‘আপন ভাইয়ের সম্পদই তো, পরের তো নয়’—এই ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে অনেকেই নিজের ভাই কিংবা নিকটাত্মীয়ের মানিব্যাগ বা ড্রয়ার থেকে তাঁর অনুমতি ছাড়াই গোপনে টাকা নিয়ে নেন।
অনেকে নিজের অপরাধবোধ হালকা করেন এই ভেবে যে ‘আমি তো চুরি করছি না, শুধু ধার নিচ্ছি এবং হিসাব রাখছি, পরে সুবিধাজনক সময়ে পরিশোধ করে দেব।’
ইসলামের সুস্পষ্ট বিধান ও ইসলামি নীতিশাস্ত্রের মানদণ্ডে এই কাজটি কি আদৌ বৈধ? গোপনে নেওয়া এই টাকা কি চুরির পর্যায়ে পড়বে? ইসলামি ফিকহের আলোকে তা জানা জরুরি।
ইসলামের অন্যতম মৌলিক উদ্দেশ্য হলো মানুষের ধনসম্পদের সুরক্ষা। কোনো অবস্থাতেই অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করার অনুমতি দেওয়া হয়নি।
ইসলামের অন্যতম মৌলিক উদ্দেশ্য হলো মানুষের ধনসম্পদের সুরক্ষা (হিফজুল মাল)। কোনো অবস্থাতেই অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করার অনুমতি দেওয়া হয়নি।
কোরআনে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, “হে ইমানদারগণ, তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ কোরো না, তবে পারস্পরিক সন্তুষ্টির ভিত্তিতে ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্জিত হলে তা ভিন্ন।” (সুরা নিসা, আয়াত: ২৯)
বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে মুহাম্মদ (সা.) বলেছিলেন, “নিশ্চয়ই তোমাদের রক্ত, তোমাদের ধনসম্পদ এবং তোমাদের সম্মান পরস্পরের জন্য হারাম বা পবিত্র; যেমন আজকের এই দিন, এই পবিত্র মাস ও এই পুণ্যময় শহর হারাম বা সম্মানিত।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১২১৮)
অন্য হাদিসে নবীজি (সা.) বলেছেন, “কোনো মুসলিম ব্যক্তির সম্মতি ও সন্তুষ্টচিত্ত ছাড়া তার সম্পদ অপর কারো জন্য হালাল নয়।” (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২০৬৯৫)
অনেকে মনে করেন, গোপনে টাকা নিয়ে একটি ডায়েরি বা মোবাইলে হিসাব লিখে রাখলেই বুঝি তা চুরির অপরাধ থেকে মুক্ত হয়ে সাধারণ ‘ঋণ’-এ পরিণত হয়। এটি একটি আত্মপ্রবঞ্চনা ও অজ্ঞতাপ্রসূত ধারণা।
ইসলামি ফিকহের মূলনীতি হলো—কোনো লেনদেনকে ‘ঋণ’ (কর্জ) হতে হলে তাতে ঋণদাতার সুস্পষ্ট সম্মতি ও চুক্তি (ইজাব ও কবুল) থাকা অপরিহার্য। মালিকের অজান্তে ও ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো অর্থ নেওয়া হলে তা কখনোই ধার বা ঋণ হয় না; বরং তা হয় ‘অনধিকার আত্মসাৎ’ বা ‘জবরদখল’ (গসব)।
গোপনে হিসাব লিখে রাখা হয়তো ভবিষ্যতে হক আদায়ের ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে, কিন্তু গ্রহণের মুহূর্তে অনুমতিহীন এই কাজটি সম্পূর্ণ অবৈধ ও পাপের কাজ হিসেবেই গণ্য হবে।
হানাফি মাজহাবে এটি সাধারণ চুরির শাস্তির আওতায় না এলেও তা ‘খেয়ানত’ ও ‘গসব’, যার জন্য শাসকের পক্ষ থেকে প্রশাসনিক শাস্তি এবং পরকালে কঠোর জবাবদিহি অবধারিত।
ইসলামি আইনশাস্ত্রে সাধারণ চুরি এবং আত্মীয়ের ঘর থেকে গোপনে নেওয়ার মধ্যে ফিকহি পার্থক্য রয়েছে। ফৌজদারি আইনে চুরির সর্বোচ্চ শাস্তি (হাদ) কার্যকর করার জন্য ইসলামে সম্পদটি একটি সুরক্ষিত স্থানে থাকা এবং চোরের সেখানে প্রবেশের কোনো বৈধ অধিকার না থাকা শর্ত।
হানাফি মাজহাবে এটি সাধারণ চুরির শাস্তির আওতায় না এলেও তা ‘খেয়ানত’ (বিশ্বাসভঙ্গ) ও ‘গসব’, যার জন্য শাসকের পক্ষ থেকে প্রশাসনিক শাস্তি এবং পরকালে কঠোর জবাবদিহি অবধারিত। (ইবনে আবিদিন, রদ্দুল মুহতার, ৪/৯৪–৯৭, দারুল ফিকর, বৈরুত)
ইবনে কুদামাহ আল-মাকদিসি (রহ.) উল্লেখ করেছেন, পরিবার বা একান্নবর্তী ঘরে যেখানে ভাইদের অবাধ যাতায়াত থাকে, সেখানে সম্পদ একক কোনো সুরক্ষায়না থাকার কারণে চুরির দণ্ডবিধি (হাত কাটা) আরোপিত হবে না; কিন্তু এই কাজটি নিষিদ্ধ হওয়া ও পাপ হওয়ার বিষয়ে কোনো আলেম দ্বিমত করেননি। (ইবনে কুদামাহ, আল-মুগনি, ১২/৪৬৪–৪৬৮, দারু আলমিল কুতুব, রিয়াদ, ১৯৯৭ খ্রি.)
পারিবারিক পরিমণ্ডলে এই বিধানের একমাত্র ব্যতিক্রম ঘটে তখনই, যখন দুই ভাইয়ের সম্পর্ক এমন গভীর ও অকৃত্রিম হয় যেখানে পরস্পরের প্রতি ‘প্রচ্ছন্ন বা মৌন সম্মতি’ নিশ্চিত থাকে।
কোরআনে আত্মীয়দের ঘরে খাবার গ্রহণের ক্ষেত্রে এমন প্রথাগত ছাড়ের কথা বলা হয়েছে (সুরা নুর, আয়াত: ৬১)। ফিকহের সুপ্রসিদ্ধ মূলনীতি হলো, “সামাজিকভাবে স্বীকৃত প্রথা চুক্তির শর্তের সমতুল্য।” (ইমাম সুয়ূতি, আল-আশবাহ ওয়ান নাজায়ির, পৃষ্ঠা: ৯২, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ)
অতীতে যিনি এমন ভুল করেছেন, তাঁর জন্য শুধু মনে মনে ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলাই যথেষ্ট নয়। কারণ বান্দার হকের সঙ্গে সম্পর্কিত পাপ শুধু আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করলেই মাফ হয় না।
যদি কোনো ব্যক্তি নিশ্চিতভাবে জানে যে তার ভাই তার এই টাকা নেওয়ার কথা জানলে বিন্দুমাত্র মনক্ষুণ্ণ হবেন না, বরং আনন্দের সঙ্গে তাকে নিজের সম্পদ ব্যবহারের অনুমতি দিতেন—শুধু সেই ক্ষেত্রে অনুমতি ছাড়া নেওয়া জায়েজ হতে পারে এবং তা চুরির আওতায় পড়বে না।
কিন্তু যদি এমন হয় যে ভাই জানতে পারলে ক্ষুব্ধ হবেন, কষ্ট পাবেন কিংবা সম্পর্ক নষ্ট হবে—তবে এক পয়সা নেওয়াও সম্পূর্ণ হারাম এবং তা সুস্পষ্ট আত্মসাৎ হিসেবে সাব্যস্ত হবে।
অতীতে যিনি এমন ভুল করেছেন, তাঁর জন্য শুধু মনে মনে ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলাই যথেষ্ট নয়। কারণ বান্দার হকের সঙ্গে সম্পর্কিত পাপ শুধু আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করলেই মাফ হয় না।
করণীয় হলো, যত টাকা নেওয়া হয়েছে, তা হুবহু ভাইয়ের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। যদি সরাসরি বলতে লজ্জা বা পারিবারিক অশান্তির ভয় থাকে, তবে কোনো কৌশল অবলম্বন করে (যেমন: ভাইয়ের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা দিয়ে) সেই অর্থ তাঁর হাতে পৌঁছে দিতে হবে।
আর যদি ভাই উদার মনে সম্পূর্ণ ক্ষমা করে দেন, তবেই শুধু সেই দায় থেকে মুক্তি মিলবে।