মানুষের সামগ্রিক জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ কী? বাহ্যিক দৃষ্টিতে অনেকেই হয়তো অর্থবিত্ত, প্রভাব-প্রতিপত্তি, পদমর্যাদা কিংবা পার্থিব খ্যাতিকে বড় মনে করতে পারেন; কিন্তু বাস্তবতার বিচারে মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ ও অপূরণীয় সম্পদ হলো তার জীবন এবং জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত—তথা সময়।
হারানো ধনসম্পদ কঠোর পরিশ্রমে আবার ফিরিয়ে আনা সম্ভব, নষ্ট হওয়া স্বাস্থ্য চিকিৎসার মাধ্যমে পুনরুদ্ধার করা যায়; কিন্তু জীবন থেকে যে একটি মুহূর্ত একবার খসে পড়ে, পৃথিবীর সব ধনভান্ডার একত্র করলেও সেই মুহূর্তটিকে আর কখনো ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
ইসলামের মৌলিক দর্শনে জীবন নিছক ভোগবিলাস কিংবা বল্গাহীন বিচরণের জন্য পাওয়া কোনো অবকাশ নয়; এটি মহান রবের পক্ষ থেকে বান্দাকে দেওয়া এক পবিত্র ও সীমিত আমানত।
আল্লাহ–তাআলা মানুষকে পৃথিবীতে যে জীবন দান করেছেন, পরকালে তার প্রতিটি সেকেন্ড ও মিনিট সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ জবাবদিহি করতে হবে। তাই জীবনের কদর করার প্রকৃত অর্থ কেবল দীর্ঘায়ু কামনা করা নয়; বরং প্রাপ্ত প্রতিটি নিশ্বাস ও মুহূর্তকে অর্থবহ ও কল্যাণকর করে গড়ে তোলা।
কোরআন আমাদের শিক্ষা দিয়েছে যে জীবনের যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিজের খেয়ালখুশি কিংবা সাময়িক আবেগ নয়; বরং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নির্দেশকেই চূড়ান্ত অগ্রাধিকার দিতে হবে।
একজন মুমিনের সময় ও জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে নবীজির পবিত্র সুন্নাহর অনুসরণ অপরিহার্য। কোরআনুল কারিম আমাদের শিক্ষা দিয়েছে যে জীবনের যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিজের খেয়ালখুশি কিংবা সাময়িক আবেগ নয়; বরং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নির্দেশকেই চূড়ান্ত অগ্রাধিকার দিতে হবে।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সামনে অগ্রবর্তী হয়ো না এবং আল্লাহকে ভয় করো; নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। হে মুমিনগণ, তোমরা নবীর কণ্ঠস্বরের ওপর নিজেদের কণ্ঠস্বর উঁচু কোরো না এবং পরস্পরের সঙ্গে যেভাবে উচ্চ স্বরে কথা বলো, তাঁর সঙ্গে সেভাবে উচ্চ স্বরে কথা বোলো না; এতে তোমাদের সমস্ত আমল বিনষ্ট হয়ে যাবে অথচ তোমরা তা উপলব্ধিও করতে পারবে না।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১-২)
নবীজির জীবদ্দশায় সাহাবিরা এই আদব ও শিষ্টাচার রক্ষায় কতটা সজাগ ছিলেন, তার অনন্য দৃষ্টান্ত হলেন দ্বিতীয় খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)।
এই আয়াত নাজিল হওয়ার পর নবীজির সামনে তিনি এত নিচু ও অনুচ্চ কণ্ঠে কথা বলতেন যে নবীজিকে অনেক সময় কথা বুঝতে না পেরে আবার জিজ্ঞেস করতে হতো: ‘ওমর, তুমি কী বললে?’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৮৪৫)
এই ঘটনা আধুনিক মুমিনকে এক গভীর শিক্ষা দেয়—আমাদের প্রাত্যহিক চিন্তা, অভ্যাস, রুচি ও জীবনপদ্ধতি যেন কোনোভাবেই নববি শিক্ষার চেয়ে বড় হয়ে না দাঁড়ায়; বরং সুন্নতের সামনে নিজেদের বিনম্র সমর্পণ করাই জীবনের প্রকৃত সৌন্দর্য।
আজকের আধুনিক যুগে মানুষের সময় চুরির সবচেয়ে বড় ফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে অনিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তি ও সোশ্যাল মিডিয়ার মোহ। প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন নিজে কোনো ক্ষতিকর বিষয় নয়; ক্ষতিকর হলো এর লক্ষ্যহীন ও মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার।
মানুষ একটি প্রয়োজনীয় তথ্য অনুসন্ধান করতে বসে অবচেতনভাবেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা অ্যালগরিদমের ফাঁদে পড়ে অপ্রয়োজনীয় ভিডিও ও কনটেন্টের গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাচ্ছে।
একটি সংবাদ পড়তে গিয়ে স্ক্রল করতে করতে নষ্ট হচ্ছে সৃজনশীল চিন্তা; আর কোনো সাধারণ মন্তব্যের ঘরে জড়িয়ে পড়ছে অন্তহীন ও অপ্রয়োজনীয় বিতর্কে। এতে শুধু বহুমূল্য সময়ই নষ্ট হচ্ছে না, বরং অন্তরের প্রশান্তি ও মানসিক সুস্থতাও ধ্বংস হচ্ছে।
এই আত্মিক ও সামাজিক অপচয় থেকে বাঁচার জন্য রাসুল (সা.) এক চিরন্তন মূলনীতি দিয়ে গেছেন। তিনি বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তির ইসলামের অনন্য সৌন্দর্য হলো—সে এমন সমস্ত বিষয় সম্পূর্ণ বর্জন করে চলে, যা তার কোনো উপকারে আসে না (অর্থহীন ও অনর্থক)।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩১৭)
দুটি এমন নেয়ামত রয়েছে, যার ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষই প্রতারিত ও ক্ষতিগ্রস্ত—সুস্থতা ও অবসর।সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪১২
এই একটি হাদিস আধুনিক সময়ের প্রতিটি মানুষের জন্য আত্মপর্যালোচনার এক অনন্য মানদণ্ড। কোনো কাজে হাত দেওয়ার আগে নিজেকে প্রশ্ন করা প্রয়োজন—এই কাজের দ্বারা আমার ধর্ম, ইমান, স্বাস্থ্য, মানসিক বিকাশ, কর্মজীবন কিংবা সমাজের কোনো উপকার হচ্ছে কি না? উত্তর যদি ‘না’ হয়, তবে তাৎক্ষণিক সেখান থেকে সরে আসাই বুদ্ধিমত্তা ও ইমানের দাবি।
সুস্থতা, নিরাপত্তা, অবসর, পিতা-মাতা, পরিবার-পরিজন—এ সবই মহান আল্লাহর দেওয়া অমূল্য নিয়ামত। মানবপ্রকৃতির একটি বড় দুর্বলতা হলো, কোনো নিয়ামত যতক্ষণ হাতের নাগালে থাকে, মানুষ ততক্ষণ তার প্রকৃত মূল্য উপলব্ধি করতে পারে না; বরং তা হারিয়ে যাওয়ার পরই কেবল তার গুরুত্ব হাড়ে হাড়ে টের পায়।
সুস্থতার মূল্য কেবল একজন শয্যাশায়ী অসুস্থ মানুষ বোঝে; নিরাপত্তার গুরুত্ব বোঝে যুদ্ধ ও সংঘাতগ্রস্ত জনপদের আতঙ্কিত মানুষ; আর অবসর সময়ের সদ্ব্যবহারের মূল্য কেবল কাজের চাপে পিষ্ট একজন মানুষই অনুধাবন করতে পারে।
রাসুল (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘দুটি এমন নেয়ামত রয়েছে, যার ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষই প্রতারিত ও ক্ষতিগ্রস্ত—সুস্থতা এবং অবসর।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪১২)
এ কারণেই রাসুল (সা.) সব সময় আল্লাহর নেয়ামতের স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তার জন্য দোয়া করতেন, ‘হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি আপনার নেয়ামত বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া থেকে, আপনার দেওয়া সুস্থতা ও নিরাপত্তার পরিবর্তন ঘটে যাওয়া থেকে, আপনার আকস্মিক আজাব ও শাস্তি থেকে এবং আপনার যাবতীয় অসন্তুষ্টি থেকে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭৩৯)
সময় ব্যবস্থাপনার প্রায়োগিক রূপরেখা ও অগ্রাধিকার জীবনকে সুশৃঙ্খল ও উৎপাদনশীল করার অন্যতম কার্যকর কৌশল হলো সময়ের অগ্রাধিকারভিত্তিক বণ্টন।
একটি সুস্পষ্ট দৈনিক পরিকল্পনা না থাকলে কাজ জমতে থাকে, জরুরি কাজ অবহেলিত হয় এবং মনস্তাত্ত্বিক অস্থিরতা জন্ম নেয়। অথচ সামান্য সচেতনতা ও অগ্রাধিকার নির্ধারণ মানুষের জীবনকে দারুণভাবে গুছিয়ে দিতে পারে।
প্রতিদিনের রুটিনে যেসব কাজ আবশ্যিক, সেগুলোকে সবার আগে সুনির্দিষ্ট সময়ে স্থান দিতে হবে। জামাতে নামাজ আদায়, নিয়মিত কোরআন পাঠ ও জিকির, জীবিকার জন্য পেশাগত দায়িত্ব পালন, পরিবারকে কোয়ালিটি সময় দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর আহার ও পর্যাপ্ত বিশ্রাম—এসবের জন্য সুনির্দিষ্ট সময়সীমা থাকা উচিত।
প্রতিদিনের রুটিনের পাশাপাশি সাপ্তাহিক, মাসিক বা বার্ষিক কাজগুলোকে আলাদাভাবে বিন্যস্ত করতে হবে। যেমন সপ্তাহে এক দিন নিকটাত্মীয়দের খোঁজ নেওয়া, অসুস্থদের সেবা করা, প্রতি মাসের পারিবারিক বাজেট ও আয়-ব্যয়ের হিসাব চূড়ান্ত করা, নিয়মিত সদকা করা এবং ব্যক্তিগত জ্ঞান ও দক্ষতার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য বাস্তবায়নে সময় ব্যয় করা।
দায়িত্ব বণ্টন ও কার্যকর নেতৃত্ব সময় ব্যবস্থাপনার আরেকটি বড় মূলনীতি হলো—সব কাজ একা করার অসুস্থ প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসা। যে কাজ সহযোগীদের মাধ্যমে বা পরিবারের অন্য সদস্যদের দ্বারা সুচারুভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব, সেখানে উপযুক্ত ব্যক্তিদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
প্রকৃত নেতৃত্ব হলো নিজে সবকিছু কুক্ষিগত করে রাখা নয়; বরং সঠিক কাজের জন্য সঠিক মানুষকে নির্বাচন করে সম্মিলিতভাবে একটি কাজ সুন্দর ও সুচারুভাবে সফল করা।
সব কাজ নিজের কাঁধে চাপিয়ে রাখলে সময় যেমন নষ্ট হয়, তেমনি কাজের গুণগত মানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অপরপক্ষে দায়িত্ব বণ্টন করলে অন্যের ভেতরে আস্থা, আত্মবিশ্বাস ও কাজের দক্ষতা তৈরি হয়।
প্রকৃত নেতৃত্ব হলো নিজে সবকিছু কুক্ষিগত করে রাখা নয়; বরং সঠিক কাজের জন্য সঠিক মানুষকে নির্বাচন করে সম্মিলিতভাবে একটি কাজ সুন্দর ও সুচারুভাবে সফল করা।
জীবন মূলত সময়েরই এক খণ্ডিত সমষ্টি। প্রতিটি দিনের সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত আমাদের জীবনপুঁজি থেকে একটি করে দিন চিরতরে মাইনাস করে নিয়ে যাচ্ছে। তাই গভীর চিত্তে ভাবা প্রয়োজন—আমরা প্রতিদিন আমাদের এই মহার্ঘ সময় ব্যয় করে কী রেখে যাচ্ছি? কেবল কিছু সাময়িক বিনোদন, অহেতুক তর্ক আর ক্ষণিকের স্মৃতি?
নাকি জ্ঞানচর্চা, একনিষ্ঠ ইবাদত, সৃষ্টির সেবা ও মানবিক সম্পর্কের এমন এক স্থায়ী উত্তরাধিকার, যা দুনিয়ায় মানুষের কল্যাণে আসবে এবং আখেরাতে চিরস্থায়ী মুক্তির উপায় হবে?
মানুষের নিশ্বাস একসময় থেমে যাবে; কিন্তু তার রেখে যাওয়া কল্যাণমুখী কর্ম প্রজন্মের পর প্রজন্ম বেঁচে থাকে। তাই সময়কে নিছক বয়ে যেতে না দিয়ে সময়ের প্রতিটি কণাকে সঠিক অর্থে কাজে লাগানোই পরম প্রজ্ঞা। যে মানুষ সময়ের মূল্য বুঝতে শিখেছে, সে প্রকৃতপক্ষে নিজের অস্তিত্ব ও জীবনেরই যথার্থ মূল্যায়ন করতে শিখেছে।
আহমাদ সাব্বির : প্রাবন্ধিক ও গবেষক