গর্ভধারণ একজন নারীর জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ও অলৌকিক এক অভিজ্ঞতা। এটি যেমন সীমাহীন আনন্দ ও নতুন সম্ভাবনার সূচনা করে, তেমনি নিয়ে আসে শারীরিক পরিবর্তন, দুশ্চিন্তা ও অজানা আশঙ্কা।
হরমোনের পরিবর্তন, শারীরিক ক্লান্তি এবং অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ ও স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ অনেক হবু মাকেই মানসিকভাবে অস্থির করে তোলে।
নিয়মিত চিকিৎসাসেবা ও সঠিক পরিচর্যার পাশাপাশি এই বিশেষ সময়ে আত্মিক প্রশান্তি ও মানসিক শক্তি বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। এক্ষেত্রে আল্লাহর ওপর নির্ভরতা গর্ভবতী নারীকে সব ধরনের ভয় ও হতাশা থেকে সুরক্ষা দেয় এবং এক ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
পবিত্র কোরআনে প্রবীণ জাকারিয়া (আ.)-এর সন্তান লাভের আকুল প্রার্থনা বর্ণিত হয়েছে। প্রবীণ বয়সে যখন সন্তান লাভের স্বাভাবিক সম্ভাবনা ছিল না, তখনো তিনি পরম আল্লাহর অসীম দয়া ও ক্ষমতা থেকে নিরাশ হননি।
জাকারিয়া (আ.) যখন মরিয়মের কাছে আল্লাহর অলৌকিক নেয়ামত দেখতে পান, তখন তিনি সন্তান পাওয়ার জন্য এমন আকুল দোয়া করেন।
তিনি একনিষ্ঠ চিত্তে এক পবিত্র সন্তানের জন্য আকুতি জানিয়েছিলেন। কোরআন তাঁর সেই ঐতিহাসিক দোয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
উচ্চারণ: রাব্বি হাব লি মিল-লাদুনকা জুররিইয়্যাতান তাইয়্যিবাহ; ইন্নাকা সামিউদ দুআ।
অর্থ: “হে আমার প্রতিপালক! আমাকে তোমার পক্ষ থেকে এক পবিত্র সন্তান দান করো; নিশ্চয়ই তুমি প্রার্থনা শ্রবণকারী।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৩৮)।
ইবনে কাসির এই আয়াতের তাফসিরে উল্লেখ করেছেন যে জাকারিয়া (আ.) যখন মরিয়মের কাছে আল্লাহর অলৌকিক নেয়ামত দেখতে পান, তখন তিনি সন্তান পাওয়ার জন্য এমন আকুল দোয়া করেন। (ইবনে কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, ২/৩৫, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯৪)
নবী জাকারিয়ার এই প্রার্থনায় একটি বিশেষ শব্দবন্ধ ব্যবহার করা হয়েছে, ‘জুররিয়্যাতান তাইয়িবাহ’ বা ‘উত্তম সন্তান’। এই একটি শব্দের ভেতরে সন্তানের শারীরিক, মানসিক ও আত্মিক সুস্থতার সর্বাঙ্গীণ প্রার্থনা লুকিয়ে রয়েছে।
চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের পাশাপাশি এই দোয়াকে দৈনন্দিন জীবনযাপনের অংশ বানিয়ে নিতে পারেন তিনি।
গর্ভকালে মায়েরা চাইলে যখন এই দোয়াটি পাঠ করতে পারেন। এতে তাঁরা শুধু একটি সন্তানের শারীরিক আগমন প্রার্থনা করেন তা নয়, বরং এমন এক সন্তানের জন্য আল্লাহর কাছে মিনতি জানান, যে সন্তান হবে শারীরিক গঠনে সুস্থ, চরিত্রে পবিত্র, মানসিকতায় নমনীয় এবং সমাজের জন্য কল্যাণকর।
তাফসিরবিদ আবদুর রহমান সাদি লিখেছেন, ‘তাইয়্যিবাহ’ বা উত্তম সন্তান বলতে বোঝায় সেই সন্তানকে, যার বাহ্যিক আচরণ এবং ভেতরের চরিত্র—উভয়ই আল্লাহ ও মানুষের কাছে প্রিয় এবং প্রশংসনীয়। (আস-সাদি, তাইসিরুল কারিমির রহমান ফি তাফসিরি কালামিল মান্নান, ১/১৩০, মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ২০০০)
গর্ভকালীন প্রাত্যহিক জীবনে এই দোয়ার নিয়মিত চর্চা একজন মাকে মানসিকভাবে সমৃদ্ধ করে। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের পাশাপাশি এই দোয়াকে দৈনন্দিন জীবনযাপনের অংশ বানিয়ে নিতে পারেন তিনি।
বিশেষ করে প্রতিদিনের পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের পর, শারীরিক অসুস্থতা বা অস্বস্তি বোধ করার সময় এবং হাসপাতালে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার মুহূর্তগুলোতে এই দোয়াটি বেশি বেশি পাঠ করা যেতে পারে।
মহানবী (সা.) বলেছেন, দোয়াই হলো ইবাদতের মূল। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৩৭০)