
জীবন ও জগতের প্রতিটি বাঁকে মানুষ রোগ-ব্যাধি, দুঃখ-কষ্ট বা নানাবিধ আধ্যাত্মিক সংকটের সম্মুখীন হয়। এই সংকট থেকে উত্তরণে ইসলাম কেবল পার্থিব চিকিৎসার ওপর গুরুত্ব দেয়নি; বরং আধ্যাত্মিক ও ঐশ্বরিক আরোগ্যের এক অনন্য পদ্ধতি শিখিয়েছে, যাকে বলা হয় ‘রুক্ইয়া’।
এটি মূলত মহান আল্লাহর কালাম এবং তাঁর শিখিয়ে দেওয়া দোয়ার মাধ্যমে আরোগ্য ও নিরাপত্তা লাভের এক বৈধ মাধ্যম। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ও গবেষক আলি সাল্লাবি লিখেছেন, রুক্ইয়া হলো মুমিনের জন্য এক শক্তিশালী ঢাল, যা তাঁকে জাদুটোনা, বদনজর এবং নানাবিধ শারীরিক ও মানসিক ব্যাধি থেকে সুরক্ষা দান করে। (আলি সাল্লাবি, আল-ইমান বিল্লাহ, ১/১৭২, মাকতাবাতুল আসরিয়্যাহ, বৈরুত, ২০১০)
আভিধানিক অর্থে ‘রুক্ইয়া’ শব্দের অর্থ হলো ঝাড়ফুঁক করা বা মন্ত্রপুত করা। পরিভাষায়, পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর ভাষ্য দ্বারা কোনো রোগের চিকিৎসা বা অমঙ্গল থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করাকেই রুক্ইয়া বলা হয়।
ইমাম ইবনুল আসিরের মতে, রুক্ইয়া হলো সেই আশ্রয় প্রার্থনা বা সুরক্ষা কবচ, যার মাধ্যমে জ্বরাক্রান্ত, মৃগীরোগী বা অন্যান্য বিপদগ্রস্ত মানুষের চিকিৎসা করা হয়। (ইবনুল আসির, আন-নিহায়াহ ফি গারিবিল হাদিস ওয়াল আসার, ২/২৫৪, দারুল কুতুবুল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ২০০৫)
রুক্ইয়ার মূল ভিত্তি হলো মহান আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও তাওয়াক্কুল। এটি কোনো জাদুকরি প্রক্রিয়া নয়; বরং এটি একটি ইবাদত। এর মাধ্যমে মুমিন স্বীকার করে যে আরোগ্য দানের একমাত্র মালিক আল্লাহ এবং কোরআন কেবল একটি কিতাব নয়; বরং এটি মানবজাতির জন্য ‘শিফা’ বা মহৌষধ। (সুরা ইসরা, আয়াত: ৮২)
পবিত্র কোরআনের প্রতিটি অক্ষরই বরকতময়, তবে আরোগ্যের নিয়তে কিছু সুরা ও আয়াতের বিশেষ ব্যবহারের কথা হাদিসে এসেছে। এগুলো রুক্ইয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
১. সুরা ফাতিহা ও ছোট তিন সুরা
সুরা ফাতিহাকে বলা হয় ‘সুরাতুশ শিফা’ বা আরোগ্যের সুরা। এ ছাড়া সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক ও সুরা নাস–এর গুরুত্ব অপরিসীম।
আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) যখন অসুস্থ বোধ করতেন, তখন তিনি নিজেই নিজের ওপর সুরা ফালাক ও নাস পাঠ করে ফুঁ দিতেন। যখন তাঁর অসুস্থতা তীব্র হতো, তখন আয়েশা (রা.) তা পাঠ করে তাঁর হাত বুলিয়ে দিতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০১৭)
২. সুরা বাকারার শেষাংশ ও আয়াতুল কুরসি
শয়তানের প্রভাব ও জাদুটোনা থেকে ঘরকে মুক্ত রাখতে সুরা বাকারার পাঠ অত্যন্ত কার্যকর। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের ঘরকে কবরস্থান বানিয়ো না; নিশ্চয়ই যে ঘরে সুরা বাকারা পাঠ করা হয়, সেখান থেকে শয়তান পালিয়ে যায়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৭৮০)
বিশেষ করে আয়াতুল কুরসি (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৫৫) শোয়ার সময় পাঠ করলে সারা রাত আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন রক্ষক নিয়োজিত থাকে। এ ছাড়া জাদুর প্রভাব কাটাতে সুরা বাকারার হারুত-মারুতসংক্রান্ত আয়াতগুলো পাঠ করা হয়। (সুরা বাকারা, আয়াত: ১০২)
৩. অন্যান্য আরোগ্যদায়ক আয়াত
সুরা ইউনুসে আল্লাহ বলেছেন যে, যদি তিনি কোনো ক্ষতির স্পর্শ দেন, তবে তিনি ছাড়া তা দূর করার আর কেউ নেই১ (সুরা ইউনুস, আয়াত: ১০৭)
সুরা বনি ইসরাইলে সত্যের জয় এবং মিথ্যার বিনাশের কথা বলা হয়েছে, যা রুক্ইয়ার সময় পাঠ করা অত্যন্ত ফলদায়ক। (সুরা ইসরা, আয়াত: ৮১)
এ ছাড়া সুরা আলে ইমরানের ২৬ ও ২৭ নম্বর আয়াতগুলো আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও রিজিকের ওপর বিশ্বাসের ভিত্তি মজবুত করতে পাঠ করা হয়।
ইসলামে ঝাড়ফুঁক বা রুক্ইয়া তখনই বৈধ হবে, যখন তা তিনটি শর্ত পূরণ করবে। আবদুল আজিজ ইবনে বাজ (রহ.) তাঁর ফতোয়ায় এগুলো স্পষ্ট করেছেন:
এটি আল্লাহর কালাম (কোরআন), তাঁর নাম বা তাঁর গুণাবলি দ্বারা হতে হবে।
এটি স্পষ্ট—আরবি ভাষায় বা এমন ভাষায় হতে হবে, যার অর্থ বোধগম্য।
এই বিশ্বাস রাখা যে, রুক্ইয়া নিজে থেকে আরোগ্য দিতে পারে না; বরং আল্লাহর ইচ্ছাতেই তা কাজ করে। (আবদুল আজিজ ইবনে বাজ, মাজমুউ ফাতাওয়া ওয়া মাকালাত, ৮/৩১৫, দারুল কুতুব, রিয়াদ, ১৯৯৯)
নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘ঝাড়ফুঁক করাতে কোনো দোষ নেই, যতক্ষণ না তার মধ্যে শিরকের কোনো গন্ধ থাকে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২২০০)
তাই কোনো দুর্বোধ্য মন্ত্র, নকশা বা শিরকি আলামতযুক্ত ঝাড়ফুঁক ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।