ইতিহাসে ১২ রমজান

ইবনে তুলুনের স্বাধীনতা, ইবনে জাওজির ঐতিহাসিক জানাজা

ইতিহাসের পাতায় ১২ রমজান। এই দিনে মিসরের নীল নদের তীরে সামাররার স্থাপত্যশৈলী নিয়ে এক নতুন স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে, আবার বাগদাদের আকাশ ভারী হয় কালজয়ী জ্ঞানসাধকের বিদায়ি শোকে।

জ্ঞান, স্থাপত্য এবং সামরিক বিজয়ের রেখা এই দিনটিকে ইতিহাস চিহ্নিত করে রেখেছে।

স্বাধীন তুলুনি রাষ্ট্রের অভ্যুদয়

২৫৪ হিজরির ১২ রমজান (৮৬৮ খ্রিষ্টাব্দ) মামলুক বংশোদ্ভূত সাহসী সেনাপতি আহমদ ইবনে তুলুন গভর্নর হিসেবে মিশরে প্রবেশ করেন। (ইবনে আসির, আল-কামিল ফিত তারিখ, ৭/২১৫, ১৯৮৭)

আব্বাসীয় খিলাফতের দুর্বলতার সুযোগে তিনি মিসরে প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্র ‘তুলুনি সালতানাত’ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি শাসন–দক্ষতায় মিসরকে একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক শক্তিতে রূপান্তর করেছিলেন।

তাঁর প্রতিষ্ঠিত শক্তিশালী সেনাবাহিনী এবং উন্নত প্রশাসনিক কাঠামো কায়রোকে তৎকালীন বাগদাদের সমকক্ষ করে তোলে। (সুয়ুতি, তারিখুল খুলাফা, পৃষ্ঠা ৩৬৫, ২০০৪)

ইবনে তুলুন মসজিদ

ঠিক ১১ বছর পর, ২৬৫ হিজরির ১২ রমজান (৮৭৯ খ্রিষ্টাব্দ) কায়রোতে ইবনে তুলুন মসজিদের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১১/৪০, ১৯৮৮)

এই মসজিদটি নির্মাণ ছিল আব্বাসীয় কেন্দ্র থেকে রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রতীকী ঘোষণা। স্থপতি সাইদ ইবনে কাতিব আল-ফারগানির নকশা করা এই মসজিদটি প্রাচীন মিসরের মার্বেল স্তম্ভের বদলে মজবুত ইটের ওপর নির্মিত হয়।

এর বিখ্যাত ‘পেঁচানো মিনার’ আজও ইবনে তুলুনের ইরাকি সামরিক ঐতিহ্যের সাক্ষ্য দেয়।

ইবনে তুলুন চেয়েছিলেন আল্লাহর ঘর যেন সাধারণ মানুষের করের টাকায় তৈরি না হয়। পরে তিনি মুকাত্তাম পাহাড়ের পাদদেশে একটি গুপ্তধন খুঁজে পান, যার পরিমাণ ছিল প্রায় ১২ লক্ষ দিনার (স্বর্ণমুদ্রা)।

সেই প্রাপ্ত অর্থ তিনি মসজিদের নির্মাণকাজে ব্যয় করেন। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১১/৪১, ১৯৮৮)

ইবনে জাওজির বিদায়

৫৯৭ হিজরির ১২ রমজান (১২০১ খ্রিষ্টাব্দ) আব্বাসীয় বাগদাদ তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধীমান সন্তানকে হারায়। বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও ইতিহাসবিদ ইবনে জাওজি এই দিনে ইন্তেকাল করেন। (ইমাম জাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২১/৩৬৫, ১৯৮৫)

তিনি প্রায় ৩০০টি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন, যার মধ্যে আল-মুনতাজাম ইতিহাসের এক অমূল্য আকর। তাঁর জানাজার দিন বাগদাদের সমস্ত বাজার বন্ধ হয়ে যায় এবং লাখো মানুষ তাঁদের প্রিয় ওস্তাদকে শেষ বিদায় জানাতে রাজপথে নেমে আসেন।

ইতিহাসবিদরা একে বাগদাদের ইতিহাসের অন্যতম ‘বৃহৎ জানাজা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁকে ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.)-এর সমাধির পাশে দাফন করা হয়। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১৩/২৮, ১৯৮৮)

আন্তাকিয়া বিজয়

৬৬৬ হিজরির ১২ রমজান (১২৬৮ খ্রিষ্টাব্দ) সুলতান জহির বাইবার্স আন্তাকিয়া শহরকে ক্রুসেডারদের থেকে মুক্ত করেন। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১৩/২৪৫, ১৯৮৮)

১৭০ বছর ধরে আন্তাকিয়া ছিল ক্রুসেডারদের অন্যতম শক্তিশালী ঘাঁটি। ৪ রমজান শহর জয় হলেও ১২ রমজান নাগাদ দুর্ভেদ্য কেল্লাটির ওপর মুসলিমদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়।

সালাহউদ্দিন আইয়ুবির হিত্তিন যুদ্ধের পর এটিই ছিল মুসলিমদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিজয়। (ইবনে আসির, আল-কামিল ফিত তারিখ, ৯/১৪০, ১৯৮৭)