আতিথেয়তার জন্য কোনটা জরুরি, প্রাচুর্য নাকি হৃদয়ের উদারতা—এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় এক আনসার সাহাবি ও তাঁর স্ত্রীর জীবনের একটি ঘটনা থেকে।
তাদের ঘরে খাবার ছিল সামান্য, সেই খাবারটুকুও তাঁরা একজন মেহমানকে খাইয়ে দিয়েছিলেন। নিজেরা রাত কাটিয়েছিলেন অভুক্ত অবস্থায়। পবিত্র কোরআনে স্বয়ং আল্লাহ তাঁদের এই আত্মত্যাগের প্রশংসা করেছেন।
এক ব্যক্তি নবীজির কাছে এলেন। নবীজি (সা.) তাঁর খাবারের ব্যবস্থা করতে পরিবারের কাছে খবর পাঠালেন। কিন্তু নবীপত্নীদের ঘরে পানি ছাড়া কিছুই ছিল না। তিনি সাহাবিদের বললেন, ‘কে এই ব্যক্তিকে মেহমান হিসেবে গ্রহণ করবে?’
একজন সাহাবি এগিয়ে এলেন এবং নবীজির অতিথিকে গ্রহণ করলেন। বাড়িতে গিয়ে তিনি নিজের স্ত্রীকে বললেন, ‘রাসুলের অতিথিকে সম্মান করো (তাঁর আপ্যায়নের ব্যবস্থা করো)।’
স্ত্রী জানালেন, ঘরে শুধু সন্তানদের রাতের খাবারটুকুই আছে, এর বাইরে তেমন কিছু নেই। সাহাবি বললেন, ‘খাবার প্রস্তুত করো। বাতি জ্বালো। সন্তানেরা খেতে চাইলে তাদের ঘুম পাড়িয়ে দাও।’
বাতি ঠিক করার ভান করে সেটি নিভিয়ে দিলেন। অন্ধকারে স্বামী-স্ত্রী এমনভাবে বসে রইলেন, যেন তারাও সঙ্গে খাচ্ছেন। আসলে খেলেন শুধু অতিথি একাই। তাঁরা দুজন ক্ষুধার্ত অবস্থায় রাত পার করলেন।
স্ত্রী তা-ই করলেন। এরপর বাতি ঠিক করার ভান করে সেটি নিভিয়ে দিলেন। অন্ধকারে স্বামী-স্ত্রী এমনভাবে বসে রইলেন, যেন তারাও সঙ্গে খাচ্ছেন। আসলে খেলেন শুধু অতিথি একাই। তাঁরা দুজন ক্ষুধার্ত অবস্থায় রাত পার করলেন।
সকালে ওই সাহাবি নবীজির কাছে এলে তিনি বললেন, ‘গত রাতে তোমাদের দুজনের কাজে আল্লাহ হেসেছেন।’
এ ঘটনার প্রেক্ষাপটেই সুরা হাশরের নবম আয়াত নাজিল হয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৭৯৮)
নিজের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অন্যের প্রয়োজনকে প্রাধান্য দেওয়া অনেক উঁচু স্তরের আত্মত্যাগ। ইসলামের পরিভাষায় একে বলা হয় ‘ইসার’।
সন্তানদের ভাগের খাবারই ছিল ওই পরিবারের একমাত্র সম্বল। তবু তাঁরা অতিথি আপ্যায়নকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। আল্লাহ–তাআলা আনসারদের এই গুণের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘তারা নিজেদের ওপর অন্যদের প্রাধান্য দেয়, যদিও নিজেরা অভাবগ্রস্ত।’ (সুরা হাশর, আয়াত: ৯)
এ ঘটনা আমাদের শেখায়, উদারতা মানে কেবল উদ্বৃত্ত সম্পদ থেকে দান করা নয়। নিজেরা কষ্টে থেকেও অন্যদের কষ্ট অনুভব করা এবং সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের পাশে দাঁড়ানো উত্তম চরিত্রের পরিচায়ক।
এ ঘটনায় স্ত্রীর ভূমিকাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ঘরে খাবার কত অল্প, তা তিনি স্বামীকে সরাসরি জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেই বাস্তবতা তাঁকে অতিথি আপ্যায়ন থেকে বিমুখ করেনি। তিনি বরং স্বামীর সিদ্ধান্তে সম্মত হলেন এবং সন্তানদের ক্ষুধার্ত রেখে সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করলেন।
সংসারের সংকট অনেক সময় অভাবের কারণে নয়, বরং পারস্পরিক সমঝোতার অভাবে বড় হয়ে ওঠে। স্বামী-স্ত্রী যখন কল্যাণকর কাজে একমত হন, তখন সীমিত সামর্থ্য নিয়েও বড় কাজ করা সম্ভব।
এ কারণেই কোরআন পারিবারিক জীবনে সদ্ভাবের নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবন যাপন করো।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১৯)
সদাচার ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ওপর দাঁড়ানো সংসারেই এমন ত্যাগের সাহস জন্ম নেয়।
অনেক মানুষ সাহায্য নেওয়ার চেয়ে নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করতেই বেশি কষ্ট পান। কেউ লজ্জায় প্রয়োজনের কথা বলতেই পারেন না। তাই সাহায্যের পাশাপাশি গ্রহীতার মর্যাদা রক্ষা করাও জরুরি।
তাঁরা শুধু খাবার দেননি, দিয়েছেন এমনভাবে, যাতে মেহমান তাঁদের অভাব টের না পান। বাতি নিভিয়ে দেওয়ার কারণেই অতিথি নিশ্চিন্তে, সংকোচ ছাড়া খেতে পেরেছেন। নিজেদের ক্ষুধার কথা সামনে এনে তাঁরা তাঁকে অস্বস্তিতে ফেলেননি।
বাস্তব জীবনেও অনেক মানুষ সাহায্য নেওয়ার চেয়ে নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করতেই বেশি কষ্ট পান। কেউ লজ্জায় প্রয়োজনের কথা বলতেই পারেন না। তাই সাহায্যের পাশাপাশি গ্রহীতার মর্যাদা রক্ষা করাও জরুরি।
কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা, তোমরা খোঁটা ও কষ্ট দিয়ে নিজেদের দান বিনষ্ট করো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৬৪)
আনসার দম্পতির আচরণ আমাদের শেখায়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সৌন্দর্য কেবল কী দেওয়া হলো তাতে নয়, কীভাবে দেওয়া হলো তাতেও।
মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য তাঁরা এ কাজ করেননি। অথচ তাঁদের স্বীকৃতি এল এমন উৎস থেকে, যার সঙ্গে দুনিয়ার কোনো সম্মানের তুলনা চলে না। সুরা হাশরের ওই আয়াতেই আল্লাহ বলেন, ‘অন্তরের কার্পণ্য থেকে যাদের রক্ষা করা হয়েছে, তারাই সফলকাম।’ (সুরা হাশর, আয়াত: ৯)
এখানে সম্পদ খরচের কথার চেয়েও গুরুত্ব পেয়েছে অন্তরের সংকীর্ণতা থেকে মুক্তি। কারও প্রয়োজন দেখেও নিজের সম্পদ আঁকড়ে ধরা, অন্যের কল্যাণে খরচ করতে অনীহা, কিংবা অন্যের প্রাপ্তিতে মন খারাপ করা, এসবই অন্তরের কার্পণ্য। এ থেকে মুক্ত হওয়াই প্রকৃত সফলতা।
নাহিদা সুলতানা: আলেমা ও প্রাবন্ধিক
nahidasultana753375@gmail.com