সোনালি যুগে মুসলিম মনীষীদের জ্ঞানসাধনা

শারীরিক অক্ষমতা কিংবা জীবনের প্রতিকূলতা কি কেবলই বাধা? ইসলামের সোনালি যুগের মনীষীদের জীবন দেখলে মনে হয়—এগুলো কোনো বাধা নয়; বরং এই সীমাবদ্ধতাই অনেক সময় তাঁদের জন্য ‘শাপে বর’ বা পরম নিয়ামত হয়ে ধরা দিয়েছিল।

সাধারণ মানুষ যেসব প্রতিবন্ধকতায় থমকে দাঁড়ায়, সালাফরা তাকেই বানিয়েছিলেন কালজয়ী জ্ঞান-বিপ্লবের সোপান।

মাজদুদ্দিন ইবনুল আসির (রহ.)-এর কথাই ধরুন। পঙ্গুত্ব ও দীর্ঘ অসুস্থতা তাঁকে ঘরবন্দি করে তুলেছিল। আর এই নিভৃত সময়টুকুই তিনি ঢেলে দিয়েছিলেন জ্ঞানসাধনায়।

জাগতিক ব্যস্ততা থেকে দূরে সরে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন বলেই তিনি উপহার দিতে পেরেছিলেন হাদিস শাস্ত্রের আকরগ্রন্থ জামিউল উসুল এবং কালজয়ী অভিধান আন-নিহায়া

সুস্থ-সবল থাকলে হয়তো তিনি নানা কাজে ব্যস্ত থাকতেন, আর উম্মাহ বঞ্চিত হতো এই অমূল্য সম্পদ থেকে।

একইভাবে ইতিহাসের পাতায় জ্বলজ্বল করছে ইমাম সারাখসি (রহ.)-এর নাম। তাঁকে নিক্ষেপ করা হয়েছিল এক অন্ধকার কূপে। সঙ্গে ছিল না কোনো রেফারেন্স বই বা কাগজ-কলম। তবুও তিনি দমে যাননি।

ইমাম বুখারি (রহ.) ছাত্রজীবনে এতটাই অভাবী ছিলেন, গায়ে দেওয়ার মতো কাপড় না থাকায় ঘরের কোণে বসে থাকতেন। কোনো কোনো দিন লতাপাতা খেয়ে ক্ষুধা মেটাতেন।

সেই কূপে বসেই তিনি স্মৃতি থেকে একটানা বলে যেতেন, আর ওপর থেকে ছাত্ররা তা লিখে নিতেন। এভাবে রচিত হয়েছিল ফিকহ শাস্ত্রের সুবিশাল বিশ্বকোষ আল-মাবসুত-এর ১৫টি খণ্ড।

প্রতিটি খণ্ডের শেষে তিনি বড় আক্ষেপ আর তৃপ্তি নিয়ে লিখতেন—‘এই কথাগুলো সেই ব্যক্তি বলছেন, যিনি অন্ধকার কারাগারে বন্দি।’ কারাগারের দেয়াল তাঁর চিন্তার আকাশকে ছোট করতে পারেনি, বরং আরও অবারিত করেছিল।

জ্ঞানের এই তৃষ্ণা কোনো নির্দিষ্ট স্থানে বা পরিস্থিতিতে আটকে থাকেনি। ইবনুল কাইয়িম (রহ.) তাঁর অমর সৃষ্টি জাদুল মাআদ লিখেছিলেন উটের পিঠে সফররত অবস্থায়। সঙ্গে ছিল না কোনো সহায়ক গ্রন্থ; পুরোটাই ছিল তাঁর তুখোড় স্মৃতির ফসল।

আবার ইমাম কুরতুবি (রহ.)-এর কথা ভাবুন; তিনি সাগরের উত্তাল তরঙ্গে জাহাজে ভাসতে ভাসতে শেষ করেছিলেন সহিহ মুসলিমের সুবিশাল ব্যাখ্যাগ্রন্থ। এমনকি ইবনে তাইমিয়া (রহ.)-এর ফাতওয়া সংকলনের বড় একটি অংশ রচিত হয়েছে কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠে।

সেখানে যখন কাগজ-কলম কেড়ে নেওয়া হতো, তিনি তখন দেয়ালে কয়লা দিয়ে লিখে রাখতেন তাঁর চিন্তাগুলো।

দারিদ্র্য বা শারীরিক অক্ষমতা কখনোই তাঁদের পথ আগলাতে পারেনি। ইতিহাসের কত শত মুহাদ্দিস ও ফকিহ ছিলেন নিঃস্ব-রিক্ত! মাথার ওপর ছাদ ছিল না, প্রদীপে তেল কেনার টাকা ছিল না। তাঁরা চাঁদের আলোয় বই পড়তেন।

ইমাম বুখারি (রহ.) ছাত্রজীবনে এতটাই অভাবী ছিলেন, গায়ে দেওয়ার মতো কাপড় না থাকায় ঘরের কোণে বসে থাকতেন। কোনো কোনো দিন লতাপাতা খেয়ে ক্ষুধা মেটাতেন। অথচ এই মানুষটিই পরবর্তীকালে হয়ে উঠেছিলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ হাদিসবিশারদ।

ইমাম নববি (রহ.) তাঁর তারুণ্যে দিনে-রাতে বারোটি আলাদা বিষয়ে পাঠ নিতেন। ঘুমের ঘোরে যদি মূল্যবান সময়টুকু হারিয়ে যায়—এই ভয়ে তিনি বিছানায় পিঠ পর্যন্ত ঠেকাতেন না।

অন্ধত্বও তাঁদের কাছে ছিল তুচ্ছ। প্রখ্যাত কবি আবু আলা আল-মাআররি অন্ধ হওয়ার পর মুখে বলে অন্যদের দিয়ে তাঁর কালজয়ী সাহিত্য লেখাতেন। আধুনিক যুগে মিশরের পণ্ডিত তহা হুসাইনের শ্রেষ্ঠ রচনাগুলো রচিত হয়েছে তাঁর চোখের আলো চলে যাওয়ার পর। তিনি বিশ্বাস করতেন, চোখের দৃষ্টি কেড়ে নিয়ে আল্লাহ তাঁর অন্তর্দৃষ্টি খুলে দিয়েছেন।

ইতিহাস সাক্ষী, অনেক প্রতিভাধর মানুষ তখনই উজ্জ্বল হয়ে উঠেছেন, যখন তাঁদের জাগতিক সব অবলম্বন হারিয়ে গেছে। চাকরি চলে যাওয়া কিংবা বড় কোনো লোকসান তাঁদের ঠেলে দিয়েছে চিন্তা ও সৃজনের নতুন জগতে।

ইবনুল জাওজি (রহ.) তাঁর জীবনে এত বেশি লিখেছেন, তাঁর শেষ গোসলের পানি গরম করা হয়েছিল তাঁর ব্যবহৃত কলমের ছিলকা দিয়ে।

আমাদের পূর্বসূরিদের মধ্যে এমন মনীষীও ছিলেন, যিনি কারাগারের একাকীত্বকে উপভোগ করেছিলেন পুরো কোরআন হিফজ করে এবং চল্লিশ খণ্ডের এক বিশাল ফিকহ গ্রন্থ অধ্যয়ন করে।

তাঁদের কাছে সময় ছিল সোনার চেয়েও দামি। ইমাম নববি (রহ.) তাঁর তারুণ্যে দিনে-রাতে বারোটি আলাদা বিষয়ে পাঠ নিতেন। ঘুমের ঘোরে যদি মূল্যবান সময়টুকু হারিয়ে যায়—এই ভয়ে তিনি বিছানায় পিঠ পর্যন্ত ঠেকাতেন না।

সালাফদের এই জীবনকাব্য আমাদের কানে একটি মন্ত্রই জপে দিয়ে যায়—নিষ্ঠা থাকলে কোনো দেয়ালই জ্ঞানসাধনার পথ আটকাতে পারে না। আমাদের আসলে সুযোগের অভাব নেই, অভাব শুধু সদিচ্ছার। প্রতিকূলতার পাথুরে জমিন ফেঁড়েই জন্ম নেয় মহৎ কোনো সৃষ্টি।

মুজিব হাসান : আলেম ও গদ্যকার