ধর্ম-দর্শন

‘তাকওয়া’ কী এবং ‘মুত্তাকি’ অর্থ কী

মানুষের জীবনে পাপ-পুণ্য ও ভুল-শুদ্ধ এক অবিচ্ছেদ্য বাস্তবতা। কেউ সম্পূর্ণ নিষ্পাপ নয়, আবার কেউ শুধু পাপের মধ্যেই ডুবে থাকে না। অধিকাংশ মানুষের জীবনই এই দুটির মিশ্রণে গঠিত। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে কোরআন মাজিদ মানুষকে ‘তাকওয়া’ এবং ‘মুত্তাকি’ হওয়ার প্রকৃত অর্থ শিক্ষা দিয়েছে।

অনেকেই মনে করেন, মুত্তাকি মানেই এমন ব্যক্তি যার কখনো কোনো গুনাহ হয় না; অথচ কোরআনের শিক্ষা হলো, মুত্তাকি মানেই নিষ্পাপ মানুষ নয়, বরং সেই ব্যক্তি যার অন্তরে আল্লাহভীতি আছে এবং যে ভুল করলেও দ্রুত আল্লাহর দিকে ফিরে আসে।

তাকওয়ার প্রাথমিক স্তর হলো, গুনাহের পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে আল্লাহকে স্মরণ করে নিজেকে বিরত রাখা।

মুত্তাকির সচেতনতা

আল্লাহ-তাআলা মুত্তাকিদের মৌলিক বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে বলেছেন, যখন শয়তানের পক্ষ থেকে কোনো কুমন্ত্রণা বা প্ররোচনা মুত্তাকিদের স্পর্শ করে, তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে এবং সঙ্গে সঙ্গে তাদের চোখ খুলে যায়। (সুরা আরাফ, আয়াত: ২০১-২০২)

তারা বুঝতে পারে কোন পথ সঠিক এবং কোন পথ ভুল। অন্যদিকে যারা শয়তানের অনুসারী, তারা গোমরাহির পথেই আরও গভীরে ডুবে যেতে থাকে । (সুরা আরাফ, আয়াত: ২০২)

তাকওয়ার প্রাথমিক স্তর: গুনাহ থেকে আত্মরক্ষা

তাকওয়ার প্রাথমিক স্তর হলো, গুনাহের পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে আল্লাহকে স্মরণ করে নিজেকে বিরত রাখা। মানুষের জীবনে নানা প্রলোভন যেমন ক্রোধ, লোভ বা অহংকার তাকে গুনাহের দিকে টেনে নেয়। কিন্তু মুত্তাকি ব্যক্তি সেই মুহূর্তে আল্লাহকে স্মরণ করে মনে করেন যে একদিন তাকে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে। 

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি তার রবের সামনে উপস্থিত হওয়ার ভয় করে এবং নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে, জান্নাতই হবে তার ঠিকানা। (সুরা নাজিয়াত, আয়াত: ৪০-৪১)

কোনো বান্দা গুনাহ করার পর সুন্দরভাবে অজু করে দুই রাকাত নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন।
সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৪০৬

তাবেয়ি ইমাম মুজাহিদ (রহ.) এখানে “শয়তানের কুমন্ত্রণা” বলতে ক্রোধকেও বুঝিয়েছেন, কারণ রাগের মাথায় আল্লাহকে স্মরণ করে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করাই প্রকৃত তাকওয়া। (ইমাম তাবাবি, তাফসিরে তাবারি, ১০/৬৩৯, দারুল হিজর, কায়রো, ২০০১)

তাকওয়ার গভীর স্তর: তওবা ও অনুশোচনা

তাকওয়ার একটি গভীর স্তর হলো, ভুলবশত গুনাহ হয়ে যাওয়ার পর দ্রুত আল্লাহর দিকে ফিরে আসা। মুত্তাকির বৈশিষ্ট্য হলো, সে গুনাহ করে নির্বিকার থাকে না, বরং তার অন্তরে অনুশোচনা সৃষ্টি হয়।

আল্লাহ-তাআলা মুত্তাকিদের গুণ বর্ণনা করে বলেন, তারা যখন কোনো অশ্লীল কাজ করে ফেলে বা নিজেদের ওপর জুলুম করে, তখন আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজেদের গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে; তারা জেনেশুনে গুনাহের ওপর অটল থাকে না। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৩৫)

রাসুল (সা.) বলেছেন, কোনো বান্দা গুনাহ করার পর সুন্দরভাবে অজু করে দুই রাকাত নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৪০৬)

তওবার আনন্দ

আল্লাহর রহমতের ব্যাপ্তি বোঝাতে রাসুল (সা.) একটি উপমা দিয়ে বলেছেন, মরুভূমিতে খাবার ও পানীয়সহ হারিয়ে যাওয়া উট ফিরে পেয়ে একজন মানুষ যত আনন্দিত হয়, আল্লাহ তাঁর বান্দার তওবায় তার চেয়েও বেশি আনন্দিত হন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭৪৭)

এছাড়া আল্লাহ রাতে ও দিনে তাঁর রহমতের হাত প্রসারিত রাখেন যেন গুনাহগার বান্দারা তওবা করে ফিরে আসতে পারে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭৫৯)

আল্লাহর ক্ষমার ব্যাপ্তি প্রসঙ্গে হাদিসে কুদসিতে এসেছে, আল্লাহ বলেন, হে আদমসন্তান, তোমার গুনাহ যদি আকাশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তারপরও তুমি ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করলে আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেব। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৫৪০)

মুত্তাকি সেই ব্যক্তি, যে গুনাহকে হালকা মনে করে না, আবার গুনাহ হয়ে গেলে হতাশও হয় না। সে আল্লাহর ভয় ও রহমতের মাঝখানে ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপন করে।

তওবার শর্তাবলি

শুধু মুখে “আস্তাগফিরুল্লাহ” বলা তওবা নয়; আলেমগণ কোরআন-সুন্নাহর আলোকে তওবার তিনটি মূল স্তম্ভ উল্লেখ করেছেন:

১. গুনাহের জন্য আন্তরিক অনুতাপ।

২. সেই গুনাহ তৎক্ষণাৎ ত্যাগ করা এবং ভবিষ্যতে না করার দৃঢ় সংকল্প করা।

৩. যদি মানুষের হক নষ্ট হয়ে থাকে, তবে তা ফিরিয়ে দেওয়া বা ক্ষতিপূরণ করা।

নিরানব্বই জন মানুষকে হত্যা করার পর তওবাকারীর ক্ষমা পাওয়ার ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, মানুষের রহমতের চেয়ে আল্লাহর রহমত অনেক বড়।

সুতরাং মুত্তাকি সেই ব্যক্তি, যে গুনাহকে হালকা মনে করে না, আবার গুনাহ হয়ে গেলে হতাশও হয় না। সে আল্লাহর ভয় ও রহমতের মাঝখানে ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপন করে।

  • আহমাদ সাব্বির: আলেম ও লেখক