নবুয়ত প্রাপ্তির মাত্র কয়েক বছর আগে মক্কার কাবা ঘর পুনর্নির্মাণ ও হাজরে আসওয়াদ স্থাপন নিয়ে যে সঙ্কট তৈরি হয়েছিল, তা ছিল মহানবীর নেতৃত্বের প্রতি আরবের সামগ্রিক স্বীকৃতির এক ঐতিহাসিক মহড়া। আজ সেই ঘটনাটি নতুন করে বলব।
তখন মহানবীর বয়স পঁয়ত্রিশের কোঠায়, আরো পাঁচ বছর পরে মুহাম্মদ (সা.) নবী হবেন। এ–সময় প্রবল বন্যায় পবিত্র কাবার দেয়াল ফেটে যায়। কোরাইশরা পবিত্র এই ঘরের মর্যাদার কথা মাথায় রেখে তা পুনর্নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়।
নির্মাণ কাজ শেষে যখন ‘হাজরে আসওয়াদ’ বা পবিত্র কালো পাথরটি তার নির্ধারিত স্থানে স্থাপনের সময় এলো, তখন শুরু হলো চরম দ্বন্দ্ব। প্রতিটি গোত্রই চাচ্ছিল এই বিরল সম্মানের অংশীদার হতে। দ্বন্দ্ব এমন পর্যায়ে পৌঁছাল যে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠল। বনু আবদুদ দার এবং বনু আদি গোত্র তো একটি পাত্রে রক্ত ভরে তাতে হাত ডুবিয়ে মৃত্যুর শপথ পর্যন্ত নিয়ে নিল।
কোরাইশরা মূর্তিপূজাকে কেন্দ্র করে ‘হুমস’ নামক এক বিশেষ প্রথা প্রবর্তন করেছিল, যা তাদের আরবের অন্য গোত্রগুলোর তুলনায় একচেটিয়া শ্রেষ্ঠত্ব ও অর্থনৈতিক সুবিধা দিত।
টানা চার-পাঁচ দিন এই উত্তেজনা চলার পর কুরাইশদের প্রবীণ ব্যক্তিত্ব আবু উমাইয়া ইবনে মুগিরা একটি সমাধান দিলেন। তিনি বললেন, “আগামীকাল ভোরে এই হারাম শরিফের দরজা দিয়ে যিনি প্রথম প্রবেশ করবেন, তাঁর ফয়সালাই আমরা মেনে নেব।”
পরদিন দেখা গেল, প্রথম প্রবেশকারী ব্যক্তিটি আর কেউ নন, স্বয়ং মুহাম্মদ (সা.)। তাঁকে দেখামাত্রই উপস্থিত কোরাইশ নেতারা সমস্বরে বলে উঠলেন, “এই তো সেই আল-আমিন (বিশ্বস্ত), আমরা তাঁর ওপর সন্তুষ্ট। এই তো মুহাম্মদ।” তাহজিব আস–সিরাত ইবনে হিশাম, পৃষ্ঠা: ৫৫)
আল্লাহর রাসুল তাঁর চাদরটি বিছিয়ে নিজ হাতে পাথরটি তার ওপর রাখলেন এবং প্রতিটি গোত্রপ্রধানকে চাদরের এক একটি কোণা ধরতে বললেন। এভাবে সবার অংশগ্রহণে পাথরটি যথাস্থানে স্থাপিত হলো। এই ঘটনাটি কেবল তাঁর উপস্থিত বুদ্ধির পরিচয় দেয় না, বরং এটি ছিল তাঁর সুমহান চরিত্রের প্রতি তৎকালীন আরবের এক অঘোষিত গণভোট।
প্রশ্ন জাগে, যে মানুষটির সততা ও বিচারে আরবের ঘোরতর শত্রুরাও নিঃসঙ্কোচে ‘রাজি’ হয়ে গিয়েছিল, সেই মানুষটিই যখন নবুওয়াতের ঘোষণা দিলেন, তখন তারা কেন তাঁকে ‘মিথ্যাবাদী’, ‘জাদুকর’ বা ‘গণক’ বলতে শুরু করল? এই রূপান্তর বুঝতে হলে তৎকালীন মক্কার ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কাঠামো বোঝা জরুরি।
হজরত ইব্রাহিম ও ইসমাইল (আ.)-এর রেখে যাওয়া তাওহিদের ধর্ম আরবে প্রচলিত থাকলেও আমর ইবনে লুহাই নামক এক নেতার হাত ধরে সেখানে মূর্তিপূজার অনুপ্রবেশ ঘটে।
এই মূর্তিপূজা কেবল ধর্মীয় বিশ্বাসের পরিবর্তন ছিল না, বরং এর পেছনে ছিল গভীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। কোরাইশরা মূর্তিপূজাকে কেন্দ্র করে ‘হুমস’ নামক এক বিশেষ প্রথা প্রবর্তন করেছিল, যা তাদের আরবের অন্য গোত্রগুলোর তুলনায় একচেটিয়া শ্রেষ্ঠত্ব ও অর্থনৈতিক সুবিধা দিত।
বলো, সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে; নিশ্চয় মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই বিষয়।সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ৮১
কোরাইশরা তাদের মূর্তিপূজা ও কা’বার সেবাকে এমনভাবে গেঁথে নিয়েছিল যে, তাদের এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে তাকে কা’বার পবিত্রতার অবমাননাকারী হিসেবে গণ্য করা হতো। ফলে পৌত্তলিকতা তখন আর কেবল ধর্ম ছিল না, বরং তা ছিল কোরাইশদের আভিজাত্য ও অর্থনীতির রক্ষাকবচ।
যখন ইসলাম এল, তখন তা কেবল মূর্তিপূজাকেই আঘাত করেনি, বরং কোরাইশদের সেই অন্যায্য আভিজাত্যের মূলে কুঠারাঘাত করল। পবিত্র কুরআনে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে, “বলো, সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে; নিশ্চয় মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই বিষয়।” (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ৮১)
আল্লাহর রাসুল যখন সাফা পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে কোরাইশদের ডাক দিলেন এবং তারা তাঁর সততার সাক্ষ্য দিল, তখনো তারা সত্যকে গ্রহণ করেনি কেবল আভিজাত্যের মোহে।
আবু জাহেল নিজেই তার এই হীনম্মন্যতার কথা স্বীকার করে বলেছিল, “বনু আবদে মানাফের সঙ্গে আমাদের চিরকাল সম্মানের লড়াই ছিল। তারা মানুষকে খাওয়াত, আমরাও খাওয়াতাাম। তারা দান করত, আমরাও করতাম। এখন তারা বলছে তাদের মধ্যে একজন নবী আছে যার কাছে আসমান থেকে ওহি আসে। এই সম্মান আমরা কীভাবে অর্জন করব? আল্লাহর কসম, আমরা কখনোই তাঁর ওপর ইমান আনব না।”
আরবরা অভ্যস্ত ছিল ভাগ্য গণনা বা কাহেনদের ওপর, যেখানে মানুষ নিচ থেকে ওপরের দিকে (ঈশ্বরের কাছে) যাওয়ার চেষ্টা করত। কিন্তু নবুয়ত ছিল এক স্বর্গীয় দান, যা ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত সত্যের আলোকবর্তিকা নিয়ে এসেছিল।
নবুয়তের দাবিতে আরবের প্রচলিত আধ্যাত্মিক ধারাটিও পাল্টে গিয়েছিল। আরবরা অভ্যস্ত ছিল ভাগ্য গণনা বা কাহেনদের ওপর, যেখানে মানুষ নিচ থেকে ওপরের দিকে (ঈশ্বরের কাছে) যাওয়ার চেষ্টা করত। কিন্তু নবুয়ত ছিল এক স্বর্গীয় দান, যা ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত সত্যের আলোকবর্তিকা নিয়ে এসেছিল।
কাবা পুনর্নির্মাণকালে সেই ‘আল-আমিন’কে দেখে কোরাইশদের সমবেত আনন্দধ্বনি প্রমাণ করে যে, সত্য তাদের সামনে দিবালোকের মতো স্পষ্ট ছিল। কিন্তু সত্য গ্রহণ করার জন্য যে বিনয় ও ত্যাগ প্রয়োজন, তা তাদের ছিল না।
কাবার সেই পাথর স্থাপন কেবল একটি স্থাপতত্যের কাজ ছিল না, বরং তা ছিল ইব্রাহিমি মিল্লাতের পুনর্জাগরণ। আল্লাহর রাসুলের নবুয়ত পূর্ব ৪ বছরের নিষ্কলঙ্ক জীবনই ছিল তাঁর নবী হওয়ার সবচেয়ে বড় দলিল।
হাদিস শরিফে এসেছে, “আমি তোমাদের নিকট একটি ভয়াবহ শাস্তি আসার পূর্বলক্ষণস্বরূপ সতর্ককারী।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৭৭০)
আজকের পৃথিবীতেও আমরা যখন সত্যকে জেনেও নিজেদের স্বার্থের কারণে তা প্রত্যাখ্যান করি, তখন আমরা সেই জাহেলি মনস্তত্ত্বেরই পরিচয় দিই।