শাবানের পূর্ণ নাম হলো ‘আশ শাবানুল মুআজ্জাম’ অর্থাৎ মহিমান্বিত শাবান। রজবের পরে আর রমজানের আগের মাস এটি। রাসুল (সা.) রমজানের আগের দুই মাস, অর্থাৎ রজব ও শাবানে বেশি বেশি নফল ইবাদত ও রোজা রাখার অভ্যাস করতেন।
এই মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতটি আবার বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ। রমজানের মাত্র ১৫ দিন আগে তাই শবেবরাত এসে মুমিন হৃদয়ে আলাদা এক উত্থাপ ছড়ায়। কারণ, রমজান তখন আসি আসি করছে। তাই এই সময়টায় মুমিন হৃদয়ে প্রশান্তির পাশাপাশি অন্য রকম একটা আশা-আকাঙ্ক্ষা ও ভয় বিরাজ করে। ভয় বলতে মৃত্যুর ভয়; রমজান যেন কোনোভাবে মিস না হয়।
মুমিনরা, তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা করো, যাতে সফল হতে পারো।কোরআন, সুরা নুর, আয়াত: ৩১
তাই রমজানের প্রস্তুতির ব্যাপারে প্রত্যেক মুমিনের জন্য জরুরি হলো, শাবানে বেশি নফল ইবাদত ও রোজার অভ্যাস তৈরি করে মনের জমিনে বীজ বপন করা; আর রমজানে রোজা, তারাবিহ ও তাহাজ্জুদ ইত্যাদির মাধ্যমে ফসল ঘরে তুলে আনা।
রমজানের প্রস্তুতি কেমন হবে, নিচে এ বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা তুলে ধরা হলো:
তওবা করা সব সময় ওয়াজিব। তবে ব্যক্তি যেহেতু এক মহান মাসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তাই অনতিবিলম্বে তওবা করে নেওয়া উচিত, যাতে করে সে পূতপবিত্র ও প্রশান্তমনে এ মুবারক মাসে প্রবেশ করতে পারে।
এরপর আল্লাহর আনুগত্য ও ইবাদতে মগ্ন হতে পারে। আল্লাহ–তাআলা বলেছেন, ‘মুমিনরা, তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা করো, যাতে সফল হতে পারো।’ (সুরা নুর, আয়াত: ৩১)
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘হে লোকেরা, তোমরা আল্লাহর কাছে তওবা করো। আমি প্রতিদিন তাঁর কাছে ১০০ বার তাওবা করি।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২,৭০২)
অনেক সালাফের জীবনে আমরা দেখতে পাই, তাঁরা রমজানের প্রতীক্ষায় ছয় মাস আগে থেকেই আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন, যেন আল্লাহ তাঁদের রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দেন।
আর রমজানের পর পাঁচ মাস দোয়া করতেন, যেন আল্লাহ তাঁদের আমলগুলো কবুল করে নেন। তাই একজন মুসলিম তাঁর রবের কাছে বিনীতভাবে দোয়া করবেন, আল্লাহ যেন তাঁকে সুস্থতার সঙ্গে রমজান পর্যন্ত জীবিত রাখেন।
মুমিন এই দোয়াও করবেন, আল্লাহ যেন তাঁকে নেক আমলের ক্ষেত্রে সাহায্য করেন এবং তাঁর আমলগুলো কবুল করে নেন।
রমজান মাস পাওয়াটা একজন মুসলিমের প্রতি আল্লাহ–তাআলার বিশেষ নিয়ামত। কারণ, রমজান হচ্ছে কল্যাণের মৌসুম। এ মাসে জান্নাতের সব দরজা উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়; আর জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে রাখা হয়, তা ছাড়া রমজান হচ্ছে কোরআনের মাস, এ মাসেই ইসলামের প্রথম যুদ্ধও সংঘটিত হয়।
কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘বলুন, এটি আল্লাহর অনুগ্রহে ও তাঁর দয়া। সুতরাং এতে তারা আনন্দিত হোক। এটি তারা যা সঞ্চয় করে রাখে, তা থেকে উত্তম।’ (সুরা ইউনুস, আয়াত: ৫৮)
পরিবারের সবাই মিলে একটি যৌথ ইবাদতের রুটিন তৈরি করুন। ইবাদতের পরিকল্পনা তৈরি করুন। পরিবারের শিশুদের রোজা রাখতে উৎসাহ দিন।
আবু সালামা (রা.) বলেন, আমি আয়েশা (রা.)-কে বলতে শুনেছি, ‘আমার ওপর বিগত রমজানের রোজা বাকি থাকলে শাবান মাস ছাড়া আমি তা আদায় করতে পারতাম না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১,৮৪৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১,১৪৬)
যেসব কাজ রমজানে আপনার ইবাদত-বন্দেগিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে, সেগুলো দ্রুত শেষ করার চেষ্টা করা, যাতে পুরো রমজান নির্বিঘ্নে ইবাদত-বন্দেগি করতে পারেন।
রমজান মাস শুরু হওয়ার আগেই স্ত্রী, সন্তান এবং পরিবারের সব সদস্যকে নিয়ে একটি নিয়মিত ‘ধর্মীয় মজলিস’ আয়োজন করুন। এর লক্ষ্য হবে পুরো পরিবারকে রমজানের গুরুত্ব, ফজিলত ও করণীয় সম্পর্কে সচেতন করা।
এই মজলিসের বিষয়বস্তু হতে পারে, সহিহ উৎস থেকে রোজা, তারাবিহ, সাহরি, ইফতার, ইতিকাফ, জাকাত ও সাদাকাতুল ফিতরের জরুরি মাসআলা-মাসায়িল। এভাবে প্রতিদিন একটি বিষয় নিয়ে কথা বলুন। কোরআন-সুন্নাহের আলোকে রমজানের ফজিলত সম্পর্কে আলোচনা করুন।
এতে সবার মনে রোজা পালনের প্রতি গভীর আগ্রহ সৃষ্টি হবে। পরিবারের সবাই মিলে একটি যৌথ ইবাদতের রুটিন তৈরি করুন। ইবাদতের পরিকল্পনা তৈরি করুন। পরিবারের শিশুদের রোজা রাখতে উৎসাহ দিন।
রমজানের রোজার প্রস্তুতি হিসেবে শাবান মাসে কিছু রোজা রাখা। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত; ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) এমনভাবে রোজা পালন করতেন যে, আমরা বলতাম, তিনি আর রোজা ভঙ্গ করবেন না এবং এমনভাবে রোজা ভঙ্গ করতেন যে আমরা বলতাম তিনি আর রোজা রাখবেন না।
আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে রমজান ছাড়া অন্য কোনো মাসের গোটা অংশ রোজা রাখতে দেখিনি এবং শাবান ছাড়া অন্য কোনো মাসে বেশি রোজা রাখতে দেখিনি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১,৮৬৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১,১৫৬)
কোরআন নাজিলের মাস রমজানে। কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার মাস। কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে অত্যধিক সওয়াব অর্জন করতে রমজান মোক্ষম সময়। কোরআনের বিশেষত্ব হচ্ছে, একটি হরফ তিলাওয়াতে ১০টি নেকি লাভ হয়।
আর রমজানের বিশেষত্ব হচ্ছে, একটি নেকি ১০ থেকে ৭০০ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। তাই রমজানে কোরআনের একটি হরফ তিলাওয়াত করলে ১০ থেকে ৭০০ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।
রমজানে রোজা রাখার পাশাপাশি কোরআন তিলাওয়াত করলে বান্দার জন্য এক বিশেষ সুবিধা অপেক্ষা করে। রোজা এবং কোরআন কিয়ামতের দিন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ৬,৬২৬)
যেকোনো অনুষ্ঠানের জন্য আমরা যেমন প্রতীক্ষা ও পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণ করি, ঠিক তেমনি ইবাদত-বন্দেগি ও ধর্মীয় বিধান পালনের ক্ষেত্রে পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে।
অনেকেই গ্যাস্ট্রিক বা এ জাতীয় অন্য কোনো অসুখের দোহাই দিয়ে রোজা পালন থেকে বিরত থাকতে চায়। এটা ঠিক নয়। এ ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে। চিকিৎসার প্রয়োজন হলে তা আগেভাগেই সেরে নেওয়া দরকার। শারীরিকভাবে পরিপূর্ণ সুস্থতা অর্জনের যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
অনেকেই হিজরি সন বা চান্দ্রমাসের খবর রাখে না। ফলে হঠাৎ যখন শোনেন, অমুক দিন থেকে রোজা শুরু হবে, তখন অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন। এই অল্প সময়ে রমজানের গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য যথাযথভাবে তারা অনুধাবন করতে পারেন না।
ফলে সঠিকভাবে রোজা রাখাও তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না, তা ছাড়া হঠাৎ করে রোজা রাখা অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। তাই রমজান আসার আগে রোজা রাখায় অভ্যস্ত হওয়া দরকার।
রমজান মাসে ইবাদতে মনোযোগ ধরে রাখতে হলে আগেভাগেই দুনিয়ার ঝামেলা ও ব্যস্ততাগুলো গোছানো জরুরি। অফিস-আদালত, ব্যবসা কিংবা ব্যক্তিগত নানা দায়িত্ব—যতটা সম্ভব রমজানের আগে কমিয়ে নেওয়া উচিত, যেন ইবাদতের সময়ে অযথা মানসিক চাপ তৈরি না হয়।
তেমনি ইবাদতেও হঠাৎ করে গভীর মনোযোগ আনা কঠিন। তাই রমজানের প্রস্তুতি হিসেবে আগে থেকেই কিছু নফল নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত এবং জিকির আসকারের অভ্যাস তৈরি করলে রমজানে ইবাদত করা অনেক সহজ হয়। অভ্যাস গড়ে উঠলে হৃদয়ও ইবাদতের দিকে ঝুঁকে পড়ে, আর রমজানের বরকতগুলো গ্রহণ করাও সহজ হয়ে যায়।
এ জন্য আমরা যদি রমজান মাস পেতে চাই, তাহলে প্রস্তুতি শুরু করতে হবে এখন থেকেই। কেননা, যেকোনো অনুষ্ঠানের জন্য আমরা যেমন প্রতীক্ষা ও পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণ করি, ঠিক তেমনি ইবাদত-বন্দেগি ও ধর্মীয় বিধান পালনের ক্ষেত্রে পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে।
কারণ, রমজান মাস মুমিনের জন্য রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের কারণ হয়ে আগমন করে। সুতরাং প্রত্যেক মুমিনেরই রমজানের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রাখা দরকার।
শারীরিক, মানসিক, বৈষয়িক ও অভ্যাসগত, সবক্ষেত্রেই পরিপূর্ণ প্রস্তুতি নিতে হবে। রমজান পর্যন্ত জীবন পেতে রবের দরবারে বেশি করে দোয়াও করতে হবে। সুতরাং প্রত্যেক মুসলমানের উচিত রমজানের প্রস্তুতি গ্রহণে মনোযোগী হওয়া।