কোরআন

‘পিতা’ শব্দের ব্যবহার কোরআনে যেভাবে হয়েছে

সন্তানের লালনপালনে নানা ত্যাগ ও কষ্ট-তিতিক্ষা থাকা সত্ত্বেও পিতৃত্ব আল্লাহর এক অনন্য অনুগ্রহ ও উপহার। তাই তো পবিত্র কোরআনে বর্ণিত নেককার বান্দাদের অন্যতম দোয়া হলো, ‘হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদের স্ত্রীদের পক্ষ থেকে এবং আমাদের সন্তানের পক্ষ থেকে আমাদের জন্য চোখের শীতলতা দান করো।’ (সুরা ফুরকান, আয়াত: ৭৪)

নিচে পবিত্র কোরআনের আলোকে পিতৃত্বের স্বরূপ, এর বৈশিষ্ট্য এবং একজন আদর্শ পিতার কোরআনি দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হলো:

পিতৃত্বের ধারণা ও ভাষাগত ব্যবহার

১. শাব্দিক অর্থ: ‘পিতা’ শব্দের আরবি প্রতিশব্দ হলো ‘আল-আব’। আরবি ভাষায় শব্দটির মূল উৎস মূলত দুটি অর্থে ব্যবহৃত হয়

  • এক. কোনো কিছুর জন্য প্রস্তুত হওয়া বা সংকল্প করা,

  • দুই. স্বদেশের প্রতি টান বা ব্যাকুলতা।

লিসানুল আরব অভিধানে বলা হয়েছে, ‘উবুয়াহ’ বা পিতৃত্ব শব্দটি ‘আবা’ ধাতু থেকে আসতে পারে; যার অর্থ হলো কোনো কিছু গ্রহণে অস্বীকৃতি বা আত্মমর্যাদাবোধ।

এই শাব্দিক বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায় ইসলামে বাবার ভূমিকার মধ্যে দুটি দিক রয়েছে;

  • সন্তানকে সামাজিক ও আদর্শিক যত্নে গড়ে তোলার জন্য সদা প্রস্তুত থাকা ও সংকল্পবদ্ধ হওয়া।

  • সন্তানকে সব ধরনের বিপদ-আপদ থেকে আগলে রাখা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

পাশাপাশি সন্তানের সুরক্ষায় মা-বাবার মধ্যে দায়িত্বের যে বণ্টন, সেখানেও একধরনের কঠোরতা ও ত্যাগের মানসিকতা জড়িয়ে থাকে।

যেমনটি কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহারের আদেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে গর্ভে ধারণ করেছে এবং কষ্টের সঙ্গেই তাকে প্রসব করেছে।’ (সুরা আহকাফ, আয়াত: ১৫)

২. পারিভাষিক অর্থ: পারিভাষিক অর্থে আল-কাফাওয়ী বলেন, পিতা হলেন এমন একজন মানুষ, যার বীর্য থেকে অন্য একজন মানুষের জন্ম হয়। আর আল-মুনাউয়ীর মতে, পিতা হলেন এমন সত্তা, যিনি কোনো কিছুর অস্তিত্ব, সংশোধন বা প্রকাশের মাধ্যম বা কারণ হন।

আরবি ভাষায় পিতার অর্থ বোঝানোর জন্য আরেকটি শব্দ রয়েছে—‘আল-ওয়ালিদ’। ভাষাবিদদের মতে, ‘আব’ শব্দটি ‘ওয়ালিদ’ শব্দের চেয়ে ব্যাপক।

‘আল-আব’ শব্দটি সন্তানের নিজের বাবা, দাদা এবং চাচা সবার ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হতে পারে। কিন্তু ‘ওয়ালিদ’ বলতে স্রেফ সন্তানের আপন জন্মদাতা পিতাকেই বোঝায়; আর ‘ওয়ালিদাইন’ বলতে বোঝায় আপন মাতা ও পিতাকে।

কোরআনের পরিভাষায় পিতৃত্বের এই বন্ধন শুধু রক্ত বা বংশের সীমা পেরিয়ে আদর্শিক ও ইমানি বন্ধনকেও ধারণ করে। আর এই কারণেই হজরত ইব্রাহিম (আ.)-কে ‘আবুল আম্বিয়া’ বা ‘নবীদের পিতা’ বলা হয়।

পবিত্র কোরআনে ‘পিতা’ শব্দটির বিভিন্ন রূপ—একবচন, দ্বিবচন ও বহুবচন—প্রায় ১১৭ বার এসেছে। যেমন ইউসুফ (আ.)-এর ভাইয়েরা বলেছিল, ‘তারা বলল: হে আজিজ! তার এক অত্যন্ত বৃদ্ধ পিতা রয়েছেন, অতএব আমাদের একজনকে তার স্থলে রেখে দিন।’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৭৮)

আবার ইসমাইল (আ.)-এর কোরবানির ঘটনায় এসেছে, ‘অবাশে সে যখন পিতার সঙ্গে চলাফেরার বয়সে পৌঁছাল, তখন ইব্রাহিম বলল, হে বৎস! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে আমি তোমাকে জবেহ করছি, এখন বলো তোমার রায় কী? সে বলল, হে পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, আপনি তাই করুন। ইনশা আল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।’ (সুরা আস-সাফফাত, আয়াত: ১০২)

কোরআনে ‘আব’ শব্দের ব্যবহার

কোরআনে ‘আব’ শব্দের ৩ ধরনের ব্যবহার দেখা যায়।

১. জন্মদাতা পিতা: ‘সেদিন মানুষ পলায়ন করবে তার ভাই, তার মা এবং তার পিতার কাছ থেকে।’ (সুরা আবাসা, আয়াত: ৩৪-৩৫)

২. চাচা: যেমন—‘তোমরা কি উপস্থিত ছিলে যখন ইয়াকুবের মৃত্যু নিকটবর্তী হয়েছিল? যখন সে সন্তানদের বলল, আমার পর তোমরা কার ইবাদত করবে? তারা বলল, আমরা আপনার উপাস্য এবং আপনার পিতৃপুরুষ ইব্রাহিম, ইসমাইল ও ইসহাকের উপাস্যের ইবাদত করব।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৩৩)। এখানে ইয়াকুব (আ.)-এর চাচা হওয়া সত্ত্বেও ইসমাইল (আ.)-কে ‘পিতৃপুরুষ’ বা পিতা বলা হয়েছে।

৩. দাদা বা পূর্বপুরুষ: যেমন ‘তোমাদের পিতা ইব্রাহিমের মিল্লাত বা আদর্শ।’ (সুরা হজ্জ, আয়াত: ৭৮)

কোরআনের বর্ণনায় ‘পিতা’ শব্দটির সঙ্গে সব সময় সন্তানদের এক গভীর শ্রদ্ধা ও মানসিক আনুগত্য জড়িয়ে থাকে।

যেমন নবী শোআইব (আ.)-এর দুই কন্যার মুখে আমরা শুনি, যখন মুসা (আ.) তাদের অবস্থা জানতে চাইলেন, তারা বলেছিল, ‘আমরা আমাদের পশুদের পানি পান করাতে পারি না যতক্ষণ না রাখালেরা তাদের পশু নিয়ে চলে যায়, আর আমাদের পিতা একজন অতি বৃদ্ধ মানুষ।’ (সুরা কাসাস, আয়াত: ২৩)

দুটি ভিন্ন ব্যবহার

কোরআন পিতা-মাতাকে বোঝাতে দুটি ভিন্ন শব্দ চমৎকার মনস্তাত্ত্বিক আবহে ব্যবহার করেছে:

আল-আবাওয়াইন: এই শব্দে পিতার প্রাধান্য বেশি থাকে। যেখানে পিতার ভূমিকা বা সামাজিক অবস্থান আগে আসে, সেখানে এই শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন ‘এবং সে তার পিতা-মাতাকে আরশে আরোহণ করাল।’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ১০০)

যেহেতু রাজকীয় বা সামাজিক মর্যাদার ক্ষেত্রে পিতার অবদানের দিকটি অবধারিতভাবেই সামনে আসে।

আল-ওয়ালিদাইন: এই শব্দে মায়ের ত্যাগ ও কষ্টকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। গর্ভধারণ ও সন্তান লালনপালনে মায়ের যে সীমাহীন কষ্ট, সেটির প্রতি সম্মান জানিয়েই কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আর পিতা-মাতার (ওয়ালিদাইন) সঙ্গে সদয় আচরণ করো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ৮৩)

কোরআন সম্পর্কের গভীরতা ও শক্তি অনুযায়ী বিষয়গুলোকে বিন্যস্ত করে। হাশরের ময়দানে পলায়নের আয়াতে আল্লাহ–তাআলা মায়ের কথা আগে এবং পিতার কথা পরে উল্লেখ করেছেন, ‘যেদিন মানুষ পলায়ন করবে তার ভাই, তার মা এবং তার পিতা থেকে।’

মানুষ যার কাছ থেকে সাহায্য পাওয়ার আশা বেশি রাখে, তার কাছ থেকে দূরে যাওয়ার কষ্ট তত তীব্র হয়; তাই মায়ের পর বাবার থেকে পলায়নের কথা বলা হয়েছে।