নামাজের প্রতিটি মুহূর্তই বান্দার জন্য আল্লাহর নৈকট্য লাভের সুযোগ। তবে সেজদার মুহূর্তটির মর্যাদা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ সময় বান্দা নিজের সর্বোচ্চ বিনয় প্রকাশ করে মহান রবের সামনে নত হয়। এটি আল্লাহর কাছে দোয়া করার সর্বোত্তম সময়।
রাসুল (সা.) সেজদায় বেশি বেশি দোয়া করার প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি বলেন, “বান্দা সেজদারত অবস্থায় তার রবের সবচেয়ে নিকটবর্তী থাকে। অতএব, তোমরা সেজদায় বেশি বেশি দোয়া করো।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৮২)
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, “আর সেজদার সময় তোমরা বেশি বেশি দোয়া করার চেষ্টা করো, কারণ এ সময় তোমাদের দোয়া কবুল হওয়ার অধিক সম্ভাবনা রয়েছে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৭৯)
নবীজি যে দোয়া করতেন
সেজদারত অবস্থায় রাসুলের দোয়ার বহু বর্ণনা হাদিসের গ্রন্থগুলোতে রয়েছে। তিনি সেজদায় দোয়া করতেন, “আল্লাহুম্মাগফির লি জামবি কুল্লাহু, দিক্কাহু ওয়া জিল্লাহু, ওয়া আওয়ালাহু ওয়া আখিরাহু।” অর্থ: “হে আল্লাহ! আমার ছোট-বড়, প্রথম ও শেষ সব গুনাহ ক্ষমা করে দিন।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৮৩)
লক্ষণীয় বিষয় হলো, নবীজির এই দোয়াগুলো সবই আরবি ভাষায় বর্ণিত এবং নির্দিষ্ট কাঠামোয় গঠিত। এ থেকেই হানাফি ফিকহবিদরা নামাজের ভেতরের দোয়ার ভাষা নিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট মূলনীতি প্রতিষ্ঠা করেছেন।
নিশ্চয়ই এই নামাজে মানুষের পারস্পরিক কথাবার্তার কোনো অবকাশ নেই। এটি তো কেবল আল্লাহর তাসবিহ, তাকবির এবং কোরআন তিলাওয়াতের জন্য।সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৫৩৭
নামাজের ভেতর দোয়ার ভাষা
ফিকহে হানাফির মত অনুসারে নামাজের ভেতর দোয়ার ভাষা আরবি হওয়া আবশ্যক। এর পেছনে মূল কারণ হলো, নামাজ এমন একটি ইবাদত, যার নিজস্ব কাঠামো ও ভাষা শরিয়ত নির্ধারণ করে দিয়েছে। এতে তাই মানুষের পারস্পরিক কথাবার্তার স্থান নেই।
রাসুল (সা.) বলেছেন, “নিশ্চয়ই এই নামাজে মানুষের পারস্পরিক কথাবার্তার কোনো অবকাশ নেই। এটি তো কেবল আল্লাহর তাসবিহ, তাকবির এবং কোরআন তিলাওয়াতের জন্য।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৫৩৭)
এই হাদিসের আলোকে হানাফি ফকিহরা নামাজের মধ্যে এমন দোয়া থেকেও বিরত থাকতে বলেছেন, যার ভাষা ও কাঠামো সাধারণ মানুষের কথাবার্তার মতো, এমনকি তা আরবিতে হলেও। বিশেষত নিছক পার্থিব চাহিদা প্রকাশ করে এমন বাক্য সাধারণ মানুষের কথাবার্তার সাদৃশ্য বহন করে বিধায় নামাজের মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বিশিষ্ট হানাফি ফকিহ ইবনে আবেদিন শামি (রহ.) লিখেছেন, “নামাজে আরবি ভাষায় দোয়া করবে, অনারবি ভাষায় দোয়া করা নিষিদ্ধ। কোরআন-সুন্নাহয় বর্ণিত দোয়া করা যাবে, এমন বাক্য ব্যবহার করা যাবে না, যা সাধারণ মানুষের কথাবার্তার অনুরূপ।” (রদ্দুল মুহতার আলা দুররিল মুখতার, ২/২৩৩-২৩৭, দার আলামুল কুতুব, রিয়াদ, ২০০৩)
অর্থাৎ হানাফি ফিকহে দুটি শর্ত একসঙ্গে বিবেচিত হয়। প্রথমত, ভাষা আরবি হতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিষয়বস্তু ও গঠন কোরআন-সুন্নাহর ভাবধারার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
নবীজি কোন ভাষায় দোয়া করতে বলেছেন
কেউ কেউ সেজদায় আরবি ব্যতীত অন্য ভাষায় দোয়া করার পক্ষে কয়েকটি হাদিস উপস্থাপন করেন। একটি হাদিসে রাসুল (সা.) আত্তাহিয়্যাতু পাঠের পর দোয়া করার সুযোগ দিয়ে বলেছেন, “এরপর সে নিজের পছন্দমতো যে দোয়াটি তার কাছে অধিক প্রিয়, তা বেছে নিয়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করবে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৩৫)
অন্য বর্ণনায় এসেছে, “এরপর সে যা ইচ্ছা প্রার্থনা করতে পারে।” (সহিহুল জামে, হাদিস: ১৮৪৭)
এই বর্ণনাগুলো নামাজে দোয়ার বিষয়বস্তু সম্পর্কে ব্যাপকতার নির্দেশ করে। কিন্তু এগুলোর কোথাও অনারবি ভাষায় দোয়া করার অনুমতি স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। অতএব দোয়ার বিষয়বস্তুর ব্যাপকতাকে ভাষার স্বাধীনতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা স্বতঃসিদ্ধ নয়।
স্বাভাবিকভাবেই এই প্রশ্ন আসে, আরবি ভাষায় দক্ষতা না থাকা সাহাবি বা তাবেয়িদের মধ্যেও কি নামাজের সেজদায় অনারবি ভাষায় দোয়া করার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়?
পূর্ববর্তী আলেমদের আমল কী ছিল
সেজদায় অনারবি ভাষায় দোয়া করার অনুমোদনের পক্ষে যারা মত দেন, তাদের ওপর স্বাভাবিকভাবেই এই প্রশ্ন আসে, আরবি ভাষায় দক্ষতা না থাকা সাহাবি বা তাবেয়িদের মধ্যেও কি নামাজের সেজদায় অনারবি ভাষায় দোয়া করার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়?
এমন কোনো বর্ণনা তো নির্ভরযোগ্য কোনো গ্রন্থে নেই। ফলে শুধু “বেশি বেশি দোয়া করো” কিংবা “যা ইচ্ছা দোয়া করো” নির্দেশ থেকে অনারবি ভাষায় দোয়া করার বৈধতা সাব্যস্ত হয় না।
আরবি দোয়া না জানলে করণীয় কী
কোনো ব্যক্তি আরবি দোয়া না জানলে নামাজের ভেতর অনারবি ভাষায় দোয়া না করে, নামাজের বাইরে নিজের ভাষায় আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে পারেন। পাশাপাশি ধীরে ধীরে মাসনুন দোয়াগুলো মুখস্থ করার চেষ্টা করবেন।
একজন মুসলমান যেমন সুরা ফাতিহা, তাশাহহুদ ও প্রয়োজনীয় তাসবিহ শিখে নেন, তেমনি সেজদার কয়েকটি ছোট দোয়াও অর্থসহ শেখা কঠিন কিছু নয়। এতে নামাজের সৌন্দর্য বাড়বে এবং নবীজির সঙ্গে সম্পর্কও গভীর হবে।
সেজদাকে কয়েকটি তাসবিহের শব্দে সীমাবদ্ধ না রেখে মাসনুন দোয়ার মাধ্যমে সমৃদ্ধ করা উচিত। আর ইবাদতের সৌন্দর্য তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা রাসুলের দেখানো পথ ও শরিয়তের নির্ধারিত সীমার ভেতর সম্পন্ন হয়।
ফয়জুল্লাহ রিয়াদ: শিক্ষক, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, ঢাকা