
মানবসভ্যতা ও সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠত্বের মূল মাপকাঠি হলো মানুষের পারস্পরিক আচরণ। ইবাদত-বন্দেগির পাশাপাশি সমাজ জীবনে মানুষের সঙ্গে কীরূপ আচরণ করা হচ্ছে, তা ইসলামের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয়।
একাধিক হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয় যে, কেয়ামতের ময়দানে একজন মুমিনের আমলনামায় সবচেয়ে ভারী বস্তু হবে তার সুন্দর চরিত্র। রাসুল (সা.) বলেছেন, “কিয়ামতের দিন মুমিনের মিজানে সুন্দর চরিত্রের চেয়ে অধিক ভারী আর কোনো কিছু হবে না। আর আল্লাহ তাআলা অশ্লীল ও কটুভাষীকে চরম অপছন্দ করেন।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৭৯৯; সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২০০২)
ইসলাম সুন্দর চরিত্রকে কেবল একটি নৈতিক গুণ হিসেবেই দেখেনি, বরং একে উচ্চতর ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছে। একজন ব্যক্তি তার স্বভাবজাত নম্রতা ও আচরণের মাধ্যমে সেই স্তরে পৌঁছাতে পারেন, যেখানে একজন নিয়মিত রোজা পালনকারী ও তাহাজ্জুদ আদায়কারী ব্যক্তি পৌঁছান। (মুস্তাদরাকে হাকিম, ১/১২৮, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ২০০২)
আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে অন্যের সম্মানহানি করার প্রক্রিয়া আরও সহজ ও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছদ্মনাম ব্যবহার করে আলেম-ওলামা, রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীল এবং সাধারণ মানুষের চরিত্রহনন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইসলাম এই বিষয়টিকে অন্যের দোষ অনুসন্ধান ও প্রচার হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
আর যারা মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে কোনো অপরাধ ছাড়াই কষ্ট দেয়, তারা অবশ্যই মিথ্যা অপবাদ এবং প্রকাশ্য পাপের বোঝা বহন করে।কোরআন, সুরা আহজাব, আয়াত: ৫৮
একদিন আল্লাহর রাসুল (সা.) উচ্চস্বরে ঘোষণা করেন, “হে ওই সকল লোক যারা মুখে ইমান এনেছ কিন্তু হৃদয়ে ইমান প্রবেশ করেনি! তোমরা মুসলিমদের কষ্ট দিও না, তাদের লজ্জা দিও না এবং তাদের গোপন দোষ অনুসন্ধান করো না। কারণ, যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের গোপন দোষ খুঁজবে, আল্লাহ তার গোপন দোষ প্রকাশ করে দেবেন; আর আল্লাহ যার দোষ প্রকাশ করে দেবেন, তাকে তিনি তার ঘরেই লাঞ্ছিত করবেন।” (সুনান তিরমিজি, হাদিস: ২০৩২)
ইসলামি নীতিশাস্ত্রে ‘অন্যকে কষ্ট না দেওয়া’ একটি মৌলিক নীতি। বিনা কারণে কোনো মুসলিমকে শারীরিক বা মানসিকভাবে আঘাত করা মহাপাপ।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা এই বিষয়ে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন, “আর যারা মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে কোনো অপরাধ ছাড়াই কষ্ট দেয়, তারা অবশ্যই মিথ্যা অপবাদ এবং প্রকাশ্য পাপের বোঝা বহন করে।” (সুরা আহজাব, আয়াত: ৫৮)
সেই ব্যক্তি সবচেয়ে বড় অপরাধী, যে কোনো কবি হিসেবে সমগ্র গোত্রকে নিয়ে বিদ্রূপাত্মক কবিতা রচনা করে এবং তাদের মানহানি করে।আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ৮৬৯; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩৭৬১
এখানে লক্ষ করার বিষয় হলো ‘কোনো অপরাধ ছাড়াই’ অংশটি। নিরপরাধ মানুষকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা, তাদের সম্মানহানি করা বা অহেতুক বিপদে ফেলা একজন মুমিনের কাজ হতে পারে না। প্রকৃত মুসলিমের পরিচয় দিতে গিয়ে আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, “প্রকৃত মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিমরা নিরাপদ থাকে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১০; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪০)
এই হাদিসটি ইসলামের সামাজিক নিরাপত্তার সনদ হিসেবে কাজ করে।
বর্তমান সমাজে একটি মারাত্মক ব্যাধি হলো ‘ঢালাও সমালোচনা’ বা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী, দেশ বা গোত্রকে সামগ্রিকভাবে দোষারোপ করা। কোনো একজনের অপরাধের জন্য পুরো এলাকা বা গোষ্ঠীকে গালি দেওয়া বা তুচ্ছ করা ইসলামের দৃষ্টিতে জঘন্য অপরাধ।
রাসুলুল্লাহ (সা.) এই প্রবণতাকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। বর্ণিত হয়েছে যে, “সেই ব্যক্তি সবচেয়ে বড় অপরাধী, যে কোনো কবি হিসেবে সমগ্র গোত্রকে নিয়ে বিদ্রূপাত্মক কবিতা রচনা করে এবং তাদের মানহানি করে।” (আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ৮৬৯; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩৭৬১)
ব্যক্তিবিশেষের ত্রুটির কারণে পুরো পরিবার বা অঞ্চলকে অপবাদ দেওয়া কেবল অন্যায় নয়, বরং সামাজিক বিভেদ সৃষ্টির মূল কারণ। ইসলাম শেখায় যে, অপরাধ ব্যক্তির, গোষ্ঠীর নয়।