরত, মীযান ও রহমতের বহিঃপ্রকাশ। ফলে প্রকৃতিকে জানার অর্থ তাকে শুধু জয় করা নয়; তাকে বুঝে তার সঙ্গে ন্যায়সংগত সম্পর্ক স্থাপন করা।
এই দৃষ্টিভঙ্গি ইসলামি সভ্যতাকে একটি বিশেষ জ্ঞাননৈতিকতা প্রদান করেছিল। প্রকৃতি তখন মানুষের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, আবার মানুষের সম্পূর্ণ মালিকানাধীন দৌলতও নয়। মানুষ তার শুধু ভোক্তা নয়; সে খলিফা। আর খিলাফতের অর্থ আধিপত্য নয়; আমানতদারি।
এই দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে প্রকৃতির অধ্যয়নকে ইবাদত, দায়িত্ব ও মানবকল্যাণের সঙ্গে যুক্ত করা যায় । জ্যোতির্বিজ্ঞান আকাশের জ্যোতিষ্ক, তাদের গতি, অবস্থান ও পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে অনুসন্ধান করবে এবং মহাজাগতিক শৃঙ্খলা অনুধাবনের পথ খুলবে।
জীববিজ্ঞান জীবের গঠন, বিকাশ, বৈচিত্র্য ও পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে অধ্যয়ন করবে এবং প্রাণজগতের জটিল সংগতি বুঝতে সহায়তা করবে। চিকিৎসাবিজ্ঞান মানবদেহের গঠন, কার্যপ্রণালি, রোগ ও সুস্থতা নিয়ে অনুসন্ধান করবে এবং দেহের ভারসাম্য রক্ষার ওসিলা তলব করবে।
কৃষিবিজ্ঞান মাটি, পানি, বীজ, উদ্ভিদ ও কৃষি-উৎপাদনের প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করবে এবং জীবনের ধারক ভূমি ও খাদ্যব্যবস্থার স্থায়িত্ব বোঝার সুযোগ পয়দা করবে। ভূগোল পৃথিবীর ভূমিরূপ, জলভাগ, জলবায়ু, জনপদ ও মানব-পরিবেশের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করবে।
স্থাপত্য ও প্রকৌশল বসতি, অবকাঠামো, নির্মাণপ্রযুক্তি ও পরিবেশের পারস্পরিক সম্পর্ক বিবেচনা করে মানুষের জীবনোপযোগী ভারসাম্য কায়েমের কুশেশ করবে।
একইভাবে, গণিত পরিমাণ, পরিমিতি, অনুপাত ও গাণিতিক সম্পর্কের অনুসন্ধান করবে, আর পদার্থবিদ্যা পদার্থ, শক্তি, গতি, বল ও প্রকৃতির মৌলিক নিয়মাবলি অনুধাবনের রাহা তৈরি করবে।
এভাবেই জ্ঞানের বহুবিধ শাখা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়ে তাওহিদের একক বিশ্বদৃষ্টির মধ্যে তাদের অর্থ ও অভিমুখ খুঁজে নেবে।
মানুষ যখন ধরে নেয় যে প্রকৃতির মূল্য শুধু তার ব্যবহারিক উপযোগেই সীমাবদ্ধ। তখন জ্ঞান ধীরে ধীরে মুনাফার ভাষায় কথা বলতে শুরু করে, আর নৈতিকতা অর্থনৈতিক হিসাবের বান্দি হয়ে যায়।
আধুনিক সভ্যতার জ্ঞানরীতি ভিন্ন একটি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে বিকশিত হয়েছে। এখানে প্রকৃতিকে অনেক ক্ষেত্রে রিসোর্স বা সম্পদ হিসেবে পাঠ করা হয়। এই পাঠের মধ্যেই একটি বিশেষ সম্পর্ক নিহিত রয়েছে।
সম্পদ এমন একটি ধারণা, যার মূল্য নির্ধারিত হয় তার ব্যবহারিক সক্ষমতা দ্বারা।
ফলে বন প্রথমে কাঠের সম্ভাবনা। নদী প্রথমে জলবিদ্যুৎ বা সেচের সম্ভাবনা। প্রাণী প্রথমে উৎপাদনব্যবস্থার অংশ। এমনকি মানুষও অনেক সময় শ্রমশক্তি, ভোক্তা কিংবা মানবসম্পদে পরিণত হয়। এই ভাষা প্রকৃতিকে তার নিজস্ব মর্যাদা থেকে জুদা করে উপযোগের কাঠামোর মধ্যে স্থাপন করে।
ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা এই আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির বৈজ্ঞানিক অর্জনকে এনকার করে না। প্রকৃতির নিয়ম আবিষ্কার, প্রযুক্তির উন্নয়ন, চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি কিংবা পরিবেশগত গবেষণা মানবজাতির গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।
কিন্তু সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন একটি পদ্ধতিগত সাফল্য অস্তিত্বগত দর্শনে পরিণত হয়। অর্থাৎ মানুষ যখন ধরে নেয় যে প্রকৃতির মূল্য শুধু তার ব্যবহারিক উপযোগেই সীমাবদ্ধ। তখন জ্ঞান ধীরে ধীরে মুনাফার ভাষায় কথা বলতে শুরু করে, আর নৈতিকতা অর্থনৈতিক হিসাবের বান্দি হয়ে যায়।
এই অবস্থায় সভ্যতা দক্ষ হতে পারে, কিন্তু প্রাজ্ঞ হতে পারে না।
এই দুই জ্ঞানদৃষ্টির পার্থক্য শুধু পরিভাষার ফারাক নয়; এটি মানুষের আত্মপরিচয়ের পার্থক্য। যদি প্রকৃতিকে শুধু সম্পদ হিসেবে দেখা হয়, তবে মানুষ নিজেকে মালিক হিসেবে ভাবতে পারে।
যদি প্রকৃতিকে আয়াত হিসেবে পাঠ করা হয়, তবে মানুষ নিজেকে পাঠক ও আমানতদার হিসেবে উপলব্ধি করে। যদি প্রকৃতি বাজারের উপকরণ হয়, তবে সম্পর্কের ভিত্তি হবে ভোগ। যদি প্রকৃতি আমানত হয়, তবে সম্পর্কের ভিত্তি হবে দায়িত্ব।
অতএব সভ্যতার আচরণ নির্ধারিত হয় সে প্রকৃতিকে কী নামে ডাকে, কীভাবে দেখে, তার দ্বারা।
ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা এই দুই চরমতার মধ্যেও কোনো আপসের দর্শন নির্মাণ করতে চায় না। আধুনিক প্রযুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করে সে অতীতে প্রত্যাবর্তনের আহ্বান জানায় না; আবার প্রযুক্তিগত আধিপত্যকেও মানবপ্রগতির চূড়ান্ত রূপ বলে মনে করে না।
বরং সে চায় একটি নতুন সভ্যতাগত জ্ঞানদৃষ্টি নির্মাণ করতে, যেখানে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান, নৈতিক দায়িত্ব এবং ওহিগত বিশ্বদৃষ্টি একটি সমন্বিত নেজামের মধ্যে অবস্থান করবে।
এই নতুন জ্ঞানদৃষ্টির কেন্দ্রে থাকবে ফিতরাত। কারণ, ফিতরাত এমন একটি নীতি, যা মানুষকে একই সঙ্গে প্রকৃতির অংশ এবং প্রকৃতির আমানতদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এখানে মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে একাত্মও নয়, আবার বিচ্ছিন্নও নয়।
রাষ্ট্র শুধু সম্পদ পরিচালনা করবে না; সে আমানতের হিফাজতও নিশ্চিত করবে। ফলে জ্ঞান সমাজের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে নতুন নৈতিক ভিত্তি নির্মাণ করবে।
সে প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল, কিন্তু তার নৈতিক দায়িত্বও বহন করে। এই অবস্থান মানুষকে ভোগের সংস্কৃতি থেকে হেফাজতের সংস্কৃতির দিকে নিয়ে যায়। ফলে জ্ঞানের উদ্দেশ্য স্থির হয়। সেটা সীমাহীন উৎপাদন নয়; বরং মীযান সংরক্ষণ।
এই সভ্যতাগত জ্ঞানতত্ত্বে শিক্ষার উদ্দেশ্যও নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হয়। শিক্ষা শুধু কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে না; মানুষের মধ্যে আয়াত-পাঠের ক্ষমতা সৃষ্টি করবে। বিজ্ঞান শুধু প্রযুক্তি উৎপাদন করবে না; সে বিস্ময়, বিনয় ও দায়িত্ববোধও জাগ্রত করবে।
অর্থনীতি শুধু প্রবৃদ্ধির হিসাব করবে না; সে ইনসাফ, বরকত ও টেকসই ভারসাম্যের ভাষাও শিখবে। রাষ্ট্র শুধু সম্পদ পরিচালনা করবে না; সে আমানতের হিফাজতও নিশ্চিত করবে। ফলে জ্ঞান সমাজের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে নতুন নৈতিক ভিত্তি নির্মাণ করবে।
এইভাবে ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা বিচ্ছিন্ন পরিবেশতত্ত্ব পার হয়ে নতুন সভ্যতাগত দৃষ্টির প্রস্তাব হাজির করে। এখানে কায়েনাত আবার আয়াতে পরিণত হয়, মানুষ আবার খলিফায় পরিণত হয়, জ্ঞান আবার হিকমাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করে এবং সভ্যতা আবার আধিপত্যের পরিবর্তে আমানতকে তার মৌলিক পরিচয় হিসেবে গ্রহণ করে।
কারণ, একটি সভ্যতার মহত্ত্ব তার নির্মিত নগরীতে নয়, তার নির্মিত জ্ঞানদৃষ্টিতে। যে সভ্যতা পৃথিবীকে আয়াত হিসেবে পড়তে শেখে, সে পৃথিবীর সঙ্গে ন্যায়ভিত্তিক সহাবস্থানের সংস্কৃতি নির্মাণের দিকে অগ্রসর হতে পারে। আর এই সহাবস্থানই ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার প্রস্তাবিত সভ্যতার ভিত্তি।
মুসা আল হাফিজ : লেখক, প্রাবন্ধিক ও গবেষক। ইসলামিক হিস্ট্রি অ্যান্ড কালচার অলিম্পিয়াড বাংলাদেশের চেয়ারম্যান