ইসলামের রক্ষণাবেক্ষণ, প্রচার ও প্রসারে সাহাবিদের ভূমিকা অপরিসীম। ইসলামের জন্য তাঁদের ত্যাগ, শ্রম ও আত্মোৎসর্গের বিনিময়ে পৃথিবীতে আজ দুই শ কোটিরও বেশি মুসলিমের বসবাস।
নবীজির প্রতি তাঁদের অকৃত্রিম ভালোবাসা ও পূর্ণ আনুগত্যের ফলে আল্লাহ–তাআলা তাঁদের বিশেষ মর্যাদায় ভূষিত করেছেন, দিয়েছেন জান্নাতের সুসংবাদ এবং ঘোষণা করেছেন তাঁদের ভুলত্রুটি ক্ষমার বার্তা। সেই সঙ্গে সব মুসলমানের জন্য তাঁদের জীবনকে আদর্শ বানিয়ে দিয়েছেন।
তাই সাহাবিদের আদর্শ জানা এবং তাঁদের প্রতি সুধারণা পোষণ করা প্রতিটি মুমিনের ইমানি দায়িত্ব।
ইবনে হাজার আসকালানি সাহাবিদের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন, সাহাবি হলেন সেই ব্যক্তি যিনি নবীজির প্রতি ইমানসহকারে তাঁর সাক্ষাৎ লাভ করেছেন এবং ইসলামের ওপরই মৃত্যুবরণ করেছেন। (আসকালানি, আল-ইসাবাহ ফি তামিইজিস সাহাবাহ, ১/৮, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, প্রথম সংস্করণ, ১৪১৫ হি.)
এই সংজ্ঞায় সাহাবি হওয়ার জন্য তিনটি শর্ত স্পষ্ট—১. নবীজির প্রতি ইমান, ২. ইমানদার অবস্থায় তাঁর প্রত্যক্ষ সাক্ষাৎ এবং ৩. ইসলামের ওপর মৃত্যু।
মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা ইমানে প্রথমে অগ্রগামী হয়েছে এবং যারা নিষ্ঠার সঙ্গে তাদের অনুসরণ করেছে, আল্লাহ তাদের সবার প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে।কোরআন, সুরা তাওবা, আয়াত: ১০০
সাহাবিদের পরস্পরের মধ্যে মর্যাদাগত স্তরভেদ থাকতে পারে, কিন্তু পরবর্তী যুগের কোনো মুসলমানই তাঁদের কারও সমকক্ষ হতে পারবেন না। সাধারণ মুসলমানদের থেকে সাহাবিদের মর্যাদা যে কত উঁচুতে, তার প্রমাণ মেলে বিদগ্ধ হাদিসবেত্তা আবদুল্লাহ ইবনে মোবারকের একটি বিখ্যাত ঘটনা থেকে।
একবার এক ব্যক্তি তাঁকে প্রশ্ন করেন, ওমর ইবনে আবদুল আজিজ ও মুয়াবিয়ার (রা.) মধ্যে কে বেশি উত্তম?
উমাইয়া খলিফা ওমর ইবনে আবদুল আজিজ তাঁর অতুলনীয় ন্যায়পরায়ণতার কারণে ‘পঞ্চম খলিফা’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন। অন্যদিকে, হযরত মুয়াবিয়া (রা.) ছিলেন একজন সাহাবি ও ওহি লেখক, তবে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণে কেউ কেউ তাঁর সমালোচনা করত।
প্রশ্নটি শুনে ইবনে মোবারক অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন এবং বলেন, ‘আল্লাহর কসম, নবীজির সঙ্গে জিহাদ করার সময় সাহাবি মুয়াবিয়ার নাকের ভেতরে যে ধুলোবালি প্রবেশ করেছিল, তাও ওমর ইবনে আবদুল আজিজ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ও উত্তম।’ (ইমাম আল-আজুররি, আশ-শারিয়াহ, ৫/২৪৬৬, দারুল ওয়াতন, রিয়াদ, ১৯৯৯)
সাহাবিদের ফজিলত বর্ণনা করে অনেকগুলো আয়াত নাজিল হয়েছে। আল্লাহ–তাআলা বিভিন্ন জায়গায় সব সাহাবির জান্নাতি হওয়া এবং জাহান্নাম থেকে দূরে থাকার ঘোষণা দিয়ে তাঁদের ওপর স্বীয় সন্তুষ্টির কথা বলেছেন।
বলা হয়েছে, ‘যারা নিজেদের জীবন ও সম্পদ ব্যয় করে জিহাদ করে আল্লাহ তাদের, যারা বসে থাকে তাদের ওপর মর্যাদায় শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। তবে আল্লাহ সকলকেই কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৯৫)
সুরা হাদিদের ১০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্যে যারা (মক্কা) বিজয়ের আগে ব্যয় করেছে ও যুদ্ধ করেছে তারা (পরবর্তীদের) সমান নয়। মর্যাদায় তারা সেই সকল লোক অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ, যারা পরে ব্যয় করেছে ও যুদ্ধ করেছে। তবে সবাইকে আল্লাহ উত্তম পরিণতির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।।’
সুরা তাওবার ১০০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা ইমানে প্রথমে অগ্রগামী হয়েছে এবং যারা নিষ্ঠার সঙ্গে তাদের অনুসরণ করেছে, আল্লাহ তাদের সবার প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে।’
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘জাহান্নামের আগুন সেই মুসলমানকে স্পর্শ করতে পারে না, যে আমাকে দেখেছে অর্থাৎ আমার সাহাবিরা কিংবা আমার সাহাবিদের যারা দেখেছে অর্থাৎ তাবেয়িরা।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৮৫৮
তিনি আরও বলেন, ‘আমার উম্মতের মধ্যে সর্বোত্তম তারা যারা আমার যুগে রয়েছে। অতঃপর তাদের পরবর্তী যুগের উম্মত (তাবেয়ি), অতঃপর তাদের পরবর্তী যুগের উম্মত (তাবে-তাবেয়ি)।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৬০)
আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা আমার সাহাবিদের সম্মান করো। কেননা তাঁরা তোমাদের মধ্যকার উত্তম মানব।’ (মিশকাতুল মাসাবিহ, হাদিস: ৬০১২)
আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘তারা যদি ইমান আনে তোমাদের ইমান আনার মতো, তবে তারা সুপথ পাবে। আর যদি মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তারাই হঠকারিতায় রয়েছে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৩৭)
উক্ত আয়াতে ‘তোমাদের ইমান আনার মতো’ কথাটি দিয়ে রাসুল (সা.) ও সাহাবিদের বোঝানো হয়েছে, অর্থাৎ আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য ইমান হলো সেটিই, যা নবীজি ও সাহাবিরা অবলম্বন করেছিলেন।
আল্লাহর কসম, নবীজির সঙ্গে জিহাদ করার সময় সাহাবি মুয়াবিয়ার নাকের ভেতরে যে ধুলোবালি প্রবেশ করেছিল, তাও ওমর ইবনে আবদুল আজিজ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ও উত্তম।আব্দুল্লাহ ইবনে মোবারক (রহ.)
নবীজি বলেছেন, ‘বনি ইসরাইল বাহাত্তরটি দলে বিভক্ত হয়েছিল, আর আমার উম্মত তেহাত্তরটি দলে বিভক্ত হবে। তাদের মধ্যে একটি দল ছাড়া বাকি সব দলই জাহান্নামে যাবে।’ সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, সেই মুক্তিপ্রাপ্ত দল কারা?’ তিনি বললেন, ‘আমি ও আমার সাহাবিরা যে নীতি ও আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত আছি (তা যারা ধরে রাখবে)।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৬৪১)
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা আমার পরে জীবিত থাকবে তারা প্রচুর মতানৈক্য দেখতে পাবে। তখন তোমাদের ওপর কর্তব্য হলো আমার এবং হেদায়াতপ্রাপ্ত ন্যায়পন্থী খলিফাদের পথকে শক্তভাবে আকড়ে ধরা।’ (মিশকাতুল মাসাবিহ, হাদিস: ১৬৫)
ইবনে কাসির বলেছেন, ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের মতে, সাহাবিরা সকলেই ন্যায়পরায়ণ ও বিশ্বস্ত। কারণ, আল্লাহ–তাআলা তাঁর সম্মানিত কিতাবে তাঁদের প্রশংসা করেছেন।’ (নাসির ইবনে আলী, আকিদাতু আহলুস সুন্নাহ ফিস সাহাবাহ, ২/৮১৩)
ইমাম ইবনে হুমামও তাঁর মুসায়েরা গ্রন্থে (পৃষ্ঠা ১৩২) লিখেছেন, সকল সাহাবিকে পবিত্র মনে করা এবং তাঁদের প্রশংসা করা ওয়াজিব। সাহাবিদের পারস্পরিক ‘ইজতিহাদি’ মতপার্থক্য সম্পর্কে নবীজি আগে থেকেই বলে গেছেন, ‘আমি আমার সাহাবিদের জন্য আমানতস্বরূপ। যখন আমি ইহকাল ত্যাগ করব তখন তাঁদেরকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তাঁদের মধ্যে ইজতিহাদি মতানৈক্য দেখা দেবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৩১)
সাহাবিদের সামান্যতম সমালোচনা বা নিন্দাবাদ করতেও নিষেধ করা হয়েছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা আমার সাহাবিদের গালমন্দ কোরো না। তোমাদের কেউ যদি ওহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণও আল্লাহর পথে ব্যয় করো, তবু তাদের এক মুদ (প্রায় তিন ছটাক) কিংবা অর্ধমুদ যব খরচের সমান সওয়াবের সমান হবে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৬৭৩)
তিনি আরও বলেন, ‘আমার সাহাবিদের ব্যাপারে তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। আমার পরবর্তীকালে তোমরা তাঁদের সমালোচনার নিশানায় পরিণত কোরো না। কারণ, যে তাঁদের ভালোবাসবে সে আমাকে ভালোবাসে বলেই তাঁদের ভালোবাসবে। আর যে তাঁদের অপছন্দ করবে সে আমাকে অপছন্দ করার ফলেই তাঁদের অপছন্দ করবে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৮৬২)
তিনি বলেছেন, ‘যখন আমার সাহাবিদের (বিবাদ) আলোচনা করা হয়, তখন তোমরা বিরত থাকো।’ (আল-তাবারানি, মুজামুল কাবির, হাদিস: ১০৭৪০)
এমনকি ‘যারা সাহাবিদের মন্দ বলে, তাদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ’ পতিত হয় বলেও হাদিসের বর্ণনায় রয়েছে। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৮৬৬)
সাহাবিদের প্রত্যেকেই পাপ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত বা নিষ্পাপ ছিলেন না; বরং সাধারণভাবে তাঁদের দ্বারাও ভুল হওয়া সম্ভব ছিল। তবে ইসলামে তাঁদের এমন সব কোরবানি ও অনন্য ফজিলত রয়েছে, যা তাঁদের অনিচ্ছাকৃত ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দেওয়ার বড় কারণ।
ইমাম আবু আমর ইবনুস সালাহ লিখেছেন, কোনো সাহাবির পবিত্রতা সম্পর্কে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। (উলুমুল হাদিস, পৃ. ২৯৪)। ইমাম আবু জুরআ কঠোর ভাষায় বলেছেন, যারা সাহাবিদের অবমাননা করে, তারা মূলত ‘ধর্মদ্রোহী; কারণ তারা সাহাবিদের বিতর্কিত করে কোরআন ও হাদিসের গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট করতে চায়। (খতিব বাগদাদি, আল-কিফায়াহ ফি ইলমির রিওয়াহ, পৃষ্ঠা: ৯৭)
ইমাম মালেক বলেছেন, ‘যারা সাহাবিদের ব্যাপারে কুৎসা রটনা করে, তারা মূলত রাসুলের বিরুদ্ধেও কুৎসা রটাতে চেয়েছিল, কিন্তু তা সম্ভব না হওয়ায় সাহাবিদের ব্যাপারে মিথ্যা রটিয়েছে।’ (ইবনে তাইমিয়া, আস-সারিমুল মাসলুল আলা শাতিমির রাসুল, পৃষ্ঠা: ৫৮০)
একই গ্রন্থে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বলের মন্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে যে যদি কাউকে কোনো সাহাবির সমালোচনা করতে দেখো, তবে তার ইসলামের ব্যাপারে সংশয় পোষণ করো। ইমাম আবু জাফর তহাবি লিখেছেন, সাহাবিদের ভালোবাসা হলো ইসলাম ও ইমান, আর তাঁদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা হলো কুফরি ও সীমালঙ্ঘন। (আকিদাতুত তহাবিয়া, পৃষ্ঠা: ৫০)
অনেকের প্রশ্ন, মানুষ হিসেবে সাহাবিদেরও তো ভুল হতে পারে, তাহলে আমরা তা বলতে পারব না কেন?
এর উত্তরে ইবনে তাইমিয়া লিখেছেন, সাহাবিদের মধ্যে পরস্পরে যেসব যুদ্ধবিগ্রহ বা মতবিরোধ ঘটেছিল, সে বিষয়ে ‘আহলে সুন্নাহ’ নীরবতা অবলম্বন করে। তাঁদের দোষত্রুটি নিয়ে যেসব বর্ণনা প্রচলিত আছে, তার কিছু অংশ সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং কিছু বিকৃত। আর যেসব বর্ণনা একেবারেই সত্য, সেগুলোর ব্যাপারে তাঁরা ক্ষমার যোগ্য। কারণ, তাঁরা ছিলেন মুজতাহিদ (গবেষক); সিদ্ধান্ত সঠিক হলে তাঁরা দ্বিগুণ সওয়াব পাবেন, আর ভুল হলেও একটি সওয়াব পাবেন এবং ভুলের জন্য ক্ষমা পাবেন।
সাহাবিদের প্রত্যেকেই পাপ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত বা নিষ্পাপ ছিলেন না; বরং সাধারণভাবে তাঁদের দ্বারাও ভুল হওয়া সম্ভব ছিল। তবে ইসলামে তাঁদের এমন সব কোরবানি ও অনন্য ফজিলত রয়েছে, যা তাঁদের অনিচ্ছাকৃত ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দেওয়ার বড় কারণ।
তাঁদের এমন পর্বতসম সৎ কাজ রয়েছে, যা সব পাপকে মিটিয়ে দেয় এবং যা পরবর্তী অন্য কারও পক্ষে অর্জন করা সম্ভব নয়। (ইবনে তাইমিয়া, আল-আকিদাতুল ওয়াসিতিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ১১৯-১২০)
মুহাম্মদ গোলাম কিবরিয়া: শিক্ষক, জামিয়া আল-ইহসান, ঢাকা