অনেকেই বলেন, ‘আমি তো ধর্মের সব অনুশাসন মেনে চলার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি; ঠিক সময়ে নামাজ পড়ছি, নিয়মিত কোরআন পাঠ ও সকাল–সন্ধ্যার জিকির করছি, মা–বাবার সেবা করছি, পাপ থেকে বেঁচে থাকছি এবং অন্যায় কিছু হয়ে গেলে তওবা করছি। তবুও আমার জীবনে কেন কোনো বড় সাফল্য আসছে না?’
মানুষ যখন দেখে যে সে কোরআন হিফজ করার চেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হচ্ছে, কিংবা সৎভাবে ব্যবসা করতে গিয়ে কোনোমতে দিন পার করছে, অথবা ভালো বাবা হওয়ার চেষ্টা করেও সন্তানকে কাছে পাচ্ছে না, নিয়মিত দান–সদকা করেও বিপদ কমছে না—তখন তার অন্তরে একধরনের হতাশা তৈরি হতে পারে।
অথচ দেখে চারপাশে যারা কোনো ধর্মীয় বিধানের তোয়াক্কাই করে না, তারাই সফল সফল হচ্ছে—তখন এই মানসিক যন্ত্রণা বেড়ে যায়। ইসলামি জীবনদর্শনের দৃষ্টিতে এই ‘না পাওয়া’র পেছনে মহান আল্লাহর কি কোনও রহস্য লুকিয়ে আছে? আসুন আলাপ করা যাক।
হতে পারে কোনো বিষয়কে তোমরা অপছন্দ করছ, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর; আবার হতে পারে কোনো বিষয়কে তোমরা ভালোবাসছ, অথচ তা তোমাদের জন্য ক্ষতিকর। আর আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।সুরা বাকারা, আয়াত: ২১৬
আমাদের কাঙ্ক্ষিত জিনিসটি না পাওয়ার অর্থ এই নয় যে মহান আল্লাহ আমাদের প্রার্থনা শুনছেন না; বরং না দেওয়া বা আটকে রাখার মধ্যেই অনেক সময় আল্লাহর বরকত নিহিত থাকে।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, ‘হতে পারে কোনো বিষয়কে তোমরা অপছন্দ করছ, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর; আবার হতে পারে কোনো বিষয়কে তোমরা ভালোবাসছ, অথচ তা তোমাদের জন্য ক্ষতিকর। আর আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২১৬)
পার্থিব জীবনের চাওয়া–পাওয়ার ক্ষেত্রেও এই নীতি শতভাগ প্রযোজ্য। আমরা যদি আমাদের অপূর্ণ চাওয়াগুলোর বিপরীত চিত্রটি কল্পনা করি, তবে দেখতে পাব:
কোরআন হিফজের ক্ষেত্রে: আপনি যদি এক নজর দেখেই সঙ্গে সঙ্গে পৃষ্ঠা মুখস্থ করে ফেলতে পারতেন, তবে কি আপনি কোরআনের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটাতেন? বারবার পাঠের সেই বিপুল সওয়াব কি আপনার অর্জিত হতো?
ব্যবসা–বাণিজ্যের ক্ষেত্রে: শুরুতেই যদি আপনার ব্যবসা অভাবনীয় সফলতা পেত, তবে এত দ্রুত ব্যবসার সম্প্রসারণ ও চাপ সামলানোর মানসিক পরিপক্বতা কি আপনার ছিল? বিত্তশালী হওয়ার পর আপনি কি আগের মতো খাঁটি মনে দান করতেন, নাকি শুধু কর ছাড় পাওয়ার জন্য হিসেবি দান করতেন?
পারিবারিক জীবনের ক্ষেত্রে: সন্তানরা যদি কোনো কষ্ট না দিয়ে একদম নিখুঁতভাবে আপনার সব কথা মেনে চলত, তবে অভিভাবকত্বের পেছনে যে আত্মিক ধৈর্য, দয়া ও প্রজ্ঞার পরম শিক্ষণীয় সফর রয়েছে, তা কি কখনো অর্জিত হতো?
আমাদের জীবনে যখন কাজ আটকে যায়, তখন দেখতে হবে কোনো সূক্ষ্ম পাপ বা অসচেতন আচরণ আমাদের বরকতের পথকে রুদ্ধ করে রাখছে কি না। হয়তো মা–বাবা কিংবা কোনো আত্মীয়ের সঙ্গে সম্পর্কে কোনো ত্রুটি রয়ে গেছে।
ইবনে আতাউল্লাহ আল-ইস্কান্দারি লিখেছেন, ‘কখনো কখনো আল্লাহ তোমাকে না দেওয়ার আড়ালে দান করেন, আবার কখনো দেওয়ার আড়ালে তোমাকে বঞ্চিত করেন। যখন তোমার কাছে না পাওয়ার বা বঞ্চনার আসল রহস্য উন্মোচিত হবে, তখন এই না পাওয়াটাই তোমার কাছে পরম উপহার বলে মনে হবে।’ (আল-ইস্কান্দারি, আল-হিকাম আল-আতাইয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ৪৫, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ২০০৯)
কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়া মূলত বিষণ্ণ হয়ে পড়ার কোনো অজুহাত নয়; বরং তা নিজের ভেতরের ঘাটতিগুলো খুঁজে বের করার আহ্বান। এই আহ্বানকে দুটি দিক থেকে মূল্যায়ন করা উচিত:
১. আত্মিক ও নৈতিক মূল্যায়ন: ওহুদের যুদ্ধে সাহাবিদের সাময়িক বিপর্যয় তাঁদের শিক্ষা দিয়েছিল যে মহানবীর আদেশ অমান্য করার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে। একইভাবে আমাদের জীবনে যখন কাজ আটকে যায়, তখন দেখতে হবে কোনো সূক্ষ্ম পাপ বা অসচেতন আচরণ আমাদের বরকতের পথকে রুদ্ধ করে রাখছে কি না। হয়তো মা–বাবা কিংবা কোনো আত্মীয়ের সঙ্গে সম্পর্কে কোনো ত্রুটি রয়ে গেছে।
যদি বাহ্যিকভাবে কোনো ভুল মনে নাও পড়ে, তবুও আল্লাহর কাছে নিয়মিত ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত। কারণ, ইস্তিগফার হলো বন্ধ দুয়ার উন্মুক্ত করার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম।
ইস্তিগফার: ‘আস্তাগফিরুল্লাহাল্লাজি লা ইলাহা ইল্লা হুওয়াল হাইয়্যুল কাইয়্যুমু ওয়া আতুবু ইলাইহি।’
অর্থ: ‘আমি সেই আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি, যিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, যিনি চিরঞ্জীব ও সবকিছুর ধারক; এবং আমি তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তন করছি।’ (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ১৫১৭)
কোরআনে নবী নুহ (আ.)-এর বাণী উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল; তিনি তোমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টিপাত করবেন এবং সম্পদ ও সন্তানসন্ততি দ্বারা তোমাদের সমৃদ্ধ করবেন।’ (সুরা নুহ, আয়াত: ১০-১২)
২. কৌশলগত মূল্যায়ন: আমল বা দোয়ার পাশাপাশি কাজের পদ্ধতিতে কোনো ভুল আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে। হিফজের পুরোনো পদ্ধতি কাজ না করলে নতুন কৌশলে চেষ্টা করতে হবে; ব্যবসায় কাঙ্ক্ষিত উন্নতি না হলে পণ্যের মান, ক্রেতাদের মতামত এবং বাজারজাতকরণের পদ্ধতি পরিবর্তন করতে হবে। চেষ্টার কোনো বিকল্প নেই।
যে আল্লাহ আজ আমাদের কিছু দেওয়া থেকে বিরত রেখেছেন, তিনি তাঁর অসীম প্রজ্ঞায় আমাদের জন্য এর চেয়েও উত্তম ও স্থায়ী কোনো বরকত গোপন করে রেখেছেন। নিশ্চয়।
আল্লাহ যদি আমাদের প্রতিটি চাওয়া চাওয়ামাত্রই সঙ্গে সঙ্গে পূরণ করে দিতেন, তবে এই পৃথিবীর ক্ষণস্থায়ী জীবনের প্রতি আমাদের মোহ জমে যেত। আমরা কি তখন রাতের শেষ তৃতীয়াংশে তাহাজ্জুদের নামাজে দাঁড়িয়ে রবের দরবারে চোখের পানি ফেলতাম?
পরকালের চিরন্তন বেহেশতের জন্য কি আমাদের অন্তরে এত আকুলতা তৈরি হতো?
বাস্তবতা হলো, এই পৃথিবী কখনো বেহেশত হবে না। এখানে কষ্ট, বিলম্ব ও অপূর্ণতা থাকবেই। ইসলাম আমাদের শেখায় কাজের সেরা প্রস্তুতি নিতে এবং কঠোর পরিশ্রম করতে, কিন্তু ফলাফলের মায়াজাল থেকে নিজের মনকে মুক্ত রাখতে।
কারণ, আমাদের কর্মের চূড়ান্ত ফলাফলের মালিক আমরা নই, তার মালিক মহান আল্লাহ। আল্লাহ কিয়ামতের দিন আমাদের ফলাফলের জন্য হিসাব নেবেন না, বরং তিনি বিচার করবেন আমাদের নিয়ত এবং প্রচেষ্টার।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই সমস্ত কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল এবং প্রতিটি মানুষ তা-ই পাবে, যার নিয়ত সে করবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১)
অতএব, ফল পেতে দেরি হলেও আল্লাহর ওপর অটল আস্থা রেখে পরিশ্রম ও দোয়া চালিয়ে যেতে হবে। যে আল্লাহ আজ আমাদের কিছু দেওয়া থেকে বিরত রেখেছেন, তিনি তাঁর অসীম প্রজ্ঞায় আমাদের জন্য এর চেয়েও উত্তম ও স্থায়ী কোনো বরকত গোপন করে রেখেছেন। নিশ্চয়।