‘কয়েকজন প্রবীণ কোরাইশসহ আবু তালিব শামের দিকে রওনা হন। তাঁর সঙ্গে মুহাম্মদ (সা.) বের হলেন। তারপর তাঁরা পাদরির নিকট এসে (বাহন থেকে) নেমে তাঁবু টানান।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৬২০)
আমাদের প্রথমে জানতে হবে শাম বলতে কী বোঝায়? শামের ঠিক কোন শহরের উদ্দেশে তাঁরা বের হয়েছিলেন?
‘শাম’ অর্থ ‘বাম’। হিজাজের ভূমিতে পূর্ব দিকে মুখ করে দাঁড়ালে বাঁয়ের অবস্থানে থাকা বর্তমান সিরিয়া, জর্ডান ও লেবাননের বিশাল ভূখণ্ডকে আরবেরা ‘শাম’ বলতেন। (ইবনে ফজলুল্লাহ আল-উমারি, ৩/৫০৯; ইবনে আসাকির, ১/৯)
উত্তর-পূর্বে ফোরাত এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে মিসর, দক্ষিণ-পূর্বে ‘জাবালে তাই’ এবং উত্তর-পশ্চিমে ভূমধ্যসাগর থেকে আনাদুল পর্বতমালা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল শামের সীমান্ত। এর প্রধান শহরগুলোর মাঝে দামেস্ক, ইলা (জেরুজালেম), নাবলুস, হিমস, হালাব, বৈরুত, আম্মান, আসকালান, গাজা, সাইদা, ত্রিপোলি, বালাবাক্কা, মানবিজ এবং অন্যতম একটি ‘বুসরা শাম’ উল্লেখযোগ্য। (ইয়াকুত আল-হামাভি, মুজামুল বুলদান, ৩/৩১২)
হিজাজের অধিবাসীদের মধ্যে কোরাইশরা বছরের গ্রীষ্মকালে যে কাফেলা পরিচালনা করত, তার বেশির ভাগই ছিল শামের ‘বুসরা’ ও ‘গাজা’মুখী। পবিত্র কোরআনে এ কাফেলাকে বলা হয়েছে ‘ইলাফে কোরাইশ’ বা কোরাইশের বাণিজ্য-কাফেলা। (সুরা কুরাইশ, আয়াত: ১-২)
ইলাফ শব্দটি ‘আলফ’ থেকে এসেছে, যার অর্থ হাজার। শব্দটি দিয়ে কী বোঝানো হয়েছে, তা নিয়ে তাফসিরকারদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা আছে। হয়তো হাজার মুদ্রার ব্যবসা, অথবা হাজার উটের কাফেলা। আরবেরা এই সফরকে ‘ইর’ নামেও আখ্যা দিত।
নবীজির সময়ে শামের বুসরা রোমান সাম্রাজ্যের অধীন হয়ে গাসসানি শাসকের রাজধানীর মর্যাদা লাভ করে। নবীজি (সা.) আবু তালিবের সঙ্গে এ নগরী অভিমুখে বের হয়েছিলেন। তবে এ যাত্রায় তিনি ‘বুসরা’ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেননি। কিন্তু কেন?
কীভাবে শুরু হয়েছিল এ কাফেলা পরিচালনা? কী ছিল সেই কাফেলার পথ?
নবীজির প্রপিতামহ হাশিম ইবনে আবদি মানাফ সর্বপ্রথম কোরাইশদের জন্য শীতকালে ইয়েমেনে ও গ্রীষ্মকালে শামে ব্যবসায়িক সফরের নিয়ম চালু করেন। এক ব্যবসায়িক সফরে ফিলিস্তিনের গাজায় গিয়ে মৃত্যুবরণ করলে সেখানে তাঁকে সমাহিত করা হয়। (সফিউর রহমান মুবারকপুরি, আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃষ্ঠা: ৪৯)
তিনিই রোমান সম্রাটের কাছ থেকে পত্রালাপের মাধ্যমে ফরমান লিখিয়ে নিয়েছিলেন যে কোরাইশরা ব্যবসায়ের উদ্দেশে পণ্যসহ তাঁর দেশে গেলে কোনো রূপ কর দিতে হবে না। (শিবলি নোমানি, সিরাতুন নাবি, পৃষ্ঠা: ৫৬)
কোরাইশরা মক্কা থেকে ‘বুসরা’ ও ‘গাজা’ পর্যন্ত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে তিনটি পথ ব্যবহার করত বলে মত দিয়েছেন জর্ডানের ভূবিদ্যা ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আহমাদ মুলাআবাহ:
১. মক্কা থেকে ‘আবওয়া’, তারপর ইয়াসরিব (মদিনা) হয়ে তায়মা, এরপর আল-জাওফ (দুমাতুল জানদাল) হয়ে আরদে উরদুন (জর্ডান)।
২. মক্কা থেকে জেদ্দা, বাহরে কুলজুমের (লোহিত সাগর) তীর ধরে ‘আল-ওয়াজহ’, তারপর ‘আল-উলা’ হয়ে আকাবা উপসাগরের আয়লা (আকাবা বন্দর), সেখান থেকে মা‘আন হয়ে ‘নাকাব মরুভূমি’ পাড়ি দিয়ে ‘গাজাহ হাশিম’, যা বর্তমান গাজা শহর।
৩. তৃতীয় পথটি ‘আল-জাওফ’ হতে পৃথক হয়ে ইরাক অভিমুখী ভিন্ন একটি পথ।
নবীজির সময়ে শামের বুসরা রোমান সাম্রাজ্যের অধীন হয়ে গাসসানি শাসকের রাজধানীর মর্যাদা লাভ করে। নবীজি (সা.) আবু তালিবের সঙ্গে এ নগরী অভিমুখে বের হয়েছিলেন। তবে এ যাত্রায় তিনি ‘বুসরা’ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেননি। কিন্তু কেন? আসুন, সে ঘটনাটি পড়ি।
আবু মুসা আল-আশআরি (রা.) বলেন, ‘কয়েকজন প্রবীণ কোরাইশসহ আবু তালিব শামের দিকে রওনা হন। তাঁর সঙ্গে নবীজিও বের হলেন। তারপর তাঁরা পাদরির নিকট এসে (সওয়ারি থেকে) নেমে তাঁবু টানান। পাদরি তাঁদের উদ্দেশে (মঠ থেকে) বেরিয়ে আসেন।
‘ইতঃপূর্বে বহু কাফেলা আসা-যাওয়া করেছে; কিন্তু তিনি কারও উদ্দেশে বের হননি, এমনকি (তাঁদের দিকে) মুখ তুলেও তাকাননি। তাঁরা তাঁবু টানাচ্ছেন, এমন সময় পাদরি এসে খুঁজতে থাকেন এবং একপর্যায়ে নবীজির হাত ধরে বলেন, “এ হলো বিশ্বজাহানের নেতা; এ হলো বিশ্বজাহানের অধিপতির বার্তাবাহক, আল্লাহ তাঁকে বিশ্বজাহানের প্রতি করুণাস্বরূপ প্রেরণ করবেন।”
‘কোরাইশের প্রবীণগণ পাদরিকে জিজ্ঞেস করেন, “আপনি কীভাবে জানলেন?” তিনি বলেন, “তোমরা যেখান দিয়ে এসেছ, তখন কোনো গাছ কিংবা পাথর অবশিষ্ট ছিল না, যা তাঁর সামনে নত হয়নি। গাছ ও পাথর শুধু নবীর সামনেই নত হয়। আর আমি তাঁকে চিনতে পারছি নবুয়তের সিলমোহর দেখে, যা তাঁর কাঁধের হাড়ের নিচে রয়েছে, দেখতে অনেকটা আপেলের মতো।”
‘তারপর পাদরি ফিরে গিয়ে তাঁদের জন্য খাবার তৈরি করে নিয়ে আসেন। তখন নবীজি (সা.) উটগুলোর দেখভাল করছেন। তিনি বললেন, “তাঁকে ডাকো!”
‘নবীজি এগিয়ে আসেন। মেঘমালা তাঁর ওপর ছায়া দিচ্ছে। লোকদের কাছাকাছি এসে দেখেন, লোকজন তাঁর আগেই গাছের ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছে। তিনি সেখানে বসতেই গাছের ছায়া তাঁর দিকে ঝুঁকে পড়ে।
পাদরি বললেন, “দেখো, দেখো, গাছের ছায়া তাঁর দিকে ঝুঁকে পড়েছে।”
আমরা এ সংবাদ পেয়ে এসেছি—এই নবী এ মাসেই আত্মপ্রকাশ করবেন। এমন কোনো রাস্তা বাকি নেই, যেখানে লোক পাঠানো হয়নি। তাঁর (আত্মপ্রকাশের) সংবাদ আমাদের নিকট পৌঁছেছে। তাই আমাদেরকে আপনার এই রাস্তায় পাঠানো হয়েছে।
পাদরি তাঁদের মধ্যে দাঁড়িয়ে তাঁদের শপথ নিচ্ছিলেন, তাঁরা যেন তাঁকে নিয়ে রোম সাম্রাজ্যের এলাকায় না যান; কারণ রোমানরা যদি বৈশিষ্ট্য দেখে তাঁকে চিনতে পারে, তাহলে তাঁকে মেরে ফেলবে। চোখ ফেরাতেই তিনি দেখেন, রোম সাম্রাজ্যের এলাকা থেকে সাতজন ব্যক্তি এসে হাজির।
‘তিনি তাঁদের অভ্যর্থনা জানিয়ে জিজ্ঞেস করেন, “তোমরা কেন এসেছ?” তারা বলল, “আমরা এ সংবাদ পেয়ে এসেছি—এই নবী এ মাসেই আত্মপ্রকাশ করবেন। এমন কোনো রাস্তা বাকি নেই, যেখানে লোক পাঠানো হয়নি। তাঁর (আত্মপ্রকাশের) সংবাদ আমাদের নিকট পৌঁছেছে। তাই আমাদেরকে আপনার এই রাস্তায় পাঠানো হয়েছে।”
পাদরি বলেন, “তোমাদের পেছনে কি এমন কেউ আছেন, যিনি তোমাদের চেয়ে উত্তম?” তারা বলে, “আমরা শুধু এটুকু সংবাদ পেয়েছি যে তিনি আপনার (এই) রাস্তায় আছেন।” তিনি বলেন, “আচ্ছা, তোমাদের কী ধারণা—আল্লাহ যদি কোনো বিষয় নির্ধারণ করে রাখেন, তা কি কেউ রুখতে পারে?” তারা বলল, “না”।
‘পরিশেষে তারা পাদরির নিকট আনুগত্যের শপথ নেয় এবং তাঁর সঙ্গে থেকে যায়। (আরব কাফেলার উদ্দেশে) পাদরি বলেন, “আল্লাহর দোহাই দিয়ে জিজ্ঞাসা করছি—তোমাদের মধ্যে কে তাঁর অভিভাবক?”
তাঁরা বললেন, “আবু তালিব।” পাদরি বারবার অনুরোধ করতে থাকলে একপর্যায়ে আবু তালিব নবীজিকে ফেরত পাঠিয়ে দেন।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৬২০)
নবীজির বাল্যস্মৃতিটি মন ছুঁয়ে যায়। বারো বছরের এক বালকের নবুয়ত পেতে আরও প্রায় তিন দশক বাকি, অথচ কী আশ্চর্য, হাজার মাইল দূরান্তে অচেনা এক পাদরির কী ‘ইলমুল ইয়াকিন’ বা সুনিশ্চিত জ্ঞান!
তিনি সে জ্ঞান পেয়েছিলেন কিতাব থেকে, যাকে কোরআনে বলা হয়েছে ‘সুহুফে উলা’ তথা ইব্রাহিম ও মুসার কিতাব। আর সেই একই প্রভু আমাদের জন্য দিয়েছেন কোরআন।
পাঠক, নবীজির সেই বাল্যস্মৃতি যে এখনো অটুট আছে, তা হয়তো শুনে থাকবেন। জর্ডানের রাজধানী আম্মান থেকে ১৫০ কিলোমিটার দূরে আল-আজরাক ও আল-সাফাওয়ি শহরের মাঝে আল-বাকিআউইয়্যাহ নামক স্থানে এই গাছটি অবস্থিত।
আল-মাফরিক শহর থেকে স্থানটি ৯০ কিলোমিটার দূরে। গাছটির ছায়া ৫০ মিটার পর্যন্ত প্রসারিত। মূল ব্যাস ৯০ মিটার, উচ্চতা ১১ মিটার এবং ২৮৩ বর্গমিটার জায়গা নিয়ে গাছটি এখনো দাঁড়িয়ে আছে।
পাকিস্তানের খ্যাতিমান মুফতি তাকি ওসমানির ভ্রমণকাহিনি জাহানে দিদাহ থেকে আমরা সেই বৃক্ষটির বিষয়ে জানব। তিনি ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে জর্ডান সফরে থাকা অবস্থায় জর্ডানের বাদশাহর উপদেষ্টা প্রিন্স গাজি ইবনে মুহাম্মদের নেতৃত্বে জগদ্বিখ্যাত কয়েকজন আলেমের সঙ্গে বৃক্ষটির স্থানে গিয়েছিলেন।
‘প্রিন্স গাজি বলেন, সেই বৃক্ষটি কোন জায়গায় ছিল তা উদ্ঘাটনের জন্য বাদশাহর পক্ষ থেকে আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।...সম্ভবত ওসমানিয়া খেলাফতের যুগ থেকে সংরক্ষিত এসব দস্তাবেজের মধ্যে আমি সে বৃক্ষের উল্লেখ পাই, যার নিচে নবীজি (সা.) অবস্থান করেছিলেন।
‘আমি আরও উল্লেখ পাই যে সেই বৃক্ষটি এখনো তাজা রয়েছে। দস্তাবেজের আলোকে আমি তা অনুসন্ধান করে জানতে পারি যে কিছুদিন পূর্বে তেলের পাইপলাইনের সার্ভে করার সময় সেই সড়ক আবিষ্কৃত হয়েছে, যা কোনো এক বাইজেন্টাইন বাদশাহ বানিয়েছিলেন, যাতে হিজাজের ব্যবসায়ীরা নিশ্চিন্তে সিরিয়া সফর করতে পারে।
‘এ সড়ককে ভিত্তি বানিয়ে এতদঞ্চলের সার্ভে করলে বিরল-বিস্ময়কর এ বৃক্ষটি আবিষ্কৃত হয়। যা ছিল শত শত বর্গকিলোমিটারব্যাপী বিস্তৃত মরুপ্রান্তরের মাঝে একমাত্র সজীব ও সবল বৃক্ষ। সেই বৃক্ষ থেকে কিছু দূরে একটি ভবনের ধ্বংসাবশেষও দেখতে পাই, যা বুহাইরা পাদরির গির্জা হওয়ার সম্ভাবনা ছিল।
আশপাশের বসবাসকারী বেদুইনদের কাছে তথ্য তালাশ করলে তারা বলে যে আমাদের খান্দানের মধ্যে এ কথা “তাওয়াতুর” পর্যায়ে প্রসিদ্ধ রয়েছে যে এ বৃক্ষের নিচে নবীজি (সা.) অবস্থান করেছেন।
‘এসব দলিল-প্রমাণের আলোকে জর্ডান সরকার জায়গাটি সংরক্ষণের জন্য এর চতুর্দিকে প্রাচীর তৈরি করে। প্রিন্স গাজি প্রথম যখন এ বৃক্ষ আবিষ্কার করেন, তখন তা পুরো সজীব ছিল। তবে ডালগুলো কিছুটা শুকিয়ে গিয়েছিল। পরে যত্নের সঙ্গে তাতে পানি দেওয়া হয়। ফলে তা পরিপূর্ণ রূপে সবুজ ও সজীব হয়ে ওঠে।’
তাকি ওসমানি আরও লেখেন, ‘সুতরাং প্রিন্স গাজি আমাকে একটি সামরিক বিমানবন্দরে নিয়ে যান। সেখানে একটি বড় হেলিকপ্টার প্রস্তুত ছিল।...আমি ছাড়া নতুন আল–আজহারের শাইখ আহমাদ আত-তায়্যিব, মিসরের মুফতি আলি জুমুআ এবং প্রিন্সের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার লোকেরাও হেলিকপ্টারে আরোহণ করে।
‘হেলিকপ্টার আম্মান থেকে উত্তর দিকে সফর করে প্রায় পঞ্চাশ মিনিটে গন্তব্যে পৌঁছে। পুরো পথটি ছিল লতাপাতাশূন্য মরুভূমি।...পঞ্চাশ মিনিটের সফরের পর হেলিকপ্টার যখন অবতরণ করে, তখন আদিগন্ত বিস্তৃত বালুকাময় মরুপ্রান্তরের মাঝখানে একটি সবুজ-শ্যামল বৃক্ষ চোখে পড়ে।
‘কূলকিনারাহীন এ মরুভূমিতে যা ভাস্বর হয়ে দেখা দিচ্ছিল। ধারণা করা হচ্ছে যে এর ছায়াতেই নবীজি (সা.) আগমন করেছিলেন। সেখানে গিয়ে দেখার পর সুস্পষ্টই চোখে পড়ে যে এটি অসাধারণ একটি বৃক্ষ। কারণ, শত শত বর্গকিলোমিটারের মধ্যে কোনো গাছের চিহ্ন পর্যন্ত নেই। সেখান পর্যন্ত পানি পৌঁছার কোনো পথও চোখে পড়ে না।
‘তাই এটি কোনো অসম্ভব বা অবাক করার মতো বিষয় নয় যে এ বৃক্ষের মাধ্যমে নবীজির একটি মোজেজা প্রকাশ পেয়েছিল এবং তার ভিত্তিতে বুহাইরা পাদরি নবীজির শেষ নবী হওয়ার অনেক নিদর্শন দেখতে পেয়েছিলেন, যে কারণে আল্লাহ–তাআলা অলৌকিকভাবে বৃক্ষটিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। বিশেষ করে এ বৃক্ষ থেকে এক শ মিটার দূরে এমন একটি ভবনের ধ্বংসাবশেষও রয়েছে, যার সম্মুখভাগ রয়েছে এ বৃক্ষের দিকে।’
চূড়ান্ত নিশ্চিত হওয়া যায় না ঠিক, তবে জোরালো সম্ভাবনা অবশ্যই রয়েছে যে এটিই সে বৃক্ষ। আর এ জোরালো সম্ভাবনা একজন প্রেমিকের চোখ শীতল করার জন্য যথেষ্ট।
এ ঘটনার অবস্থানস্থল সম্পর্কে সিরাতের গ্রন্থগুলোতে উল্লেখ আছে যে বুহাইরার সঙ্গে সাক্ষাতের এ ঘটনা সিরিয়ার বুসরা শহরে ঘটেছিল। হাফেজ ইবনে কাসির (রহ.) ইবনে আসাকিরের উদ্ধৃতিতে বর্ণনা করেছেন যে বুহাইরা পাদরি ‘কাফফার’ নামক একটি জনবসতিতে বাস করতেন, যা ছিল বুসরা থেকে ছয় মাইল দূরে।
বুহাইরা জনবসতি বুসরা থেকে ছয় মাইল দূরে, এ কথা মেনে নেওয়া হলে বৃক্ষের এ জায়গাটি বাহ্যত সে জায়গা নয়। কারণ, বুসরা শহর এখান থেকে বেশ দূরে সিরিয়ার সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত।
এ অঞ্চলের মানচিত্র দ্বারা জানা যায় যে এখানকার সবচেয়ে নিকটবর্তী এলাকা হলো ‘আজরাক’। সেখান থেকে সিরিয়ার সীমানা শুরু হয়। তারপর প্রথম শহর হলো ‘বুসরা’। বুসরা যেহেতু সে সময় অনেক বড় শহর ছিল, তাই বুসরা শব্দটি শুধু ওই শহরের জন্যই নয়; বরং তার শহরতলির বিস্তৃত এলাকার জন্যও ব্যবহৃত হতো। তার মধ্যে ‘আজরাক’ এবং এ জায়গাটিও অন্তর্ভুক্ত।
তারপরও নিম্নের নিদর্শনগুলো এ আবিষ্কারের পক্ষে পাওয়া যায়:
হিজাজ থেকে সিরিয়া যেতে বাণিজ্যিক কাফেলা সে যুগে যে সড়কটি ব্যবহার করত, এ জায়গাটি তার নিকটে অবস্থিত।
এটি উত্তর-পূর্বের সেদিকেই অবস্থিত, যেদিকে বুসরা শহর অবস্থিত।
এর মাঝে এবং বুসরার মাঝে বড় কোনো শহর নেই। ‘আজরাক’ ছোট একটি জনপদ।
এতদঞ্চলের লোকদের মধ্যে এ কথা ‘তাওয়াতুর’ পর্যায়ে প্রসিদ্ধ যে এটি সেই বৃক্ষ—যার নিচে নবীজি (সা.) বিশ্রাম করেছিলেন।
এ লতাগুল্মহীন ঊষর মরুপ্রান্তরে এ বৃক্ষটি সজীব থাকা নিশ্চয়ই একটি অসাধারণ ঘটনা।
এ বৃক্ষের নিকটেই এখন পর্যন্ত একটি পুরোনো গির্জার ভগ্নাবশেষ রয়েছে।
প্রিন্স গাজি পুরোনো দলিল-দস্তাবেজে এ জায়গার যে চিহ্ন পেয়েছেন, তা এ আবিষ্কারের সঙ্গে মিলে যায়।
সুদূরবিস্তৃত গাছের শিকড় প্রাচীনতার আলামত বহন করে।
এসব কারণে চূড়ান্ত নিশ্চিত হওয়া যায় না ঠিক, তবে জোরালো সম্ভাবনা অবশ্যই রয়েছে যে এটিই সে বৃক্ষ। আর এ জোরালো সম্ভাবনা একজন প্রেমিকের চোখ শীতল করার জন্য যথেষ্ট।
তাকি উসমানি তাঁর স্মৃতিচারণা শেষ করেছেন এভাবে, ‘সুতরাং আমরা জিয়ারতের সৌভাগ্য লাভ করি। এটি একটি পেস্তা বৃক্ষ। প্রিন্স গাজি বলেন, এতে এখনো পেস্তা ধরে। আমি তা খেয়েছি।
‘গাছের ছায়া এমনিতেও মনোমুগ্ধকর হয়ে থাকে, কিন্তু কল্পনার চোখ এখানে যে হৃদয়-প্রেমাস্পদকে উদ্ভাসিত দেখতে পায়, তা এ ছায়ার মধ্যে এমন মাধুর্য সৃষ্টি করে, যা অন্য কোথাও হতে পারে না।
‘এ বৃক্ষ ও তার পরিবেশে কিছু সময় কাটানোর পর আসরের নামাজের সময় হয়ে যায়। আল্লাহর অনুকম্পায় এর ছায়াতেই আসরের নামাজ আদায়ের সুযোগ হয়।’ (মুফতি তাকি ওসমানি, পৃথিবীর দেশে দেশে, পৃষ্ঠা: ২৯০-২৯৬)
ড. মুহাম্মদ তাজাম্মুল হক: অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়