হজ একটি প্রেমময় ইবাদতের নাম। আল্লাহ ও বান্দার মাঝে স্থাপিত গভীর ভালোবাসার অনন্য বহিঃপ্রকাশ ঘটে হজের মাধ্যমে। শ্বেতশুভ্র ইহরামের কাপড়ে সজ্জিত হয়ে বান্দার জবানে উচ্চারিত হতে থাকে ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ ধ্বনি।
আল্লাহর প্রেমে মাতোয়ারা হয়ে মুমিন বান্দা ছুটে যায় হৃদয়শীতল করা কাবার পবিত্র চত্বরে। তাওয়াফ, সাঈ, জিকির ও দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সম্পর্ক গভীর থেকে গভীরতর হতে থাকে। এভাবে বান্দা তার জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য ‘তায়াল্লুক মাআল্লাহ’ তথা আল্লাহর সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কের অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত হয়।
হজ সামর্থ্যবান মুসলমানের ওপর অবশ্যপালনীয় একটি বিধান। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘মানুষের মাঝে যারা বাইতুল্লাহ শরিফে পৌঁছার সামর্থ্য রাখে তাদের ওপর আল্লাহর জন্য হজ করা ফরজ।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৯৭)
হজ ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, ইসলামের স্তম্ভ হচ্ছে পাঁচটি, ১. আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোনো উপাস্য নেই এবং নিশ্চয়ই মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল—এ কথার সাক্ষ্য প্রদান করা, ২. নামাজ পড়া, ৩. জাকাত আদায় করা, ৪. হজ সম্পাদন করা এবং ৫. রমজানের রোজা রাখা। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮)
হজ সামর্থ্যবান ব্যক্তির ওপর জীবনে একবার ফরজ হয়। মহানবী (সা.) আমাদের উদ্দেশে ভাষণ দিলেন এবং বললেন, ‘হে জনগণ, তোমাদের ওপর হজ ফরজ করা হয়েছে; অতএব তোমরা হজ করো’।
এক ব্যক্তি তা প্রতি বছর কি না জিজ্ঞেস করলে রাসুল (সা.) নীরব থাকলেন এবং পরে বললেন যে, তিনি ‘হ্যাঁ’ বললে তা প্রতি বছরের জন্য ওয়াজিব হয়ে যেত যা পালন করা মানুষের পক্ষে সম্ভব হতো না।
তিনি আরও বলেন, ‘আমি তোমাদের যখন কোনো কিছু করার নির্দেশ দেই—তোমরা তা যথাসাধ্য পালন করো এবং যখন কোনো কিছু করতে নিষেধ করি তখন তা পরিত্যাগ করো।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৩১৪৮)
তিনি হজ সম্পাদনকারী হাজি সাহেবদের জন্য অনন্য সব পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন:
হজ আল্লাহর ভালোবাসা ও নৈকট্য লাভের অন্যতম মাধ্যম। আল্লাহর রাসুলকে জিজ্ঞেস করা হলো, ‘কোন আমলটি উত্তম?’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা’। অতঃপর কোনটি—জিজ্ঞেস করা হলে তিনি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ এবং এরপর ‘মকবুল হজ’ সম্পাদনের কথা উল্লেখ করেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৬)
আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আল্লাহর রাসুল, জিহাদকে আমরা সর্বোত্তম আমল মনে করি; কাজেই আমরা কি জিহাদ করব না?’ রাসুল (সা.) বললেন, ‘না, বরং তোমাদের জন্য সর্বোত্তম জিহাদ হলো হজে মাবরুর।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৫২০)
যথার্থভাবে হজ আদায়ের মাধ্যমে হাজি সাহেব নবজাতক শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে যান। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি এ ঘরের হজ আদায় করল এবং (এ-সময়) স্ত্রীসঙ্গ গ্রহণ করল না এবং অন্যায় আচরণ করল না, সে প্রত্যাবর্তন করবে মাতৃগর্ভ হতে সদ্য প্রসূত শিশুর মতো হয়ে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৮১৯)
বারবার হজ ও ওমরাহ সম্পাদন দারিদ্র্য দূর করতে সহায়ক। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা বারবার হজ ও ওমরাহ আদায় করতে থাকো; কেননা তা অভাব ও পাপ এরূপ দূর করে দেয়, যেরূপ হাপর লোহা, সোনা ও রুপার ময়লা দূর করে থাকে।’ (সুনানে নাসায়য়ি, হাদিস: ২৬৩১)
হজে মাবরুর তথা যথার্থভাবে হজ সম্পাদন করার বিনিময় কেবলই জান্নাত। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘এক ওমরার পর আর এক ওমরাহ উভয়ের মধ্যবর্তী সময়ের (গুনাহের) জন্য কাফফারা; আর জান্নাতই হলো হজে মাবরুরের প্রতিদান।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৭৭৩)
প্রেমময় এই হজ মুমিনের আজন্ম লালিত স্বপ্ন। একজন মুমিন সারাজীবন পবিত্র কাবার সান্নিধ্য পাওয়ার স্বপ্ন লালন করে যায়। কালো গিলাফে ঢাকা পবিত্র কাবা দেখে তার হৃদয় শীতল হয়। প্রেমময় এই হজের সৌভাগ্য ও অনন্য সব পুরস্কার লাভে ধন্য হোক প্রতিটি মুমিন—এই কামনা রব্বুল আলামিনের দরবারে।
আবদুল্লাহ আলমামুন আশরাফী: মুহাদ্দিস, জামিয়া গাফুরিয়া মাখযানুল উলুম, গাজীপুর