কোরআন

‘সেখানেই নবী জাকারিয়া আল্লাহকে ডাকলেন’

নবী জাকারিয়া (আ.) ছিলেন মারইয়ামের অভিভাবক। তিনি যখনই মারইয়ামের নির্জন ইবাদতকক্ষে (মিহরাব) প্রবেশ করতেন, তখনই সেখানে অসময়ের রিজিক দেখতে পেতেন।

একদিন কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে মারইয়াম, এসব তুমি কোথা থেকে পেলে?” মারইয়াম জবাব দিলেন, “এসব আল্লাহর পক্ষ থেকে। নিশ্চয়ই আল্লাহ যাকে ইচ্ছা অপরিমিত রিজিক দান করেন।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৩৭)

কোরআনের আয়াতে শুধু ‘রিজিক’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে; কোন ধরনের রিজিক তা নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। তবে ইবনে কাসিরসহ একাধিক তাফসিরে উল্লেখ আছে, তা ছিল ঋতুবহির্ভূত ফলমূল। অর্থাৎ শীতকালে গ্রীষ্মের ফল বা গ্রীষ্মে শীতের ফল।

মারইয়ামের এই জবাব নবী জাকারিয়ার হৃদয়কে গভীরভাবে আলোড়িত করল। ঠিক সেই মুহূর্তে সেখানেই তিনি তাঁর প্রতিপালককে ডাকলেন। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৩৮)

‘হুনালিকা’: অর্থ ও প্রয়োগ

‘সেখানেই’ শব্দকে কোরআনের ভাষায় ‘হুনালিকা’ বলা হয়েছে। তবে শব্দটি কেবল একটি নির্দিষ্ট স্থানকে বোঝায় না; এটি ইঙ্গিত করে এমন এক মুহূর্তকে, যখন মানুষের মনোজগতে আধ্যাত্মিক সচেতনতা তৈরি হয়।

সাধারণ মানবিক প্রবণতা হলো, অন্যের জীবনে কোনো বিশেষ নেয়ামত বা সাফল্য দেখলে মানুষের মনে দুটি প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়—পরশ্রীকাতরতা, অথবা আক্ষেপ ও হতাশা।

জাকারিয়া (আ.) দেখিয়েছেন তৃতীয় একটি পথ। তিনি ছিলেন অতি বৃদ্ধ, তাঁর স্ত্রী ছিলেন বন্ধ্যা, সন্তান লাভের স্বাভাবিক সম্ভাবনা তখন প্রায় নিঃশেষ। তবুও মারইয়ামের ওপর আল্লাহর অনুগ্রহ দেখে তাঁর মন হতাশায় ভেঙে পড়েনি বা হিংসায় সংকুচিত হয়নি; বরং সেই মুহূর্তেই তিনি তা প্রার্থনায় রূপান্তরিত করলেন।

সুরা মারইয়ামে বর্ণিত দোয়া

নবী জাকারিয়ার এই দোয়ার আরও একটি রূপ পাওয়া যায় সুরা মারইয়ামে। সেখানে তিনি নিজের বার্ধক্য ও দুর্বলতার কথা উল্লেখ করে বলেন, তিনি তাঁর পরিবার-স্বজনদের নিয়ে উদ্বিগ্ন, এবং চান এমন একজন উত্তরাধিকারী যিনি নবী ইয়াকুবের বংশের ধারা বহন করবেন এবং যাঁকে আল্লাহ সন্তুষ্ট হৃদয়ে গ্রহণ করবেন। (সুরা মারইয়াম, আয়াত: ৪-৬)।

অর্থাৎ, নবী জাকারিয়ার দোয়ার পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের একটি আকাঙ্ক্ষা ও বাস্তব পারিবারিক উদ্বেগ। মারইয়ামের ঘটনাটি সেই দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষাকে একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে সক্রিয় প্রার্থনায় রূপ দিতে সাহায্য করেছিল।

বরকতময় মুহূর্ত কাজে লাগানো

তাফসিরের ঐতিহ্যে দুটি বিশেষ শিক্ষা প্রায়ই আলোচিত হয়:

১. পবিত্র স্থান ও সময়ের গুরুত্ব: ইবাদতের জন্য নির্দিষ্ট পবিত্র স্থান বা বরকতময় সময়ে দোয়ার একটি বিশেষ গুরুত্ব থাকে। এই ঘটনা থেকেও এর ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

২. অন্তরের জাগ্রত মুহূর্ত: কেবল বাহ্যিক স্থান নয়, যখন কোনো দৃশ্য বা অনুভূতি হৃদয়কে গভীরভাবে নাড়া দেয় এবং আল্লাহর মহানুভবতার কথা মনে করিয়ে দেয়, সেই মুহূর্তটিও দোয়ার জন্য বিশেষভাবে উপযুক্ত হয়ে ওঠে।

জাকারিয়া (আ.) যখন মারইয়ামের ইবাদতকক্ষে সেই দৃশ্য দেখলেন, তাঁর দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা ও সেই মুহূর্তের আবেগ একসঙ্গে মিলে গেল। আর সেই জাগ্রত হৃদয় নিয়ে দোয়া করার ফলে বার্ধক্য ও বন্ধ্যাত্বের স্বাভাবিক প্রতিবন্ধকতা ভেঙে আল্লাহ তাঁকে ইয়াহইয়ার মতো এক নবী সন্তান দান করলেন।

দৈনন্দিন জীবনে ‘হুনালিকা’

  • অন্যের কল্যাণে আনন্দিত হওয়া: কেউ কোনো অর্জন লাভ করলে হিংসা না করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ‘বারাকাল্লাহু লাকা’ বলা এবং নিজের জন্যও রবের কাছে কল্যাণ চাওয়া।

  • অনুপ্রেরণাকে ইবাদতে রূপান্তর: কাউকে বিনম্রভাবে ইবাদত করতে দেখে শুধু প্রশংসা না করে সাথে সাথে দোয়া করা—‘হে আল্লাহ, আমাকেও এমন তৌফিক দিন।’

  • আবেগের মুহূর্তকে কাজে লাগানো: কোনো সুন্দর দৃশ্য বা হৃদয়স্পর্শী ঘটনা দেখে মন আর্দ্র হয়ে উঠলে, সেই মুহূর্তটিকেই দোয়ায় রূপান্তর করা।