একজন মুমিনের সর্বোত্তম আদর্শ রাসুল (সা.)। কোরআন ও হাদিসে তাঁর সুন্নাহ অনুসরণের প্রতিদান হিসেবে বিভিন্ন পুরস্কারের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। তন্মধ্যে বিশেষ সাতটি পুরস্কার হলো—
১. আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়া
সুন্নাহ অনুসরণের সর্বশ্রেষ্ঠ পুরস্কার আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়া। কোরআনে আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমার অনুসরণ করো, তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপ ক্ষমা করবেন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৩১)
আয়াতটি ভালোবাসার দাবিকে পরীক্ষার একটি মানদণ্ডে দাঁড় করিয়েছে। মুখের ভালোবাসা তখনই সত্য হয়ে ওঠে, যখন জীবনে সুন্নাহ অনুসরণের প্রতিফলন ঘটে। আল্লাহর ভালোবাসা আর গুনাহের ক্ষমা, এ দুই পুরস্কারের সামনে দুনিয়ার সব অর্জনই তুচ্ছ।
২. এক শত শহীদের মর্যাদা লাভ
উম্মতের মধ্যে যখন সুন্নতের চর্চা দুর্বল হয়ে বিদআত ও অনাচার সমাজজীবনে বিস্তার লাভ করবে, তখন নবীর আদর্শকে আঁকড়ে ধরা নিঃসন্দেহে অধিক মর্যাদার কাজ।
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আমার উম্মতের অবক্ষয়ের সময় যে ব্যক্তি আমার কোনো সুন্নত আঁকড়ে ধরবে, তার জন্য এক শত শহীদের সওয়াব রয়েছে।’ (বাইহাকি, আজ-জুহদুল কাবির, হাদিস: ২০৭)
যখন কোনো সুন্নত মানুষের জীবন থেকে হারিয়ে যেতে বসে, তখন সেটিকে নিজের জীবনে ধারণ করা এবং অন্যদের মাঝে প্রচলিত করার প্রচেষ্টা নবীর আদর্শের প্রতি গভীর ভালোবাসার পরিচয় বহন করে।
৩. বেহেশত প্রবেশ
সুন্নত অনুসরণ যে বেহেশতের পথে অগ্রসর হওয়া, তা রাসুল (সা.) স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমার উম্মতের প্রত্যেকেই জান্নাতে প্রবেশ করবে, তবে যে অস্বীকার করবে, সে ছাড়া।’ সাহাবিরা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আল্লাহর রাসুল, কে অস্বীকার করবে?’ তিনি বললেন, ‘যে আমার আনুগত্য করবে, সে বেহেশতে প্রবেশ করবে, আর যে আমার অবাধ্য হবে, সে-ই অস্বীকার করল।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭২৮০)
ছোট একটি আমলও যখন নবীজির অনুসরণে সম্পন্ন হয়, তখন তা আখিরাতের পাথেয় হয়ে ওঠে।
৪. বেহেশতে নবীজির সান্নিধ্য
রাসুলকে ভালোবাসার একটি অনন্য পুরস্কারের কথা এসেছে হাদিসে। এক ব্যক্তি বললেন, তাঁর পরকালের প্রস্তুতি খুব বেশি নেই, তবে তিনি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে ভালোবাসেন। নবীজি (সা.) বলেন, ‘তুমি তার সঙ্গেই থাকবে, যাকে তুমি ভালোবাসো।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৩৯)
অন্য হাদিসে নবীজি (সা.) বলেন, ‘যে আমার সুন্নতকে ভালোবাসল, সে আমাকে ভালোবাসল, আর যে আমাকে ভালোবাসল, সে বেহেশতে আমার সঙ্গে থাকবে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৬৭৮)
ভালোবাসা যখন সত্য হয়, তখন তা অনুসরণে প্রকাশ পায়। নবীজির চরিত্র, ইবাদত, নম্রতা, দয়া ও জীবনাচরণকে নিজের জীবনে ধারণ করা সেই ভালোবাসারই দৃশ্যমান সাক্ষ্য।
৫. পুণ্যবানদের সঙ্গ লাভ
পরকালের আরেকটি মহামূল্য পুরস্কার হলো পুণ্যবান মানুষের সান্নিধ্য। আল্লাহ বলেন, ‘আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য করবে, সে তাদের সঙ্গে থাকবে, যাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন—তাঁরা হলেন নবী, সিদ্দিক, শহীদ ও সৎকর্মশীল। আর তারা কতই না উত্তম সঙ্গী!’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৬৯)
সুন্নতের সৌন্দর্য এখানেই যে এর অনুসরণে জীবনের সাধারণ কাজও সওয়াবের উপলক্ষ হয়ে উঠতে পারে। খাওয়া, ঘুম, পোশাক পরা কিংবা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর মতো বৈধ কাজগুলো নবীজির নির্দেশিত পদ্ধতিতে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়তে সম্পন্ন করলে তা ইবাদতে পরিণত হয়।
এ সুসংবাদ মুমিনকে এমন জীবন গড়ার প্রেরণা দেয়, যার প্রতিটি পদক্ষেপ আল্লাহর অনুগ্রহপ্রাপ্ত বান্দাদের কাফেলার দিকে এগিয়ে যায়।
৬. সাধারণ কাজও ইবাদত হয়
সুন্নতের সৌন্দর্য এখানেই যে এর অনুসরণে জীবনের সাধারণ কাজও সওয়াবের উপলক্ষ হয়ে উঠতে পারে। খাওয়া, ঘুম, পোশাক পরা কিংবা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর মতো বৈধ কাজগুলো নবীজির নির্দেশিত পদ্ধতিতে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়তে সম্পন্ন করলে তা ইবাদতে পরিণত হয়। রাসুল (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই কাজের প্রতিদান নিয়তের ওপর নির্ভরশীল আর প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিয়ত অনুযায়ী প্রতিফল পাবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১)
এভাবেই সুন্নত সবখানে নেকির সম্ভাবনা তৈরি করে। মুমিন জীবনের প্রতিটি অধ্যায় তখন আল্লাহর সন্তুষ্টির সন্ধানে রচিত হতে থাকে।
৭. সুন্নত প্রচারের সওয়াব
সুন্নত নিজে পালন করার পাশাপাশি অন্যকে তার দিকে আহ্বান করারও বিরাট মর্যাদা রয়েছে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো কল্যাণের পথ দেখায়, সে তা সম্পাদনকারীর সমপরিমাণ সওয়াব পাবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৮৯৩)।
তাই কোনো মানুষকে সুন্নাহ পালনে উৎসাহিত করা কিংবা বিলুপ্তপ্রায় কোনো নবীর আমলকে মানুষের মাঝে পুনরুজ্জীবিত করার মাধ্যমেও একজন মানুষ সওয়াবের অধিকারী হতে পারে।
এসব পুরস্কার সেই মানুষদের জন্য, যাঁরা ছোট ছোট আমলেও নবীজিকে অনুসরণের চেষ্টা করেন। আসুন, আজ থেকেই সুন্নতকে জীবনে ধারণ করার প্রতিজ্ঞা করি। হয়তো এই ছোট্ট পদক্ষেপই বয়ে আনবে সবচেয়ে বড় প্রতিদান।
নাহিদা সুলতানা: আলেমা ও প্রাবন্ধিক
nahidasultana753375@gmail.com)