সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসুল মুহাম্মদ (সা.)-এর হৃদয়ে উম্মতের জন্য যে পরম মমতা, ব্যাকুলতা ও গভীর দরদ ছিল, তা মানব ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়। উম্মতের সামান্যতম কষ্টে তাঁর হৃদয় ব্যথিত হতো। মানুষ যাতে দোজখের আগুন থেকে রক্ষা পায়, সে জন্য তিনি প্রতিনিয়ত ব্যাকুল থাকতেন।
কোরআনে তাঁর এই অন্তর্বেদনার চিত্র তুলে ধরে আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘ওরা এই বাণীতে বিশ্বাস না করলে সম্ভবত তাদের পেছনে পরিতাপ করতে করতে আপনি নিজের প্রাণ বিসর্জন দেবেন।’ (সুরা কাহফ, আয়াত: ৬)
অন্য আয়াতে নবীজির পরিচয় দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের কাছে একজন রাসুল এসেছেন, তোমাদের যে কষ্ট হয় তা তাঁর জন্য অত্যন্ত পীড়াদায়ক; তিনি তোমাদের কল্যাণের জন্য ব্যাকুল আর মুমিনদের প্রতি পরম স্নেহশীল ও দয়াবান।’ (সুরা তাওবা, আয়াত: ১২৮)
উম্মতের প্রতি নবীজির এই গভীর ভালোবাসা ও উৎকণ্ঠার কিছু অনন্য দিক কোরআন ও হাদিসে অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী ভাষায় উঠে এসেছে:
কেয়ামত পর্যন্ত যত বিশ্বাসী দুনিয়ায় আগমন করবে, তাদের দেখার জন্য নবীজির গভীর তৃষ্ণা ছিল। একবার তিনি একটি কবরস্থানে এসে সালাম দিলেন এবং বললেন, ‘আমার বড় ইচ্ছা করে আমাদের ভাইদের একটু দেখি।’
কেয়ামত পর্যন্ত যত বিশ্বাসী দুনিয়ায় আগমন করবে, তাদের দেখার জন্য নবীজির গভীর তৃষ্ণা ছিল। একবার তিনি একটি কবরস্থানে এসে সালাম দিলেন এবং বললেন, ‘আমার বড় ইচ্ছা করে আমাদের ভাইদের একটু দেখি।’
সাহাবিরা আরজ করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আমরা কি আপনার ভাই নই?’ তিনি বললেন, ‘তোমরা তো আমার সাহাবি; আর আমাদের ভাই হলো তারা, যারা এখনো দুনিয়ায় আসেনি।’
সাহাবিরা জানতে চাইলেন, ‘যারা এখনো আসেনি, কেয়ামতের দিন আপনি তাদের কীভাবে চিনবেন?’ নবীজি বললেন, ‘কারও যদি হাত-পা ও কপাল সাদা এমন কোনো ঘোড়া থাকে, তবে সে কি ঘোর কালো ঘোড়ার পালের ভেতর থেকে নিজের ঘোড়াটিকে চিনে নিতে পারবে না?’ তাঁরা বললেন, ‘অবশ্যই পারবে।’
নবীজি (সা.) বললেন, ‘কেয়ামতের দিন অজুর কারণে আমার সেই অদেখা উম্মতের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো নূরের দ্যুতিতে উজ্জ্বল হয়ে জ্বলবে, আর হাউজে কাওসারের পাড়ে আমি তাদের অগ্রনায়ক হিসেবে অপেক্ষা করব।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৪৯)
আয়েশা (রা.) বলেন, একবার নবীজিকে উৎফুল্ল দেখে আমি বললাম, ‘আল্লাহর রাসুল, আমার জন্য একটু দোয়া করুন।’ নবীজি দোয়া করলেন, ‘আল্লাহ, আপনি আয়েশার পূর্বাপর, প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দিন।’
এ দোয়ায় আয়েশা (রা.) অত্যন্ত আনন্দিত হলেন। তখন রাসুল (সা.) বললেন, ‘আয়েশা, তুমি কি আনন্দিত হয়েছ? আল্লাহর শপথ, আমি আমার প্রতিটি নামাজেই আমার পুরো উম্মতের জন্য এই দোয়াটি করে থাকি।’ (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস: ৭১১১)
উম্মতের মুক্তি কামনায় নবীজি (সা.) হাত তুলে শিশুর মতো কেঁদে বুক ভাসাতেন। একবার তিনি কোরআন পাঠ করতে গিয়ে নবী ইব্রাহিমের সেই দোয়া পাঠ করলেন—‘হে আমার প্রতিপালক, এই প্রতিমাগুলো বহু মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে, সুতরাং যে আমার অনুসরণ করবে সে আমার দলভুক্ত, আর যে আমার অবাধ্য হবে—নিশ্চয়ই আপনি তো পরম ক্ষমাশীল ও দয়ালু’ (সুরা ইব্রাহিম, আয়াত: ৩৬)।
এরপর তিনি নবী ইসার সেই দোয়া পাঠ করলেন, ‘আপনি যদি তাদের শাস্তি দেন, তবে তারা তো আপনারই বান্দা; আর যদি ক্ষমা করেন, তবে নিশ্চয়ই আপনি মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়’ (সুরা মায়েদা, আয়াত: ১১৮)।
হাশরের ভয়াবহ ময়দানে যখন অন্য সব নবী-রাসুল নিজেদের ভাবনায় ব্যস্ত থাকবেন, তখন একমাত্র মুহাম্মদ (সা.) সেজদায় লুটিয়ে পড়ে উম্মতের মুক্তির আরজি জানাবেন।
এই আয়াতগুলো পড়ার পর তিনি দুই হাত আসমানের দিকে তুলে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন এবং বলতে লাগলেন, ‘আল্লাহ, আমার উম্মত, আমার উম্মত!’
আল্লাহ–তাআলা ফেরেশতা জিবরাইলকে বললেন, ‘মুহাম্মদের কাছে যাও এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করো তিনি কেন কাঁদছেন, যদিও তোমার রব সব জানেন।’ জিবরাইল (আ.) এসে জানতে চাইলে নবীজি (সা.) উম্মতের কথা প্রকাশ করলেন।
আল্লাহ বললেন, ‘মুহাম্মদকে গিয়ে বলো—আমি আপনার উম্মতের ব্যাপারে আপনাকে সন্তুষ্ট করব এবং আপনাকে কোনোভাবেই ব্যথিত করব না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২০২)
হাশরের ভয়াবহ ময়দানে যখন অন্য সব নবী-রাসুল নিজেদের ভাবনায় ব্যস্ত থাকবেন, তখন একমাত্র মুহাম্মদ (সা.) সেজদায় লুটিয়ে পড়ে উম্মতের মুক্তির আরজি জানাবেন।
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক নবীকেই একটি বিশেষ কবুল দোয়ার অধিকার দেওয়া হয়েছিল এবং সবাই দুনিয়াতেই নিজ উম্মতের জন্য তা প্রার্থনা করে নিয়েছেন। কিন্তু আমি আমার সেই বিশেষ দোয়াটি কেয়ামতের ময়দানে আমার উম্মতের শাফায়াতের (সুপারিশের) জন্য পরম যত্নে সংরক্ষণ করে রেখেছি।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৯৯)
উম্মতের আর্থিকভাবে অসচ্ছল অংশের দায়িত্বও তিনি পরম মমতায় কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। একবার তিনি ঈদের নামাজ শেষে দুটি শিংযুক্ত সাদা-কালো দুম্বা কোরবানির জন্য আনলেন।
তিনি নিজ হাতে তা জবাই করে বললেন, ‘বিসমিল্লাহি ওয়াল্লাহু আকবার; আল্লাহ, এটি আমার পক্ষ থেকে এবং আমার উম্মতের মধ্যে যারা সামর্থ্যের অভাবে কোরবানি করতে পারছে না, তাদের সবার পক্ষ থেকে।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৮১০)
প্রত্যেক নবীকেই একটি বিশেষ কবুল দোয়ার অধিকার দেওয়া হয়েছিল এবং সবাই দুনিয়াতেই নিজ উম্মতের জন্য তা প্রার্থনা করে নিয়েছেন। কিন্তু আমি আমার সেই বিশেষ দোয়াটি কেয়ামতের ময়দানে আমার উম্মতের শাফায়াতের (সুপারিশের) জন্য পরম যত্নে সংরক্ষণ করে রেখেছি।সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৯৯
উম্মত যাতে আমল করতে গিয়ে ক্লান্ত বা বিপন্ন না হয়, সে জন্য তিনি সর্বদা সহজতার পথ বেছে নিতেন। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তোমরা সহজ করো, কঠিন কোরো না; মানুষকে সুসংবাদ দাও, দূরে ঠেলে দিয়ো না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৯)
উম্মতের ওপর ভারী হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তিনি নিয়মিত তাহাজ্জুদের জামাত ত্যাগ করেছেন, মিসওয়াকের মতো গুরুত্বপূর্ণ আমলকে ফরজ হওয়া থেকে বিরত রেখেছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৮৭)
এমনকি তাঁর জীবদ্দশায় ও ওফাতের পরেও উম্মতের কোনো নেক আমল তাঁর সামনে পেশ করা হলে তিনি আল্লাহর শোকর করেন এবং কোনো ত্রুটি দেখলে আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। (মুসনাদে বাজ্জার, হাদিস: ১৯২৫)
নূর মুহাম্মদ রাহমানী : শিক্ষক, জামিয়া আরাবিয়া দারুল উলুম বাগে জান্নাত, নারায়ণগঞ্জ