পাথেয়

ইসলামে দাম্পত্য: ছোট ছোট বিষয়ের মধ্যেই শক্তি

যেকোনো সম্পর্কের, বিশেষ করে দাম্পত্য জীবনের মূল ভিত্তি কী—এই প্রশ্ন যখন উত্থাপিত হয়, তখন অধিকাংশ মানুষই হয়তো বড় ঘটনা বা নাটকীয় মুহূর্তগুলোর দিকে আঙুল তোলেন।

যেমন আবেগগত প্রতারণা, আর্থিক সংকট অথবা সন্তান পালনের মতো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জগুলোই যেন একটি সম্পর্ককে ভাঙার বা গড়ার ক্ষমতা রাখে।

তবে মনোবিজ্ঞানী হিসেবে এক দশকের বেশি সময়ের অভিজ্ঞতা ও অসংখ্য দম্পতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার পর একটি অন্তর্দৃষ্টি অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—বিয়েকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয় মূলত দৈনন্দিন জীবনের সূক্ষ্ম হতাশা, উপেক্ষা ও ছোট ছোট মনস্তাত্ত্বিক আঘাতের নীরব সঞ্চয়।

ক্ষুদ্র উপেক্ষার ফল

দাম্পত্যে এমন কিছু ক্ষুদ্র জ্বালাতন আছে, যা আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ মনে হতে পারে, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা ভালোবাসার মূল কাঠামোতে ফাটল ধরায়। যেমন:

  • সঙ্গীর কোনো মন্তব্যকে উড়িয়ে দেওয়া।

  • চিন্তা বা উদ্বেগের জবাবে ব্যঙ্গাত্মক উত্তর দেওয়া।

  • খাওয়ার সময় বা একান্ত আলাপের মুহূর্তে ক্রমাগত ফোন দেখা।

দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততা, সময়সীমা ও আধ্যাত্মিক আকাঙ্ক্ষার ভিড়ে আমরা প্রায়ই ঘনিষ্ঠতার এই ছোট প্রবেশদ্বারগুলো মিস করে যাই। অথচ এগুলোই সেই দরজা, যেখান দিয়ে ভালোবাসা নীরবে প্রবেশ করে অথবা নিঃশব্দে ফুরিয়ে যায়।

এগুলো এককভাবে ক্ষতিকর না–ও হতে পারে, কিন্তু দাম্পত্য সম্পর্কের পবিত্র বন্ধনে এগুলো অদৃশ্য ক্ষত সৃষ্টি করে। আবেগের এ ছোট ছোট সংযোগহীনতার মুহূর্তগুলো একটি অদৃশ্য হিসাবের খাতায় জমা হতে থাকে, যা একপ্রকার মানসিক ক্ষয় সৃষ্টি করে। এর পরিণতিতে একসময় স্বামী-স্ত্রী একই ছাদের নিচে থেকেও একে অপরের কাছে অপরিচিত হয়ে ওঠেন।

গবেষণা অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি তাঁর সঙ্গীর দ্বারা দেখা, বোঝা ও মূল্যবান বোধ করার অনুভূতির সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের সন্তুষ্টি গভীরভাবে জড়িত। (জার্নাল অব পারসোনালিটি অ্যান্ড সোশ্যাল সাইকোলজি, ৬৬/২০৩-২১৭, আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন, ওয়াশিংটন ডিসি, ১৯৯৪)

দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততা, সময়সীমা ও আধ্যাত্মিক আকাঙ্ক্ষার ভিড়ে আমরা প্রায়ই ঘনিষ্ঠতার এই ছোট প্রবেশদ্বারগুলো মিস করে যাই। অথচ এগুলোই সেই দরজা, যেখান দিয়ে ভালোবাসা নীরবে প্রবেশ করে অথবা নিঃশব্দে ফুরিয়ে যায়।

কোরআনও আমাদের এ বিষয়ে নির্দেশনা দেয়, ‘আর তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবন যাপন করো।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১৯)

এটি কোনো নিষ্ক্রিয় পরামর্শ নয়; বরং বিয়ের মধ্যে দয়া, সম্মান ও আবেগগত নিরাপত্তার একটি পরিবেশ তৈরি করার জন্য এটি একটি সক্রিয়, আধ্যাত্মিক আহ্বান।

সংযোগের ভাষায় ক্ষুদ্রতম সংকেত

ছোট ছোট বিষয় সম্পর্ক ভাঙতে পারে, ছোট ছোট কাজই সম্পর্ক গড়তেও পারে। সম্পর্ককে যা সুস্থ ও শক্তিশালী করে তোলে, তা হলো মাইক্রো–বিড—যোগাযোগ স্থাপনের জন্য দৈনন্দিন জীবনে করা ছোট ছোট অভিব্যক্তি বা আচরণ।

আপনার সঙ্গী হয়তো বললেন, ‘এই ভিডিওটি দেখো’ অথবা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘বাজারের ব্যাগটা তুলতে সাহায্য করবে?’ এগুলো খুব সাধারণ মনে হতে পারে, কিন্তু বাস্তবে এগুলো হলো দেখা, শোনা, সমর্থন পাওয়া ও ধরে রাখার আহ্বান জানানোর ক্ষুদ্র মুহূর্ত।

এটি মহানবী (সা.)-এর একটি গভীর হাদিসকে স্মরণ করিয়ে দেয়, ‘যদি কেয়ামত সংঘটিত হওয়ার সময়ও তোমাদের কারও হাতে একটি চারাগাছ থাকে, তবে সে যেন তা রোপণ করে দেয়।’ (আল-আদাব আল-মুফরাদ, হাদিস: ৪৭৯)

চূড়ান্ত পরিসমাপ্তির মুখেও নবীজি আমাদের কাজ করতে, ভালো কিছু করতে এবং আশাবাদী হতে শিখিয়েছেন। সম্পর্কের ক্ষেত্রে এর মানে হলো পরিস্থিতি যখন হতাশাজনক বা দূরত্বপূর্ণ মনে হয়, তখনো উপস্থিত থাকা।

সম্পর্কের একটি বীজ রোপণ করা হতে পারে চোখের দিকে তাকানোর মতো সহজ, মনোযোগ দিয়ে শোনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো সাধারণ, অথবা কেবল আলতো স্পর্শের মতো হালকা।

ভালোবাসার এ ক্ষুদ্র কাজগুলোই হলো ‘বিড’। যখন সদিচ্ছার সঙ্গে করা হয়, তখন এগুলো এমন মাটিতে পরিণত হয়, যেখানে আস্থা পুনর্নির্মিত হয়, আবেগগত নিরাপত্তা পুনরুদ্ধার হয় এবং সংযোগের ফুল ফুটতে শুরু করে।

যখন একজন সঙ্গী একটি বিড করেন, তখন অন্য সঙ্গীর কাছে একটি ক্ষুদ্র সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ আসে—আমি কি তাদের দিকে ফিরব, নাকি মুখ ফিরিয়ে নেব? আমি কি এই মুহূর্তকে সংযোগের সুযোগ হিসেবে স্বীকার করব, নাকি অলক্ষিতভাবে এটিকে চলে যেতে দেব?

এটি হতে পারে:

  • রোববার বিকেলে দুটি কফি এনে দেওয়া।

  • ‘কী করছ?’ জিজ্ঞাসা না করেই আলতো করে কাঁধে হাত রাখা।

  • একটি ‘মিম’ পাঠিয়ে বলা, ‘এটা আমাদের প্রথম দিকের বাবা-মায়ের দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দিল।’

  • সঙ্গী যখন কথা বলছেন, তখন ফোন স্ক্রল করা থামিয়ে মনোযোগ দিয়ে শোনা।

  • বাড়তি কিছু না বলে সঙ্গীর জন্য শেষ টুকরা ডেজার্টটি রেখে দেওয়া।

একে অপরের হৃদয়ে সামান্য যত্ন যোগ করার চেষ্টা করা দুটি মানুষের সম্পর্কের পবিত্র স্থানে এগুলো পবিত্র মুদ্রায় পরিণত হয়। এগুলো জমতে থাকে। এগুলো কঠিন দিনগুলোকে কোমল করে তোলে এবং সাধারণ দিনগুলোকে মিষ্টি করে।

এই মাইক্রো-বিডগুলো হলো সেই নীরব, দৈনন্দিন অঙ্গভঙ্গি যা বলে, ‘আমি তোমাকে দেখছি। আমি তোমাকে মূল্য দিচ্ছি। আমি তোমাকে নিয়ে ভাবছি।’ এগুলো কোনো বড় বা নাটকীয় পদক্ষেপ নয়। প্রকৃতপক্ষে বাইরের দুনিয়ার কাছে এগুলো প্রায়ই অলক্ষিত থেকে যায়।

কিন্তু একে অপরের হৃদয়ে সামান্য যত্ন যোগ করার চেষ্টা করা দুটি মানুষের সম্পর্কের পবিত্র স্থানে এগুলো পবিত্র মুদ্রায় পরিণত হয়। এগুলো জমতে থাকে। এগুলো কঠিন দিনগুলোকে কোমল করে তোলে এবং সাধারণ দিনগুলোকে মিষ্টি করে।

এই ছোট ছোট মুহূর্ত সম্পর্কের দীর্ঘ ইতিহাসে শুধু শূন্যস্থান পূরণকারী নয়; বরং সম্পর্কের মূল কাঠামো। এগুলো হলো সেই কোমল তুলির আঁচড়, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আবেগগত সংযোগ, নিরাপত্তা ও দীর্ঘস্থায়ী ভালোবাসার চিত্রকর্ম আঁকে।

যখন ধারাবাহিকতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে এ কাজগুলো করা হয়, তখন এগুলো ইবাদতের (আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কর্ম) অংশ হয়ে ওঠে। ইসলামে ধারাবাহিক ও উদ্দেশ্যমূলক এই দয়ার ধারণাকে সুন্দরভাবে ধরে রাখা হয়েছে।

নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় আমল হচ্ছে যা নিয়মিতভাবে করা হয়, যদিও তা অল্প হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬,৪৬৪)

এটি ঐশ্বরিক প্রজ্ঞাকে প্রতিফলিত করে যে ভালোবাসাকে টিকিয়ে রাখে বড় রোমান্টিক অঙ্গভঙ্গি নয়; বরং একে অপরের হৃদয়ের প্রতি যত্ন নেওয়ার দৈনিক, অবিচলিত কাজ।

সম্পর্ক পুষ্টির আচার

মাইক্রো-বিড যদি দৈনন্দিন সংযোগের বীজ হয়, তবে দাম্পত্য আচার বা রিচুয়াল হলো সেই মাটি, যেখানে এই বীজগুলো জন্মায়। এই আচারগুলো প্রায়ই সাধারণ ও দৈনন্দিন জীবনের বুননের সঙ্গে বোনা, ভালোবাসাকে দৃশ্যমান, নির্ভরযোগ্য ও ছন্দময় হতে সাহায্য করে। অনেক দম্পতির জন্য উপস্থিতির এই ক্ষুদ্র ডোজগুলো যুগান্তকারী হয়ে ওঠে।

এটি হতে পারে:

  • নিস্তব্ধতার মধ্যে একসঙ্গে সকালের চা পান করা।

  • এশার নামাজের পর কিছু সময় হাঁটা।

  • ঘুমানোর আগে পরস্পরের খোঁজ নেওয়া, যেখানে আন্তরিকভাবে জিজ্ঞাসা করা হয়, ‘তুমি সত্যি কেমন আছ?’

তবে মনে রাখতে হবে, আচারগুলো যেন পুষ্টি জোগায়, বোঝা না হয়। সব দম্পতির জন্য একই ধরনের আচার একই ফল দেয় না। কিছু দম্পতি ৭-৭-৭ নিয়ম (প্রতি ৭ দিনে কিছু ঘণ্টা, প্রতি ৭ সপ্তাহে এক দিন এবং প্রতি ৭ মাসে কয়েক দিনের জন্য একসঙ্গে সময় কাটানো) এর মতো কাঠামোবদ্ধ ফরম্যাট পছন্দ করেন।

এই কাঠামো তাঁদের আবেগের জগতে স্পষ্টতা ও ছন্দ এনে দেয়। কিন্তু অন্যদের জন্য, বিশেষ করে মানসিক চাপ বা দূরত্বের সময় এই আচারগুলো দায়িত্বে পরিণত হতে পারে।

গুরুত্বপূর্ণ হলো এই কথা মনে রাখা যে আচারগুলোর উদ্দেশ্য হলো পুষ্টি জোগানো, ভার দেওয়া নয়। এবং ভিন্ন ভিন্ন দম্পতির ক্ষেত্রে এগুলো ভিন্ন হতে পারে। আসল উদ্দেশ্য পাওয়া যায় নমনীয়তার মধ্যে, নিখুঁতভাবে করার মধ্যে নয়। আন্তরিকভাবে ১০ মিনিটের একটি খোঁজখবর নেওয়া কখনো কখনো একটি বিশাল উইকেন্ড গেটওয়ের চেয়ে বেশি কাজ দিতে পারে।

আসল প্রশ্নটি এই নয় যে ‘আমরা কি এখনো একে অপরের জন্য ঠিক আছি?’ বরং প্রশ্নটি হলো ‘আমরা কি এখনো একে অপরকে বেছে নিচ্ছি?’

বারবার একে অপরকে বেছে নেওয়া

যদি আমরা ইসলামিক ও আধ্যাত্মিক প্রজ্ঞা দিয়ে আমাদের নিজস্ব একটি ‘লাভ ল্যাব’ তৈরি করি, তবে আমরা সম্ভবত আবিষ্কার করব যে সফল বিবাহগুলো দ্বন্দ্ব বা কষ্ট থেকে মুক্ত নয়; বরং এগুলো এমন দম্পতিদের দ্বারা নির্মিত, যাঁরা দৈনন্দিন জীবনের ছোট, অদৃশ্য মুহূর্তগুলোতে বারবার একে অপরের জন্য উপস্থিত থাকার সিদ্ধান্ত নেন। আল্লাহর রহমতই এগুলো ধরে রাখে, মোটেও আমাদের নিখুঁত আচরণ নয়।

দম্পতিরা একে অপরের সঙ্গে নয়; বরং শয়তানের ফিসফিসানির সঙ্গে যুদ্ধ করে। মহানবী (সা.) শিখিয়েছেন যে শয়তান তার সিংহাসন পানির ওপর স্থাপন করে এবং তার সেনাদের পাঠায় মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির জন্য। আর সে তাকেই সবচেয়ে বেশি সম্মানিত করে, যে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটায়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২,৮১৩)

এ ঘটনা আমাদের একটি গভীর বার্তা দেয়—সমাজের ক্ষুদ্রতম একক, অর্থাৎ দাম্পত্য বন্ধন এতটাই শক্তিশালী যে আমাদের প্রধান শত্রুও এটিকে বিশেষ মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করে। অতএব প্রতিটি দয়ালু দৃষ্টি, ক্ষুদ্র হতাশার মুহূর্তে প্রতিটি ধৈর্যশীল কাজ, প্রতিটি মাইক্রো-বিড এবং প্রতিটি স্বাস্থ্যকর মাইক্রো রিচুয়ালে ইতিবাচক সাড়া দেওয়া—এগুলো কেবল রোমান্টিক কাজ নয়; বরং আধ্যাত্মিক প্রতিরোধের কাজ।

সুতরাং সম্ভবত আসল প্রশ্নটি এই নয় যে ‘আমরা কি এখনো একে অপরের জন্য ঠিক আছি?’ বরং প্রশ্নটি হলো ‘আমরা কি এখনো একে অপরকে বেছে নিচ্ছি?’ এমন এক পৃথিবীতে যা প্রায়ই নাটকীয় অঙ্গভঙ্গি এবং তাৎক্ষণিক তৃপ্তিকে প্রশংসা করে, সেখানেই এই নীরব, ধারাবাহিক পছন্দগুলো, যা কেউ দেখে না—তাঁরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষমতা ধারণ করে।

শোনা, ক্ষমা করা, চুপচাপ কাছে বসা—এসবই বেছে নেওয়ার আলামত। ফাটলের পরে পুনর্নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া। ভালোবাসাকে আতশবাজির মতো নয়; বরং বাগানের মতো যত্ন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া। কারণ, ভালোবাসা এমন কিছু নয়, যার মধ্যে আমরা কেবল এক বার পড়ি। এটি এমন কিছু, যা আমরা বারবার একসঙ্গে অনুশীলন করি।

সূত্র: দ্য প্রোডাক্টিভ মুসলিম ডটকম