ধর্ম–দর্শন

বিয়ের জন্য আর্থিক প্রস্তুতি: কোরআন যে প্রতিশ্রুতি দেয়

বর্তমান সময়ে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে অধিকাংশ তরুণ-তরুণী এক দীর্ঘ প্রশ্নমালার মুখোমুখি হন—আমার বর্তমান বেতন কি সংসারের জন্য যথেষ্ট? ভবিষ্যৎ বাসস্থান কীভাবে নিশ্চিত হবে? বিয়ের আনুমানিক খরচ জোগাড় হবে কীভাবে? আর লাগামহীন মূল্যস্ফীতি ও নাগরিক জীবনের ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের এই যুগে একটি পরিবারের দায়িত্ব কি আদৌ বহন করা সম্ভব?

এমন ভাবনা মোটেও অযৌক্তিক নয়। বরং জীবনের একটি বড় দায়িত্ব নেওয়ার আগে নিজের সক্ষমতা বিচার করা পরিপক্বতারই লক্ষণ। তবে সংকট তৈরি হয় তখন, যখন এই হিসাব-নিকাশ রূপ নেয় স্থায়ী এক আশঙ্কায় এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা পরিণত হয় এমন এক অনড় ধারণায় যে—যতক্ষণ না বৈষয়িক সমস্ত প্রাচুর্য নিশ্চিত হচ্ছে এবং ভবিষ্যৎ শতভাগ বিপদমুক্ত মনে হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত বিয়ে করা যাবে না।

র্তমানের আর্থিক টানাপোড়েনের কারণে যেন মানুষ আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হয় এবং আগামী দিনের রিজিককে যেন কেবল আজকের সীমিত আয়ের অঙ্কে পরিমাপ না করে।

কোরআনে বর্ণিত প্রতিশ্রুতি

কোরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন, “তোমাদের মধ্যে যারা অবিবাহিত তাদের বিবাহ দাও এবং তোমাদের সৎকর্মশীল দাস ও দাসীদেরও; তারা যদি নিঃস্ব বা অভাবগ্রস্তও হয়, আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের সচ্ছল করে দেবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।” (সুরা নুর, আয়াত: ৩২)

এই আয়াতটি তাদের আশার কথা বলে, যারা কেবল দারিদ্র্যের ভয়ে দাম্পত্য জীবনের মতো একটি পবিত্র বন্ধনকে বিলম্বিত করছে। ইবনে কাসির উল্লেখ করেছেন, সাহাবি আবু বকর ও আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলতেন, “তোমরা বিয়ের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে সচ্ছলতা ও প্রাচুর্য অন্বেষণ করো।” (ইবনে কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, ৬/৪১, রিয়াদ: দারু তয়্যিবাহ, ১৯৯৯)

তবে এই বাণীর অর্থ এটি নয় যে বিয়ে কোনো জাদুকরী যান্ত্রিক সূত্র, যার ফলে কাবিন সম্পন্ন হওয়ামাত্রই মানুষ ধনী হয়ে যাবে; কিংবা এটি কোনো প্রস্তুতিহীন দায়িত্বজ্ঞানহীনতার ছাড়পত্রও নয়।

বরং এর মূল দর্শন হলো, শুধু বর্তমানের আর্থিক টানাপোড়েনের কারণে যেন মানুষ আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হয় এবং আগামী দিনের রিজিককে যেন কেবল আজকের সীমিত আয়ের অঙ্কে পরিমাপ না করে।

তাছাড়া ‘রিজিক’ শব্দটিকে আমরা সাধারণত শুধু নগদ টাকা বা বেতনের সংকীর্ণ গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ করে ফেলি। অথচ মানুষের জীবনে রিজিকের পরিধি অত্যন্ত বিশাল। একজন সৎ ও বিশ্বস্ত জীবনসঙ্গী পাওয়া এক অমূল্য রিজিক; পারিবারিক প্রশান্তি (সাকিনাহ), ভালোবাসা, সুস্থতা, আত্মতৃপ্তি এবং অল্পতে বরকত হওয়াও পরম রিজিক।

কোরআনে বলা হয়েছে, “আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই সৃষ্টি করেছেন তোমাদের সঙ্গিনীদের, যেন তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।” (সুরা রুম, আয়াত: ২১)

অঢেল সম্পদের মাঝে থেকেও অনেক পরিবারে যখন মানসিক শান্তির অভাব ঘটে, তখন সীমিত আয়ের কোনো পরিবারে পারস্পরিক ভালোবাসা ও অল্পে তুষ্টির মাধ্যমে স্বর্গীয় সুখ নেমে আসতে পারে।

হে যুবসমাজ, তোমাদের মধ্যে যার বিয়ের আর্থিক ও শারীরিক সামর্থ্য রয়েছে, সে যেন বিয়ে করে নেয়। কারণ তা দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানের পবিত্রতা রক্ষা করে। আর যার সেই সামর্থ্য নেই, সে যেন রোজা রাখে; কেননা তা তার জন্য ঢালস্বরূপ।
সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০৬৬

সামাজিক প্রদর্শন বনাম প্রকৃত প্রয়োজন

সমাজের সবচেয়ে বড় ত্রুটি হলো, বিয়েকে একটি সহজ ও পবিত্র পারিবারিক মেলবন্ধনের বদলে এক বিশাল আর্থিক প্রজেক্টে রূপান্তর করা হয়েছে। আকাশচুম্বী দেনমোহরের দাবি, বিলাসবহুল কমিউনিটি সেন্টার, জাঁকজমকপূর্ণ আলোকসজ্জা, বহুমূল্যবান উপহার এবং আনুষ্ঠানিকতার অন্তহীন প্রতিযোগিতায় পড়ে একজন তরুণকে কেবল এক রাতের আয়োজনের পেছনেই বহু বছরের সঞ্চয় ঢেলে দিতে হয়।

এর ফলশ্রুতিতে সমাজে বিয়ের বয়স পিছিয়ে যাচ্ছে। সমস্যাটা কিন্তু তরুণদের বিয়ে অনিচ্ছায় নয়; বরং তারা যখন সমাজের তৈরি করা এই দীর্ঘ ব্যয়ের তালিকাটি দেখে, তখন বিয়ের স্বপ্ন তাদের নাগালের বাইরে মনে হয়। 

এখানে আমাদের জীবনের ‘প্রকৃত প্রয়োজন’ এবং ‘সামাজিক দেখনদারির খরচ’-এর মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য টানতে হবে। একটি মাথা গোঁজার ঠাঁই, মৌলিক ভরণপোষণ এবং পরিবারের প্রতি যত্নশীল হওয়ার মানসিকতা বিয়ের মূল শর্ত; কিন্তু সমাজের বাহবা পাওয়ার জন্য লোকদেখানো প্রতিযোগিতা কোনো অপরিহার্য বিষয় নয়।

যে সংসার সামান্য উপকরণ নিয়ে শুরু হয়ে দিনে দিনে বরকতময় হয়ে ওঠে, তা সেই প্রাচুর্যপূর্ণ ঘরের চেয়ে অনেক বেশি টেকসই, যেখানে জাঁকজমক আছে কিন্তু হৃদয়ের উষ্ণতা নেই।

তাওয়াক্কুল ও বাস্তবসম্মত প্রস্তুতি

বিয়েতে বরকত ও সচ্ছলতার কথা বলার অর্থ কিন্তু এই নয় যে মানুষকে বাস্তবতাবিবর্জিত এক আবেগের জগতে ভাসিয়ে দেওয়া হবে। যে শরিয়ত বিয়ের তাগিদ দিয়েছে, সেই শরিয়তই পরিবারের অধিকার আদায়, ভরণপোষণ এবং দায়িত্বশীলতার ওপর সমান জোর দিয়েছে।

রাসুল (সা.) স্পষ্ট ভাষায় দিকনির্দেশনা দিয়ে বলেছেন, “হে যুবসমাজ, তোমাদের মধ্যে যার বিয়ের আর্থিক ও শারীরিক সামর্থ্য রয়েছে, সে যেন বিয়ে করে নেয়। কারণ তা দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানের পবিত্রতা রক্ষা করে। আর যার সেই সামর্থ্য নেই, সে যেন রোজা রাখে; কেননা তা তার জন্য ঢালস্বরূপ।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০৬৬)

মহানবী (সা.) একদিকে যেমন সামর্থ্যের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন, তেমনি অন্যদিকে চরিত্রের সুরক্ষা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের জন্য তরুণদের দ্রুত বিয়ের দিকে আহ্বান জানিয়েছেন। এটিই হলো ইসলামের সুষম দৃষ্টিভঙ্গি—এখানে তাওয়াক্কুলের নামে কোনো হঠকারিতা নেই, আবার সতর্কতার নামে কোনো পঙ্গু করে দেওয়া ভয়ও নেই।

একজন তরুণকে অবশ্যই সৎ উপার্জনের চেষ্টা করতে হবে, আয়ের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা শিখতে হবে, অহেতুক ঋণ পরিহার করতে হবে এবং পরিবারের জন্য পরিকল্পনা করতে হবে; কিন্তু সেই সঙ্গে হৃদয়ে এই অবিচল বিশ্বাস রাখতে হবে যে মানুষের গাণিতিক হিসাবের চেয়েও আল্লাহর ভাণ্ডার বহু গুণ প্রশস্ত।

একজন সৎ, দায়িত্বশীল ও চরিত্রবান জীবনসঙ্গীই একটি মেয়ের জন্য সেরা উপহার। বিয়ের প্রক্রিয়াকে সহজ করা মানে কোনোভাবেই নারীর সম্মান কমানো নয়; বরং নতুন একটি দম্পতিকে ঋণের বোঝা ছাড়া জীবনের যাত্রা শুরু করতে সাহায্য করা।

বিয়ে: দায়িত্বশীলতার পাঠশালা

বিয়ে নিজেই একজন মানুষের জন্য পরিপক্কতা, বাজেট ব্যবস্থাপনা, ধৈর্য, আপস এবং অগ্রাধিকার নির্ধারণের এক সেরা পাঠশালা। অবিবাহিত জীবনে মানুষ যেখানে কেবল নিজের জন্য ব্যয় করে, বিয়ের পর সে যখন একটি পরিবারের অভিভাবক হয়, তখন তার কর্মস্পৃহা ও আয়ের প্রচেষ্টা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই বেড়ে যায়।

একজন সৎ, দায়িত্বশীল ও চরিত্রবান জীবনসঙ্গীই একটি মেয়ের জন্য সেরা উপহার। বিয়ের প্রক্রিয়াকে সহজ করা মানে কোনোভাবেই নারীর সম্মান কমানো নয়; বরং নতুন একটি দম্পতিকে ঋণের বোঝা ছাড়া জীবনের যাত্রা শুরু করতে সাহায্য করা।

পবিত্র কোরআনে মুমিনের জন্য এক চমৎকার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, “যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে জীবিকা দান করেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না। আর যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট।” (সুরা তালাক, আয়াত: ২-৩)