ইসলামি ইতিহাসের সোনালি অধ্যায়গুলোর দিকে তাকালে আমরা এমন কিছু মহীয়সী নারীর দেখা পাই, যাঁদের জ্ঞানতৃষ্ণা, প্রজ্ঞা এবং আমল পরবর্তী প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ হয়ে আছে। তাঁদেরই একজন তাবেয়ি যুগের শ্রেষ্ঠ নারী ফকিহ ও মুহাদ্দিস হাফসা বিনতে সিরিন।
এই সময়ে, যখন ধর্মীয় জ্ঞান চর্চায় পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের অংশগ্রহণ নিয়ে অনেকের মনে অস্পষ্টতা কাজ করে, তখন হাফসা বিনতে সিরিনের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইসলামে জ্ঞান অর্জনের পথ নারী-পুরুষ সবার জন্যই সমানভাবে উন্মুক্ত।
হাফসা বিনতে সিরিন ৩১ হিজরিতে খলিফা ওসমান (রা.)-এর আমলে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা সিরিন ছিলেন বিশিষ্ট সাহাবি আনাস ইবনে মালিকের মুক্ত করে দেওয়া গোলাম। সিরিন মূলত ইরাকের মরু অঞ্চল থেকে যুদ্ধবন্দী হিসেবে এসেছিলেন
প্রথমে খালিদ বিন ওয়ালিদের মালিকানায় থাকলেও পরে আনাস ইবনে মালিক (রা.) তাঁকে কিনে নেন। পরবর্তীকালে সিরিন চুক্তির মাধ্যমে নিজের ও পরিবারের মুক্তি কিনে নেন। তবে আনাস ইবনে মালিকের সান্নিধ্যে থেকে এই পরিবারটি যে অমূল্য জ্ঞানতাত্ত্বিক সম্পদ অর্জন করেছিল, তা ছিল পার্থিব যে কোনো মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি। (ইবনে হিব্বান, কিতাবুত সিকাত, ৪/১৭১, দারুল কুতুবিল ইলমিয়াহ, বৈরুত, ১৯৭৩)
হাফসার মা সাফিয়া ছিলেন সেই সময়ের এক প্রখ্যাত নারী বিদুষী। তিনি আবু বকর (রা.)-এর মুক্তদাসী ছিলেন এবং আয়েশা (রা.)-এর নিকট থেকে সরাসরি ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করেছিলেন। সাফিয়া ও সিরিনের বিবাহ অনুষ্ঠানে বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ১৮ জন সাহাবি উপস্থিত ছিলেন, যা এই পরিবারের মর্যাদাকে ফুটিয়ে তোলে।
ইবনে কাসির তাঁর জানাজা সম্পর্কে বলেছেন যে, নবীজির (সা.) জানাজার পর ইতিহাসে আর কোনো জানাজায় এত বিপুল সংখ্যক প্রভাবশালী ও সম্মানী ব্যক্তির সমাগম দেখা যায়নি। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৯/২৪৫, দারুল হিজর, কায়রো, ১৯৯৮)
এমন এক জ্ঞানতপস্বী পরিবারে বেড়ে ওঠার কারণে শৈশব থেকেই হাফসা ইলমের সাগরে ডুব দেন। তিনি মাত্র ১০ বছর বয়সে পবিত্র কোরআন হিফজ সম্পন্ন করেন এবং ১২ বছর বয়সের মধ্যে কোরআনের সবকটি কিরাআত বা পঠনশৈলীতে পূর্ণ দক্ষতা অর্জন করেন। তাঁর ভাই মুহাম্মদ বিন সিরিন ছিলেন তাঁর সময়ের অন্যতম সেরা ইমাম।
হাফসার পাণ্ডিত্য এতটাই গভীর ছিল যে, মুহাম্মদ বিন সিরিন কোরআনের কোনো জটিল আয়াতের কিরাআত বা অর্থ বুঝতে সমস্যায় পড়লে বলতেন, “যাও, হাফসাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করো সে কীভাবে এটি পড়ে।” (ইবনুল কাইয়িম আল-জাওজিয়াহ, সিফাতুস সাফওয়াহ, ৪/ ২৪, দারুল হাদিস, কায়রো, ২০০০)
হাফসা বিনতে সিরিন শুধু কোরআন বিশেষজ্ঞই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একজন উঁচুদরের মুহাদ্দিস। তিনি আনাস ইবনে মালিকসহ অনেক সাহাবির কাছ থেকে সরাসরি হাদিস বর্ণনা করেছেন।
হাদিসের প্রধান ছয়টি কিতাবসহ সব বড় বড় হাদিস গ্রন্থে তাঁর বর্ণিত হাদিস স্থান পেয়েছে। মৃত ব্যক্তিকে গোসল দেওয়ার পদ্ধতি সম্পর্কে তাঁর বর্ণিত হাদিসটি অত্যন্ত প্রসিদ্ধ, যা তিনি উম্মে আতিয়া আল-আনসারিয়া (রা.) থেকে গ্রহণ করেছিলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১২৫৩)
বসরা নগরীতে তিনি নারী ও পুরুষ উভয়কেই শিক্ষাদান করতেন। প্রখ্যাত বিচারক ইয়াস বিন মুয়াবিয়া তাঁর সম্পর্কে বলেন, “আমি এমন কাউকে দেখিনি যাকে হাফসার ওপর প্রধান্য দেওয়া যায়।”
এমনকি যখন তাঁকে হাসান বসরি ও মুহাম্মদ ইবনে সিরিনের কথা জিজ্ঞেস করা হলো, তিনি তখনও বললেন, “ব্যক্তিগতভাবে আমি তাঁর (হাফসা) ওপরে কাউকে স্থান দেই না।” (আল-মিজ্জি, তাহজিবুল কামাল, ৩৫/১৫২, মুআসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ১৯৯২)
তৎকালীন সময়ে একদল আলেম যখন নারীদের ঈদের নামাজে অংশগ্রহণের বিষয়ে কঠোরতা অবলম্বন করতে শুরু করেন, তখন হাফসা বিনতে সিরিন সাহসিকতার সঙ্গে নিজের ইলম ও যুক্তি তুলে ধরেন।
তিনি উম্মে আতিয়ার সূত্রে একটি হাদিস বর্ণনা করেন যে, আল্লাহর রাসুল (সা.) ঋতুমতী নারী ও যুবতী পর্দানশীন মেয়েদেরও ইদের জামাতে উপস্থিত থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তারা কল্যাণ ও মুমিনদের দোয়ায় শরিক হতে পারে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩২৪)
হাফসা শুধু হাদিসটি বর্ণনা করেই ক্ষান্ত হননি, বরং নারীর ধর্মীয় ও সামাজিক অধিকারের পক্ষে অত্যন্ত জোরালো ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্কও করেছিলেন।
তাঁকে “ইসলামি ইতিহাসে সংযমী নারীদের পথপ্রদর্শক” বলা হয়। তিনি ছিলেন অত্যন্ত পরহেজগার ও ইবাদতগুজার। তাঁর বোন কারিমাহ বিনতে সিরিন সম্পর্কে বর্ণিত আছে, তিনি টানা ১৫ বছর জায়নামাজ থেকে ওঠেননি (প্রয়োজন ছাড়া)। হাফসা নিজেও সারারাত ইবাদতে কাটিয়ে দিতেন এবং দিনের বেলা রোজা রাখতেন।
মুহাম্মদ আকরাম নদভী তাঁর আল-মুহাদ্দিসাত গ্রন্থে লিখেছেন, “দাসী হিসেবে জন্ম নিলেও হাফসা বিনতে সিরিন তাঁর সামনে আসা সুযোগের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করেছিলেন এবং নিজের সময়ের শ্রেষ্ঠ আলেম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন।” (মুহাম্মদ আকরাম নদভী, আল-মুহাদ্দিসাত, পৃষ্ঠা: ৮৪, ইন্টারফেস পাবলিকেশন্স, লন্ডন, ২০০৭)