সিরাত

‘তারাও তোমাদের মতো মানুষ’

এক.

নবীজি মৃত্যুশয্যায়। বলতে গিয়েও থেমে থেমে আসছে তাঁর কথামালা—বাক্য পূর্ণতা পায় না! এর মধ্যে প্রবল শক্তি নিয়ে তিনি উচ্চারণ করে উঠলেন—‘আস-সলাত, আস-সলাত, ওয়া মা মালাকাত আইমানুকুম—‘নামাজ এবং তোমাদের মালিকানাধীন দাস-দাসী’।

জড়িয়ে আসে নবীজির জবান। শেষ সময়ে, যখন মৃত্যুযন্ত্রণায় কথা সরছে না তাঁর পবিত্র জবানে, তখন, সেই অন্তিম মুহূর্তে তিনি উচ্চারণ করে উঠলেন এক সতর্কবাণী—‘তোমরা নামাজ আদায়ে কোনো প্রকার অবহেলা করো না এবং সদাচার করো তোমাদের কর্তৃত্বাধীন দাস-দাসীর সঙ্গে। তাদের হক আদায়ে ত্রুটি রাখবে না সামান্য পরিমাণও।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৬২৫)

উম্মে সালামা উপস্থিত ছিলেন তখন নবীজির শিয়রে। তিনি জীবনভর নবীজির অন্য সকল উপদেশের মতো এই অন্তিম নির্দেশেরও বাস্তবায়ন করে দেখান সর্বাত্মকভাবে। দাসী-বাঁদির সঙ্গে তাঁর আচরণ প্রবাদে পরিণত হয়।

তাদের হক আদায়ের সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। অন্ন-বস্ত্র- বাসস্থান—একজন মানুষের মৌলিক অধিকার। উম্মে সালামা তাঁর দাসী-বাঁদির সকল মৌলিক অধিকার আদায়ে ছিলেন বিশেষ উদ্যোগী।

সমাজের অত্যধিক ভালো মানুষ হিসেবে যাদের আমরা জানি, তাদের পরিচারক-পরিচারিকারাও অন্যান্য অধিকার পেয়ে থাকলেও শিক্ষা-দীক্ষায় সাধারণত পিছিয়ে থাকে। কর্তাব্যক্তিরা সাধারণত তাদের শিক্ষার ক্ষেত্রে ততটা নজর দেবার প্রয়োজন বোধ করে না।

উম্মে সালামার বিশেষত্ব এখানেই। তিনি তাঁর প্রতিজন দাসী-বাঁদিকে কোরআন-সুন্নাহর দীক্ষায়ও দীক্ষিত করে তোলেন পূর্ণরূপে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতোই তাদের শিক্ষা আঞ্জাম দিতে থাকেন। ফলে তারা একেকজন হয়ে ওঠেন নববি ইলমের অন্যতম বাহক ও প্রচারক।

উম্মে সালামার বিশেষত্ব এখানেই। তিনি তাঁর প্রতিজন দাসী-বাঁদিকে কোরআন-সুন্নাহর দীক্ষায়ও দীক্ষিত করে তোলেন পূর্ণরূপে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতোই তাদের শিক্ষা আঞ্জাম দিতে থাকেন।

দুই.

উম্মে সালামা ছিলেন মদিনার ‘ফকিহা’, ইসলামি আইনে বিশেষজ্ঞ। হাদিসে নববির অন্যতম ধারক। নবীজির সান্নিধ্যে থেকে তাঁর কর্মপদ্ধতির, বিশেষতঃ দাম্পত্য ও নারীসংশ্লিষ্ট বিষয়াদির সরাসরি দ্রষ্টা উম্মে সালামার অনুরূপ দ্বিতীয়জন ছিলেন না। ফলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জিজ্ঞাসার জন্য তিনিই ছিলেন সকলের ভরসাস্থল।

লোকজন তাদের নানান রঙের জিজ্ঞাসার জাম্বিল নিয়ে হাজির হতেন তাঁর দুয়ারে। আর এটা তো স্বাভাবিক বোধগম্য বিষয় যে সবার জন্য, সব সময়ই সরাসরি তাঁর সামনে হাজির হওয়াটা সম্ভবপর ছিল না। যেখানে তিনি একজন সম্ভ্রান্ত নারী এবং নবীজির সহধর্মিণী, সেখানে পুরুষ-নারী নির্বিশেষ সবাই তাঁর সামনে হাজির হবে কোন উপায়ে!

উম্মে সালামার কাছে প্রশ্ন পাঠাবার জন্য তাঁর দাসী-বাঁদিরা ছিলেন অন্যতম মাধ্যম। বলা যায়, তারা অনেকটা উম্মে সালামার মুখপাত্র হিসেবে ভূমিকা পালন করতেন।

একদিনের কথা বলা যাক। আবদুর রহমান ইবনুল হারিস বিন হিশাম বলেন, ‘মারওয়ান ইবনুল হাকাম একবার তাকে উম্মে সালামার কাছে পাঠালেন। আবদুর রহমান বলেন, আমি গিয়ে সাক্ষাৎ করলাম উম্মে সালমার দাস নাফের সঙ্গে। তারপর তাকে পাঠালাম উম্মে সালামার কাছে। সে গিয়ে আমাদের জিজ্ঞাসা পৌঁছে দিলেন উম্মে সালামাকে।’

উম্মে সালামা রীতিমতো তাঁর দাসী-বাঁদিদের নিয়ে ইলমের দরস করতেন। তাঁর সূত্রে বর্ণিত তাঁর দাস আবদুল্লাহ ইবনে রাফের বর্ণনা থেকেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়।

তিনি বলেন, ‘উম্মে সালামা আমাদের জানিয়েছেন, আমি নবীজিকে বলতে শুনেছি, যখন নামাজের সময় হবে এবং খাবারও থাকবে প্রস্তুত, তখন তোমরা আগে আহার শেষ করে নেবে।’ (মুসনাদে আহমাদ,  ৬/৩১৩,২৯১,৩০৩)

এই হাদিসটিতে বর্ণনাকারী আবদুল্লাহর বর্ণিত ‘আমাদের’ শব্দটি লক্ষণীয়। শব্দটা প্রমাণ করে হাদিসটি উম্মে সালামার মুখে তিনি কেবল একলা শোনেননি, সেখানে তার সঙ্গে আরও মানুষ উপস্থিত ছিল।

আরো প্রতীয়মান হয়, উম্মে সালামা তাঁর কর্তৃত্বাধীন দাসী-বাঁদিদের নিয়ে দ্বীন শিক্ষার মজলিস করতেন। কোনোভাবেই তাদের তিনি শিক্ষা-দীক্ষা থেকে পিছিয়ে রাখতেন না; এমনকি তাদের জ্ঞান-গরিমায় যেন পূর্ণতা আসে, সেজন্যে নবীজির থেকে রপ্ত করা দোয়াবাক্যও তাদের শিখিয়ে দিতেন।

জীবন, জগৎ ও ইসলামের কত বিচিত্র শিক্ষা উম্মে সালমা তাদের দিয়েছিলেন। দাম্পত্য, পবিত্রতা, বিশেষ বিশেষ দোয়াবাক্য থেকে শুরু করে ধর্মের গভীরতর রহস্যের উন্মোচন করে দেখিয়েছেন তিনি তাঁর শিক্ষার্থীদের সামনে।

তাঁর এক দাস জানিয়েছেন, ‘উম্মে সালামা বলেছেন, ফজরের নামাজের সালাম ফিরিয়ে নবীজি এই দোয়াবাক্যটি উচ্চারণ করতেন।

দোয়া: আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা ইলমান নাফিয়া, ওয়া রিজকান তায়্যিবা, ওয়া আমালান মুতাকাব্বালাহ।

অর্থ: আল্লাহ, আপনার কাছে চাই উপকারী জ্ঞান, পবিত্রতম রিজিক এবং কবুলযোগ্য কর্মতৎপরতা৷ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৯২৫)

তিন.

উম্মে সালামার থেকে নবীজির হাদিস বর্ণনা করেছেন, তাঁর এমন সাতজন দাসী-বাঁদির নাম পাওয়া যায়— ১. আবদুল্লাহ বিন রাফে, ২. সাফিনাহ, ৩. সাবিত, ৪. সায়েব, ৫. নাফে, ৬. আবু কাসির, ৭. নায়িম।

এই সাতজন থেকে বর্ণিত হাদিসগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়— জীবন, জগৎ ও ইসলামের কত বিচিত্র শিক্ষা উম্মে সালমা তাদের দিয়েছিলেন। দাম্পত্য, পবিত্রতা, বিশেষ বিশেষ দোয়াবাক্য থেকে শুরু করে ধর্মের গভীরতর রহস্যের উন্মোচন করে দেখিয়েছেন তিনি তাঁর শিক্ষার্থীদের সামনে।

শিখিয়েছেন অজুর সময় দাড়ি খিলাল করার তরিকা, শিখিয়েছেন আয়-রোজগারে বরকত কামনা করবার পদ্ধতি, তাদের জানিয়েছেন, কারা এবং কেন রোজ হাশরে বিতাড়িত হবে নবীজির হাউজে কাউসার থেকে, রহমতের ফেরেশতা কাদের থেকে দূরে দূরে সরে থাকেন—এমন সব বিচিত্র ও তাৎপর্যপূর্ণ ধর্মীয় জ্ঞানে সমৃদ্ধ করে তুলেছিলেন উম্মে সালামা তাঁর প্রতিজন গোলাম ও বাঁদিকে।

গোলাম-বাঁদির হক আদায়ের যে দৃষ্টান্ত তিনি প্রতিষ্ঠা করে গেছেন, তাঁর জীবদ্দশায় পৃথিবীর শেষ দিন পর্যন্ত তা জ্বলজ্বলে উপাখ্যান হয়ে থাকবে দুনিয়ার ইতিহাসে।