ইসলামের ইতিহাসের উষালগ্নে মদিনা মুনাওয়ারায় জ্ঞানচর্চা, আত্মশুদ্ধি এবং দুনিয়াবিমুখতার এক অনন্য বাতিঘর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল ‘আস-সুফফা’। এটি কোনো সাধারণ আশ্রয়স্থল ছিল না, বরং ছিল নবীজি (সা.)-এর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ইসলামের প্রথম মাদ্রাসা।
মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের ফলে মুহাজিরদের জীবনযাপনে এক অভূতপূর্ব সংকট তৈরি হয়। মুশরিকদের অসহনীয় জুলুম-নির্যাতন থেকে ইসলাম রক্ষার্থে ঘরবাড়ি ও সহায়-সম্পত্তি মক্কায় ফেলে সম্পূর্ণ নিঃস্ব অবস্থায় তাঁরা মদিনায় এসেছিলেন।
তৎকালীন মদিনার অর্থব্যবস্থা ছিল মূলত কৃষিনির্ভর, পক্ষান্তরে মক্কার মুহাজিররা ছিলেন ব্যবসা-বাণিজ্যে অভ্যস্ত। কৃষিকাজে কোনো দক্ষতা না থাকায় এবং চাষাবাদের জায়গা-জমি বা মূলধন না থাকায় তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হন তাঁরা।
যদিও আনসার সাহাবিরা তাঁদের সাধ্যের সবটুকু দিয়ে মুহাজিরদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তবু বিপুলসংখ্যক উদ্বাস্তু ও বিভিন্ন গোত্র থেকে আগত মুসাফিরদের জন্য একটি স্থায়ী বা সাময়িক আশ্রয়ের প্রয়োজন দেখা দেয়।
মদিনায় হিজরতের প্রায় ১৬ মাস পর যখন মসজিদে আকসার পরিবর্তে বাইতুল্লাহ বা কাবার দিকে কিবলা পরিবর্তন করা হয়, তখন মসজিদে নববিতে এই ঐতিহাসিক আশ্রয়স্থলের সূচনা ঘটে।
দিক পরিবর্তনের ফলে মসজিদের প্রথম কিবলার দেয়ালটি পেছনের দেয়ালে পরিণত হয়। নবীজি (সা.) সেখানে একটি ছাদ বা ছায়ার ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেন। চারপাশ উন্মুক্ত থাকা এই ছাদযুক্ত স্থানটিই ইতিহাসে ‘আস-সুফফা’ বা ‘আজ-জুল্লাহ’ (ছায়ানীড়) নামে পরিচিতি লাভ করে।
ঐতিহাসিক ইবনে জুবাইর তাঁর ভ্রমণকাহিনিতে সুফফাকে কুবার শেষ প্রান্তের একটি বাড়ি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে ঐতিহাসিকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সুফফার অধিবাসী বা সদস্যদের কেউ কেউ পরবর্তী সময়ে সেই বাড়িতে বসবাস করায় সেটিও কালক্রমে ‘সুফফা’ নামে পরিচিত হয়।
মূলত মসজিদে নববির ছাদযুক্ত স্থানের অধিবাসী হওয়ার কারণেই তাঁরা ‘আহলে সুফফা’ নামে প্রসিদ্ধ হন।
সুফফার সুনির্দিষ্ট পরিধি জানা না গেলেও সেখানে যে বিপুলসংখ্যক সাহাবির সংকুলান হতো, তার প্রমাণ মেলে এক অলিমার বর্ণনায়—যেখানে একসঙ্গে ৩০০ মানুষ উপস্থিত হয়েছিলেন।
সুফফায় সর্বপ্রথম যাঁরা বসবাস শুরু করেন, তাঁরা ছিলেন ‘সুফফাতুল মুহাজিরিন’। পরবর্তী সময় মদিনায় আসা বিভিন্ন গোত্রের প্রতিনিধিদল—যাদের চেনা-পরিচিত কেউ ছিল না, তাঁরাও এখানে স্থান পেতেন।
সুফফার সদস্যসংখ্যা সব সময় এক রকম থাকত না। সাধারণত স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন ৭০ জনের মতো। কখনো মেহমানদের আগমনে এই সংখ্যা বৃদ্ধি পেত। যেমন সাদ ইবনে উবাদা একাই সুফফার ৮০ জন সদস্যকে আপ্যায়ন করতেন।
মদিনায় নিজস্ব ঘরবাড়ি থাকার পরও কেবল দুনিয়াবিমুখ জীবন ও জ্ঞানচর্চার প্রতি ভালোবাসার কারণে কিছু আনসার সাহাবিও এখানে অবস্থান করতেন। তাঁদের মধ্যে কাব ইবনে মালিক, হানজালা ইবনে আবি আমির এবং হারিসা ইবনে নুমান অন্যতম।
বিভিন্ন গোত্র থেকে এসে একত্র হওয়ায় নবীজি তাঁদের নাম দিয়েছিলেন ‘আল-আওফাজ’ (মিশ্রিত জনগণ)।
হাফিজ আবু নুআইম তাঁর বিখ্যাত হিলইয়াতুল আউলিয়া গ্রন্থে সুফফার প্রসিদ্ধ সদস্যদের একটি তালিকা প্রস্তুত করেছেন, যা মূলত আবু আব্দির রহমান আস-সুলামির তারিখু আহলিস সুফফা থেকে সংগৃহীত। সেখান থেকে উল্লেখযোগ্য কিছু নাম নিচে দেওয়া হলো—
১. আবু হোরাইরা; যিনি সুফফার সার্বিক অবস্থার খোঁজখবর রাখতেন।
২. আবু জর গিফারি
৩. সালমান ফারসি
৪. আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ
৫. বিলাল ইবনে রাবাহ
৬. হোজাইফা ইবনে আল–ইয়ামান
৭. আব্দুল্লাহ জুল-বিজাদাইন
৮. সোহাইব ইবনে সিনান আর-রুমি
৯. বারা ইবনে মালিক আল-আনসারি
১০. উবাদা ইবনে আস–সামিত; যিনি শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন।
উল্লেখ্য, সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস, আবু আইয়ুব আল-আনসারি ও হাবিব ইবনে জায়েদের মতো কিছু সাহাবিকে কোনো কোনো বর্ণনায় সুফফার সদস্য বলা হলেও ইবনে কাসিরসহ প্রধান ঐতিহাসিকগণ তা নাকচ করেছেন। রাদিয়াল্লাহু আনহুম (আল্লাহ তাঁদের সকলের প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন)।
সুফফার বাসিন্দাদের জীবন ছিল একাধারে জ্ঞানচর্চা, গভীর ইবাদত ও বীরত্বপূর্ণ জিহাদের চমৎকার সমন্বয়। ইতিহাসে তাঁরা ‘রাতে সন্ন্যাসী এবং দিনে অশ্বারোহী যোদ্ধা’ হিসেবে খ্যাত ছিলেন।
উবাদা ইবনে আস–সামিতের মতো শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে তাঁরা কোরআন তিলাওয়াত, হিফজ এবং লিখনশৈলী শিখতেন। পরস্পরের সঙ্গে আয়াতের অর্থ নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করতেন।
এই মাদ্রাসারই শ্রেষ্ঠ ফসল আবু হোরাইরা (রা.), যিনি ইসলামের ইতিহাসের সর্বোচ্চ হাদিস বর্ণনাকারী। অন্যদিকে কেয়ামত–পূর্ব সময়ের হাদিস সংরক্ষণে প্রসিদ্ধি লাভ করেন হোজাইফা ইবনে আল–ইয়ামান (রা.)।
জাগতিক ব্যস্ততাহীন এই মুখলিস দলটির মূল লক্ষ্যই ছিল শাহাদাত। সুফফার সদস্যরা বদর, ওহুদ, খাইবার, তাবুক ও ইয়ামামার মতো প্রতিটি বড় যুদ্ধে অংশ নেন।
সাফওয়ান ইবনে বাইজা, হানজালা (যাঁকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন), জায়েদ ইবনে আল–খাত্তাব এবং সালিম (রা.)–এর মতো শ্রেষ্ঠ সুফফা সদস্যরা বিভিন্ন যুদ্ধে শাহাদাতবরণ করেন। বিশেষ করে বিরে মাউনার যুদ্ধে সুফফার ৭০ জন কারি সাহাবি একসঙ্গে শহীদ হন।
সুফফার অধিবাসী বা সদস্যদের জীবনযাত্রা ছিল চরম দারিদ্র্য ও কৃচ্ছ্রসাধনে ঘেরা। তাঁদের পুরো শরীর ঢেকে রাখার মতো পর্যাপ্ত কাপড় ছিল না। শীতের তীব্রতা থেকে বাঁচার উপায় ছিল না।
অনেকে ছোট চাদর গলায় বেঁধে বা কোমরে লুঙ্গি হিসেবে জড়িয়ে রাখতেন, যা অনেক সময় হাঁটু পর্যন্তও পৌঁছাত না। ময়লা-ধুলাবালির কারণে এবং ‘হাওতাকিয়া’ নামক বিশেষ পাগড়ি ও ‘আল-হিনাফ’ নামক মোটা নিম্নমানের চাদর পরিধানের কারণে তাঁরা বাইরে বের হতেও ইতস্তত বোধ করতেন।
তাঁদের প্রধান খাদ্য ছিল দৈনিক সামান্য খেজুর। একঘেয়ে খেজুর খাওয়ার ফলে পেটে সমস্যা হলেও বিকল্প না থাকায় নবীজি (সা.) তাঁদের ধৈর্যের নসিহত করতেন। মাঝে মাঝে যব, জাশিশা, হাইসা বা দুধের ব্যবস্থা হতো।
ক্ষুধার তীব্রতায় অনেকে নামাজরত অবস্থায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে যেতেন, যা দেখে আরবের বেদুইনরা তাঁদের মৃগী রোগী ভাবত। স্বয়ং আবু হুরাইরা (রা.) ক্ষুধার তাড়নায় মিম্বারের পাশে বেহুঁশ হয়ে পড়ে থাকতেন।
কিন্তু এই তীব্র ক্ষুধা কখনোই তাঁদের পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও সততা থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি; খাবারের মজলিশে একে অপরের প্রতি সর্বোচ্চ খেয়াল রাখতেন তাঁরা।
নবীজি (সা.) সুফফার সদস্যদের নিজের পরিবারের চেয়েও বেশি প্রাধান্য দিতেন। একদা নবীকন্যা ফাতেমা (রা.) গৃহস্থালি কাজের কষ্টের কথা উল্লেখ করে একজন গৃহসেবকের আবেদন করলে নবীজি বলেন, ‘আমি কি তোমার খেদমতের ব্যবস্থা করে সুফফার লোকদেরকে অভুক্ত রাখব?’
তিনি যুদ্ধবন্দীদের বিক্রয়লব্ধ অর্থ নিজের কন্যার সুখের জন্য ব্যয় না করে সুফফাবাসীদের জন্য উৎসর্গ করেন।
আনসার সাহাবিরা তাঁদের বাগান থেকে পাকা খেজুরের কাঁদি এনে মসজিদের খুঁটিতে রশি টাঙিয়ে ঝুলিয়ে রাখতেন (যা দ্বিতীয় শতাব্দী পর্যন্ত প্রথা হিসেবে চালু ছিল)। এশার নামাজের পর নবীজি (সা.) সুফফার সদস্যদের সক্ষমতা অনুযায়ী সাহাবিদের ঘরে ঘরে রাতের খাবারের মেহমান হিসেবে বণ্টন করে দিতেন। অবশিষ্টদের নিজের ঘরে নিয়ে যেতেন।
তাফসিরবিদদের মতে, পবিত্র কোরআনের বেশ কিছু আয়াত সুফফার সাহাবিদের জীবনধারা ও গুণের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। বিশেষ করে সুরা বাকারার একটি আয়াত তাঁদের চরিত্রের নিখুঁত চিত্র তুলে ধরে:
‘সম্পদ ব্যয়ের অন্যতম খাত হলো, সেই সকল দরিদ্র জনগণ, যারা মহান আল্লাহর পথে এমনভাবে আবদ্ধ হয়েছে যে তারা জীবিকার জন্য কোনো চেষ্টা করতে সক্ষম নয়। তারা মানুষের কাছে হাতপাতা থেকে ধৈর্য ধারণ করায় অজ্ঞ লোকেরা তাদেরকে ধনবান মনে করে। আপনি তাদেরকে তাদের লক্ষণ দেখেই চিনতে পারবেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৭৩)
যদিও সুরা আনআম ও সুরা কাহাফের কিছু আয়াত মক্কায় অবতীর্ণ হওয়ায় সরাসরি সুফফাবাসীদের শানে নাজিল হওয়ার বিষয়টি ইবনে কাসির নাকচ করেছেন, তবে আয়াতে বর্ণিত গুণাবলির পূর্ণ প্রতিফলন এই জামাতের মাঝে বিদ্যমান ছিল।
জাহেলি সমাজের দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষ যেখানে জীবনধারণের জন্য চুরি, ডাকাতি, খুন ও লুণ্ঠনের মতো অপরাধে লিপ্ত হতো—যার ফলে সামাজিক নিরাপত্তা ধ্বংস হয়ে যেত, সেখানে নবীজির হাতে গড়া সুফফা মাদ্রাসার ছাত্ররা অনাহারে থেকেও সমাজকে দিয়েছেন সর্বোচ্চ নিরাপত্তা, ইলম এবং সততার দীক্ষা।